২৪শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দুর্গা পূজা: শুধু উৎসব নয়, প্রাণ আনে অর্থনীতিতেও

আপডেট : নভেম্বর ১৩, ২০২১ ৯:৩০ অপরাহ্ণ

251

আইভি সাহা

করোনা মানুষের জীবন থেকে উৎসব, আনন্দ সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, তার স্থলে জায়গা করে নিয়েছে ভয় আর আতংক। করোনার জন্য ২০২০ সালে পুজা হয়েছে অনাড়ম্বরভাবে, সীমিত আয়োজন আর পরিসরে। এবার করোনার প্রকোপ কমায় পুজা হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশেই। কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের নানা জায়গায় ঘটে যাওয়া ঘটনা মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করলেও শেষাবধি দেশের সিংহভাগ মানুষের প্রতিবাদ আর অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্ষোভের কারণে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের মনো:কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়। শান্তিপূর্ণভাবে দেবী বিসর্জণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের পুজা।

শরতের কাশ বন আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা জানান দেয় দেবী দূর্গার আগমনী বার্তা। দেবী মা কি শুধুই ভক্তের পুস্পাঞ্জলী আর পূজার সামগ্রী এবং ভক্তের ভালোবাসা পেতেই আসেন? আর সন্তুষ্ট হয়ে তার সন্তানদের আশির্বাদ করেই চলে যান? হ্যাঁ কৃপা বর্ষণতো করেন, তা না হলে আমরা কি করে ভালো থাকি! এটা আমাদের বিশ্বাস! নারী শক্তি রুপিনী দেবী,কন্যা,জায়া,জননী সব রূপেতেই মা আছেন, অশুভ শক্তি বিনাশিনী মা, প্রয়োজনে নানা রুপে আবির্ভুত হয়েছেন নানা সময়ে।

আগেই বলা হয়েছে, করোনার কারণে আর সবকিছুর মতো নেতিবাচক প্রভাব পরেছে পূজার উৎসবেও। ২০২০ সালে অনাড়ম্বর পূজা আয়োজনের প্রভাব পড়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মজীবনে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শিল্প, শিল্পী ও নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থবিরতা নেমে এসেছিল ব্যবসা বানিজ্যে। পূজাকে কেন্দ্র করে, শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরী হয়। প্রতি বছর পুজাকে ঘিরে এই সময়টাতে ব্যস্ততম সময় পার করেন  শিল্পীরা। মৃৎ শিল্পীদের এই পূজোর সময় দুচোখে ঘুম থাকেনা।কুমোর পাড়াতে চলে রাত দিন দেবীকে রং তুলির আচরে নিখুঁত করে তৈরী করার প্রয়াস। মাকে সাজিয়ে প্যান্ডেল বা মন্দিরে স্থাপনের ধুম লেগে যায় পূজোর কিছু দিন আগে থেকেই।

পূজাকে ঘিরে সুন্দর সুন্দর গেইট তৈরীর যে প্রচলন, তা নান্দনিকতার ছোঁয়া যেমন পায় পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য সব জাতির লোকজন নিযুক্ত থাকেন। বিজয়াদশমী, বা দশহরাতে নানান জায়গায় যে ছোট বড় মেলার আয়োজন থাকে তাতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্রও ফুটে ওঠে। পুজোকে ঘিরে বাহারী মিষ্টির ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়,, নকুল,বাতাসা আর সন্দেশ, জিলেপী,দানাদার,চমচম,নাড়ু, মোয়া, হাওয়াই মিঠাই,মুড়ি,মুড়কিতো আছেই। ফুচকা বিক্রেতা থেকে পান সুপারি, চা,কফির ছোট পসরা সাজিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা করার সুযোগ আসে মানুষের সামনে। বোধ করি এজন্যই বলা হয়, ” ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”

বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা এই সময়টাতে বাড়তি আয় করেন। মহামারী পরিস্থিতি তাদের সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিল, কিন্ত এইবার পূজোয় কিছুটা আয় করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছেন তারা। আলোক সজ্জা নিয়ে যারা কাজ করেন ২০২০ সালে তারাও পরেছিলেন বিপাকে। এ বছর তারাও পুরনো ক্ষতি পুষিয়ে   নেয়ার চেষ্টা করেছেন। দেবী দূর্গার বোধন, ষষ্ঠী থেকে দশমী এই পাঁচ দিন ধরে, নানান জায়গায় ছোট-বড় যে মেলা হয় তা যুগ যুগ ধরে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চলে আসছে। কোথাও হয় পুতুল নাচ, সার্কাস,কবি গান, জারী,সারি, ভাটিয়ালি গান,আবার রাধা চক্করে চরে মজা করে ছোটরা। থাকে সাপের খেলা,বানরের খেলা। বেত,কাঠ,পাট, কাঠ দিয়ে তৈরী জিনিস পত্রের জুড়ি মেলা ভার। পোড়া মাটির জিনিসপত্র এই মেলাগুলোতে বেশি দেখা যায়।

পুজাতে যে সব পণ্য ব্যবহার করে শিল্পী তার শৈল্পিক কারুকাজে নান্দনিকতার ছোঁয়া এনে দেন সে পণ্যগুলো হলঃ পাট শিল্প, প্লাস্টিকের সামগ্রী, পুথি,চুমকি, কাগজ, শোলা,খালি বোতল, নারিকেলের ছোবরা,সুপারিখোসা,তুলো,কাপড়,সুতা,আলপিন,বাহারী প্লাস্টিকের ফুল,মাটির তৈরী জিনিসপত্র,পোড়া মাটির জিনিষ,পাথর,মুখোশ, পুতুল, বাঁশ, বেত,কাঠের সামগ্রী, রং,চিনা মাটির দ্রব্যসামগ্রী, রং,ঝিনুক শামুক,লেইস,খর,কুটো,পাতা, বিভিন্ন ধরনের ধাতব সামগ্রী। একজন শিল্পী অব্যবহৃত এবং অনেকটা মূল্যহীন উপকরণ ব্যবহার করে তার নিপুণ কৌশলে শিল্প সত্ত্বাকে জাগিয়ে তাকে মূল্যবান করে তোলেন। সামান্য বস্তু দিয়ে অসাধারণ শৈল্পিক রুপ দিয়ে নান্দনিকতার ছোঁয়ায় আবিষ্কার করেন অসাধারণ সুন্দর শিল্পকর্ম।

দশমীর পরের দিন বিভিন্ন স্থানের দশহরাতে যে নৌকা বাইচ হয় তা আমাদের দেশের সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে।  পুজামণ্ডপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও মিডিয়ায় প্রচার করে তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। সংস্কৃতি অঙ্গণের মানুষেরাও এ সময় বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে বা নাটকসহ নানা কর্মকাণ্ড করে বাড়তি উপার্জণ করে ধাকেন।

পূজা মানেই উৎসব। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সমস্ত শিল্পী সত্তাকে একীভূত, একত্রীকরণের মাধ্যমে চলে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের সম্বনয় সাধন। এবারের পূজার সময় পৃথিবী অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল, তাই পূজার আনন্দটা ঘরে ঘরে গিয়েছিল যার রেশ এখনো কাটেনি। আগামী বছর এই পৃথিবী করোনামুক্ত হবে, আরও উৎসব ও আনন্দময় হবে পূজাসহ সব উৎসব সেটাই প্রার্থণা।

লেখক: আইভি সাহা (সঙ্গীত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক)