৩রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আসা যাওয়ার পথের ধারে…

আপডেট : এপ্রিল ১, ২০২১ ৫:৩০ অপরাহ্ণ

319

গত রাতটি ছিল ভয়াবহ রকমের খারাপ। সারা শরীরজুড়ে ব্যাথা ও গা কাঁপানো জ্বরে কাবু হয়ে পড়েছিলাম। হোটেলের বিছানায় শুয়ে শুধুই দেশের কথা, মায়ের কথাই মনে পড়ছিল। বিদেশ বিভুঁইয়ে আগে কখনো জ্বরে পড়িনি। একটু ভয় ভয় করছিল মাঝরাতে জ্বর বেশী হলে আমাকে কে দেখবে?

যাহোক শেষ পর্যন্ত মায়ের দেয়া ঔষুধে জ্বর সেরেছে।
আগেই বলেছি, প্রতিবার বিদেশে যাবার আগে মা আমার ব্যাগে জ্বর, ঠান্ডা,সর্দি কাশির ঔষুধ দিয়ে দেন। বিরক্ত হয়ে বলতাম, মা এগুলো কেন যে দেন, বিদেশে কি ঔষুধ পাওয়া যায় না?
মা শুনে হেসে বলতেন, এগুলো ব্যাগে থাকুক। কখন প্রয়োজন পড়বে তুই কি জানিস?
আসলেই তো তাই হলো। আমি কি ভেবেছি জ্বর আসবে?
মায়ের দেয়া ঔষুধ না থাকলে গতরাতে আমার যে কি হতো, কে জানে!

সকালে মিল্টনের ফোন।
তুই আমার সাথে দেখা না করে চলে যাবি?
তার কন্ঠে কি যেন ছিল, পরেরবার নিশ্চয়ই দেখা করবো বন্ধু, আমি বলতে গিয়েও পারিনি।

এতো কাছে এসে দেখা না দিয়ে চলে যাব শুনে মিল্টন মনক্ষুন্ন হয়েছিল। ফোনে ওর ভারী কন্ঠ শুনে সিদ্ধান্ত পালটে ফেলি। বাল্যবন্ধুর সাথে দেখা না করে যাওয়া ঠিক হবে না। বাড়তি একটি দিন থেকে মিল্টনের সাথে সময় কাটিয়ে পরেরদিন দুপুরের ট্রেনে ডুসেলডর্ফে যাব।

ডয়েচে ভেলের দুইদিনের অনুষ্ঠান শেষে মিল্টনের জন্যই বনে আরো একটি দিন বেশী থাকা হলো। গতবার বাল্যবন্ধু মিল্টনের বাসায় দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলাম , এবার আমার আঁটোসাটো শিডিউলের কারনে তার বাসায় যেতে পারিনি বলে কস্ট পেয়েছে।

নতুন প্ল্যান অনুযায়ী বনে শেষদিনটি মিল্টনের সাথে টই টই করে কেটেছে। প্রাত্যহিক জীবনের নানান গল্প, অতীতের স্মৃতিচারণে আমরা ফিরে গেছি আশির দশকে। ব্লু রঙের হাফপ্যান্ট, সাদা শার্ট, সাদা মোজা ও কালো জুতো পড়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার দিনগুলিতে।

কৈশোরে আমরা মানে আমি, মোহন, মিল্টন, হাবিব, বাহার,রতন ছুটিরদিনগুলোতে চষে বেড়াতাম।বাসাবো, কমলাপুর রেলস্টেশন, ইনকাম ট্যাক্সের মাঠ, শাহজাহানপুর রেলওয়ে স্কুল, কবি বেনজীর আহমেদের আমবাগিচায়।

আহা আমাদের কি যে দিন ছিল!

দুপুরে ওর বাসায় রাজকীয় স্টাইলে দেশীয় খাবারে ভুড়িভোজন শেষে দুইবন্ধু মিলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াই । হোটেলে যখন আমাকে নামিয়ে দেয়, তখন বন্ধুর বিচ্ছেদ বেদনায় আমার বুক দুমড়ে মুচড়ে উঠে। আবেগ ভালোবাসায় দু’জনের চোখ চিক চিক করে, বিদায় বন্ধু আবার কবে দেখা হবে জানি না। ভালো থাকিস, ভালো রাখিস প্রিয়জনদের।

