৩রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ফের ফিরেছে ফুল-পাখিরা

আপডেট : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১ ৮:০৬ অপরাহ্ণ

151

পথহারা পথিকের কথা

প্রায় দেড় বছর পর, একেবারে সংখ্যার হিসাবে ৫৪৩ দিন পর খুলেছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের ১৬ মার্চ বন্ধ হওয়ার পর আজ ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলতে শুরু করেছে শিক্ষাঙ্গণ।  প্রথম দিন প্রাথমিকের শুধু পঞ্চম শ্রেণির এবং মাধ্যমিকে দশম আর পুরাতন দশম শ্রেণির ক্লাস হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় বর্ষের আর এ বছর যারা এইচএসসি দেবে তাদের ক্লাস হলো প্রথম দিনে।

গত বছরের মার্চ জুড়ে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বন্ধ হয় তখন কেউই ধারণা করেনি, দেড় বছরের মধ্যে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হবে না, কেউই বুঝতে পারেনি ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো’। কিন্তু দেখতে দেখতে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর, সপ্তাহ, মাসের পর মাস কেটে গেছে কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর খোলা যায়নি, এরইমধ্যে কত শিশু যে পরপারে চলে গেছে, যে বন্ধুটির সাথে সব সময় চলতো কিংবা পাশের আসনটিতে বসতো অবধারিতভাবে সে আসনটি যখন খালি থাকবে তখন তার বেঁচে থাকা বন্ধুটির যে অনুভূতি হবে তা কি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে?

করোনার প্রকোপ কিছুটা কমায় শেষাবধি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হলো, আজ স্কুল কলেজ খুলেছে, আগামীকাল সোমবার থেকে মেডিকেল কলেজ খুলবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হয়তো শিগগিরই খুলে দেয়া হবে। সেসবেও চলছে ধোয়ামোছা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।

স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা আসার পরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রেণিকক্ষগুলোসহ পুরো স্কুল ভবন আর ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে।  করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর চোখ রাঙানিটাও নতুন আতংক সৃষ্টি করেছে।  স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের আশপাশ যতটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছে।

অবশেষে আজকের সকালটা শুরু হয়েছে নতুন সূচণা দিয়ে। আজকের সকালটা ছিল আবার ফুল-পাখিদের সকাল।  আজকের সকালটা ছিল আবার মেতে ওঠার সকাল।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ঢুকেছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে, কোন কোন স্কুল সাজানো হয়েছে, কোথাও কোথাও চকলেটও দেয়া হয়েছে, দেয়া হয়েছে ফুলও।  ছোট ছোট বাচ্চাদের কাছে চকলেট, ফুল এসবই আকর্ষণীয়। এগুলো তাদের নতুন করে ফেরার দিনটাকে একটু বেশিই আনন্দময় করে তুলেছে।  সারা জীবন গল্প করার মতো একটা উপলক্ষ্য সৃষ্টি হলো ওদের জীবনে। আনন্দময় এ দিনে স্কুলের আঙিনা ফের মুখরিত হয়েছে কলকাকলিতে।

স্কুল-কলেজ মানে পড়ালেখা, নানা শাসন আর অনুশাসন, পাশাপাশি উল্লাসে মেতে ওঠার, বন্ধুর সাথে গলা ফাটিয়ে কথা বলার এক নিরাপদ স্থান।  একটা বল নিয়ে একশ’জনের ছুটাছুটি, একটি টেনিস বলের পেছনে দলে দলে লুটোপুটি খাওয়ার স্থান, গায়ে যেন ধুলা-ময়লা না লাগে, মায়ের বলা এই কথাটায় একান্ত বাধ্য ছেলের মতো সায় দিলেও বাসায় ফেরার সময় কাদা আর ধুলায় মাখামাখি করা জামা গায়ে দিয়ে ঘরে ফেরার মতো কত কাণ্ডই না ঘটে স্কুলের ছোট/বড় মাঠে।

আজ শিক্ষার্থীরা ফের এসেছে তাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠানে।  শৈশবের দেড়টি বছর কেড়ে নিয়েছে করোনা, যে ছেলেটি এ বছর এসএসসি দেবে সে পায়নি স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে (দশম) দাপুটে ক্লাস করার স্বাদ, যে ছেলেটি অটো পাসে দশম শ্রেণিতে উঠে গেছে সে পায়নি নবম শ্রেণিতে অপেক্ষাকৃৎ একটু ঢিলেঢালা সময় কাটানোর মওকা। করোনা অনেক মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে আরও অনেক কিছু, কেড়ে নিয়েছে অনেক আনন্দ, হাসি। জীবনের নতুন মানে শিখিয়েছে করোনা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মেতেছে প্রাণের উচ্ছাসে, যতই থাকুক শাসন-বারণ, দেড় বছর পর বন্ধুদের ফিরে পাওয়ার আনন্দ তো তাদের কিছুটা অবাধ্য করে দিতেই পারে।  তাই কিছুটা সইতে হবে, কিছুটা সয়ে চলতে হবে বড়দের, পাশাপাশি এই সময়টাকে বেশ করে কাজেও লাগানো যায়, শুধু করোনার ভীতি থেকে নিজেদের রক্ষার বিষয়টাই নয়, নিজেকে আর নিজের প্রতিষ্ঠান, ঘর, বাড়ি, পরিবেশ সবকিছুকে যত্ন নেয়ার বিষয়টি ওদের শেখানো যায়। আমাদের এই সন্তানেরা একটা কঠিন সময় পার করেছে, সেই কঠিন সময়টা বিদায় নেবে কি না আল্লাহই ভাল জানেন, মানুষ হিসেবে আমরা শুধু পারি এই কঠিন সময়টাকে বিদায় করার মতো ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ আর প্রয়োগ ঘটাতে। তাই আমাদের জীবনে, চলনে, বলনে, আচরণে সব সময়ই থাকতে হবে করোনা থেকে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা বা লড়াই।  করোনামুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশা আমরা করি, পাশাপাশি আমাদের ইচ্ছাশক্তি আর চেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে আরেকটু বাসযোগ্য পরিবেশও আমরা গড়তে পারি।  সুন্দর দিনের জন্য চাই সুন্দর মনের মানুষ, চাই তাদের সুন্দর কাজ। সুন্দর মনের মানুষ বের হোক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে, তারা শিখুক সুন্দর কাজ, আমাদের এই দেশ আর এই পৃথিবীটা নিরাপদ হোক, সুন্দর হোক।




স্মৃতি ও স্মরণ

ছবি