২৫শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ক্রিকেট আর কাওয়ালি!

আপডেট : জানুয়ারি ১৩, ২০২২ ২:৫২ অপরাহ্ণ

148

আরিফুর রহমান

পাকিস্তানিরা ক্রিকেট খেলে তাই আমাদের দেশে কেউ ক্রিকেট খেলার আয়োজন করলে তা পন্ড করতে হবে যুক্তিতে টিএসসির কাওয়ালি অনুষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অনুমিত হচ্ছে।

স্বাধীনতার আগে ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবউদ্দিন জাতীয় পরিষদকে জানান, ‘রবীন্দ্রনাথের গান আদর্শবিরোধী, তা প্রচার বেতার ও টেলিভিশনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে’।

হিটলারের গোয়েবলস থেকে শুরু করে সেই খাজার মতো কিছু তথ্যমন্ত্রীর উদ্ভট চরিত্র অহরহ এখনো পরিলক্ষিত হয় অনেক দেশেই।

তা যাই হোক এর পরে বাংলাদেশে রবিঠাকুরের গান নিষিদ্ধের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করে বাংলার ছাত্ররা।

বিরক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল হাইকে রাগত স্বরেই বলেছিলেন- ‘ধুর মিয়া আপনেরা খালি রবীন্দ্র সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত করেন ক্যা? আপনেরা নিজেরা রবীন্দ্র সংগীত লিখ্যা ফালাইতে পারেন না?’

প্রফেসর সাহেব বিনয়ের সঙ্গে মোনায়েম খানকে বলেছিলেন “স্যার আমরা তো লিখতে পারি, কিন্তু আমি লিখলে তো সেটা ‘রবীন্দ্র সংগীত’ হবে না, হবে ‘হাই সংগীত’।”

সেই মোনায়েম খানের সময়কার প্রতিক্রিয়াশীলদের পাকিস্তানী তাহজীব ও তমদ্দুন মার্কা মানসিকতা ৫৫ বছর পরে এই প্রজন্মের কিছু ছাত্রের মাথায় কিভাবে ফিরে এলো বুঝে উঠতে পারছিনা। কাওয়ালি অনুষ্ঠান যারাই পন্ড করেছে তার পেছনে ছিলো জ্ঞানের স্বল্পতা আর মোনায়েম খানের মতো না বোঝার সেই পাকিস্তানী দর্শন অথবা খামাখা গ্যাঞ্জাম লাগিয়ে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়াস।

কাওয়ালি এক প্রকার আধ্যাত্মিক প্রেমবিষয়ক ভক্তিমূলক গান যা খেয়াল নামক উচ্চাঙ্গ সংগীতের শ্রেণী থেকে উৎপত্তি হয়েছে, এটি না ইসলামী না পাকিস্তানী সঙ্গীত। সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু ‘কাওয়ালি’ ধারার সঙ্গীতের প্রবর্তক বলে স্বীকৃত হলেও দিল্লি অঞ্চলে প্রাচীন কাওয়াল নামক যাযাবর সম্প্রদায় কর্তৃক গীত সাধারণ ভক্তিমূলক গানকে কাওয়ালি বলে ডাকা হতো। সেই প্রেরণায় মোগল বাদশাহ আকবরের ছোটভাই রাজপুত্র সেলিম (নামটি ভুল হতে পারে) কাওয়ালি লিখতেন ও সুর দিতেন যা এখনো গাওয়া হয়। বাদশাহ আকবর নিশ্চয়ই পাকিস্তানি ছিলেন না।

কাওয়ালিতে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির ৮ মাত্রা বিশিষ্ট সমপদী তাল, যা ৪ । ৪ । ছন্দো-বিভাজন যুক্ত এবং এটি একটি তালি ও একটি ফাঁক বিশিষ্ট। সাধারণতঃ এটি দাদরা, ধূমালি, রূপক, পশ্তু ইত্যাদি তাল দ্বারা সৃষ্ট।

বাংলাদেশে কবি কাজী নজরুল ইসলামই এই সব মূল রাগে আধ্যাত্মিক প্রেমভাব প্রকাশ করে কাওয়ালি সঙ্গীত ধারাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পাকিস্তানের নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি আর রুনা লায়লার দমাদম মাস্ত কালান্দার জনপ্রিয় কাওয়ালি সংগীত হলেও এগুলি পাকিস্তানের নিজস্ব সংস্কৃতি হিসাবে প্রিয় হয়নি। গানের সুর ও কথার জন্যে জনপ্রিয় হয়েছে ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথের রচিত ও সুরের গান তিনটি দেশের জাতীয় সংগীত হলেও কেউ এটিকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে পরিহার বা চিহ্নিত করেনা।

ব্রিটিশ যুগের যে সময় বাজারে উর্দু কাওয়ালী গানের জয় জয়কার ছিলো ঠিক সে সময়ই শিল্পী আব্বাস উদ্দীন এলেন কোলকাতার ম্যাডন থিয়েটারের একজন গীতিকার এবং সুরকার কবি কাজী নজরুলের সাথে দেখা করতে। বললেন, এই যে কাজীদা, দেখুন, পাশের রুমে পিয়ারু কাওয়াল উর্দু কাওয়ালী গানের রিহার্সাল দিচ্ছে। বাজারে সেসব গান খুব চলছে। আপনি বাংলায় এমন কিছু গান লিখে দেন না কেন?

রেকর্ড কোম্পানীর কর্তা বললেন, না না, ওসব চলবে না বাজারে। এক বছর পরে সেই কর্তা রাজী হলে আব্বাসউদ্দীন ছুটে গিয়ে কবিকে বললেন, কাজীদা, কর্তা রাজী হয়েছেন।

কবি নজরুল আব্বাসকে বললেন, কিছু পান নিয়ে এসো। ঠোঙা ভর্তি পান এলে কবি বললেন, দরজাটা বন্ধ করে এবার চুপচাপ বসে থাক।

পনেরো থেকে বিশ মিনিট পরে কবি মাথা তুলে বললেন, এই যে এসো, নাও, ধরো।

তখনকার ম্যাডন থিয়েটারের প্রধান নাট্যকার ও সংগীতকার ছিলেন কাশ্মীরের আগা হাশার। তাঁর বিখ্যাত উর্দু গজল গান–“হাম জায়েঙ্গে ওয়াঁহা খুশ দিলে দিওয়ানা যাহাহো”। সেই গজলের সুরেই ক মিনিটেই কবি কাজী লিখে ফেলেছিলেন, “ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”।

এভাবেই নজরুলের বিখ্যাত সেই গানটি সৃষ্টি হয়ে প্রমাণিত হয়েছে উর্দু ভাষা সহ যে কোন ভাষা ও গানের সুর সব মানুষেরই ভাষা ও সব মানুষেরই সঙ্গীতের সুর।

আর উর্দু ভাষাকে যখন বাংলা ভাষাকে অবনত করে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে একটি বাইরের জাতির উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিলো সেটি আলাদা ব্যাপার, সেটি আমরা হতে দেইনি রক্ত দিয়ে।

কিন্তু কাওয়ালি একটি সংগীতের ধারা মাত্র, ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো এর কোন ন্যাশনালিটি নেই। কিন্তু ইসলামিক সঙ্গীত মনে করে এর বিরোধিতা করলে এটি ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মনে হবে। 

বর্তমান কোন ছাত্র নেতার এই ব্যাপারটুকু বোঝার যোগ্যতা না থাকলে বুঝতে হবে তার পড়াশুনাও নেই, নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতাও নেই। থাকলে এই অসভ্যতা হতোনা। আর অসভ্যতা অস্বীকার করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপালেও কোন লাভ নেই, মানুষ গর্ধব নয়।

মনে রাখবা, সবাই ১৯৬৮’র তোফায়েল আহমেদ হতে পারেনা।

(ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)




স্মৃতি ও স্মরণ

ছবি