সন্ধ্যায় মিল্টনের বিদায়ের পর রুমে মটকা মেরে শুয়ে থাকি।কিছুই ভাল লাগে না। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বলতেও পারবো না। সেই ঘুম ভাঙ্গলো পরেরদিন সাত সকালে ।

আটটায় যুবরাজভাই আসবেন আমাকে নিতে। বন থেকে আমাদের যাবার কথা কোলন। সেখান হতে দুপুর দুইটায় ডুসেলডর্ফের ট্রেন।

যুবরাজভাইয়ের আগেই চলে এসেছে মিনহাজ। দুই বছর হলো সে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করছে । তার হাতে ছোট্ট বক্স। কি এনেছো জানতে চাইলে একগাল হাসি দিয়ে বলল,ভাই দেশ থেকে দাদা মিস্টি পাঠিয়েছেন।সেখান হতে আপনার জন্য কিছু নিয়ে এসেছি।’

আমার মিস্টি প্রীতির কথা অনেক সুহ্রদ জানেন বলে বিদেশ বিভুঁইয়ে রেগুলার কমবেশি মিস্টি খাওয়া হয় । বনে মিনহাজ কিভাবে মিস্টির কথা জেনেছে জানি না। তবুও সাত সকালে এতো ভালোবাসায় চোখের কোন ভিজে গেলো। বুকের ভেতরটা হু হু হু করে উঠে।
এ দূর প্রবাসে পাওয়া হঠাৎ ভালোবাসায় আপ্লুত হই। লাভ ইউ ভাই, ভালো থেকো সব সময়।

যুবরাজভাই ঠিক আটটায় হোটেলে চলে এলেন। পূর্বরাতে ব্যাগ গোছানো ছিল। চেক আউট করে বের হতে সময় লাগেনি। বন শহর থেকে বের হয়ে হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুঁটছে সাঁই সাঁই করে। সকালের নরম রোদে দু’পাশের বিস্তৃত সবুজ মাঠে উইন্ডমিলগুলো কাকতাড়ুয়ার মতন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমাঝে অনেক দূরে ছোট ছোট ফার্মহাউজ। অবারিত সবুজের মাঠ চোখ শুধু নয়, মনও জুড়িয়ে দেয়।

এর আগেও যুবরাজভাইয়ের সাথে কোলন গিয়েছিলাম। অসম্ভব আন্তরিক ও সজ্জন একজন মানুষ। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ সুনাম রয়েছে। ছোট বড় সবার সাথে তার উঠাবসা। খুব গুরুত্ব দিয়ে মানুষের কথা শোনেন। কিন্তু নিজে খুব বাক সংযমী। যা বলেন খুব গুছিয়ে বলেন।

কোলন পৌঁছে আমরা চলে যাই যুবরাজভাইয়ের সাইটে। যেখানে তার বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। এখানে কিছু সময় থেকে আমরা চলে আসি কোলন ওল্ড টাউনে। যুবরাজভাইয়ের পুর্ব পরিচিত একটি আফগান রেস্টুরেন্টে বসি। গতবারও এই রেস্টুরেন্টে আমরা বসেছিলাম। এখানকার কাবুলি কাবাব, তন্দুর খুবই মজাদার।

বেলা দু’টোয় আমার ট্রেন। প্রতিবারই কোলন থেকে ট্রেনে ডুসেলডর্ফে যাই। খাওয়া দাওয়া শেষ করে হাতে সময় থাকায় আমরা কিছু সময় উদ্দেশ্যহীন ঘুরি ফিরি। এর একটাই কারন কোলনের সবকিছুই আমার পূর্বে দেখা। নতুন করে উল্লেখযোগ্য কিছু দেখার বাকী নেই।

রাইন নদীর তীরের শহর কোলন। রোমানরা শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয়, এটি জার্মানির প্রাচীনতম শহরগুলির মধ্যে অন্যতম। অনেকেই কোলনকে গীর্জার শহরও বলেন। কারন এই শহরের ল্যান্ডমার্ক হচ্ছে গোথিক ক্যাথেড্রাল। যার নির্মান কাজ শুরু হয়েছিল ১২৪৮ খৃষ্টাব্দে। ইতিহাস বলে, এই ক্যাথেড্রালটির নির্মান কাজ সমাপ্ত হতে ৬০০ বছর সময় লেগেছে! শুনেই আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। বলে কি!

যুবরাজভাইকে বলি, এ ইতিহাস যারা লিখেছেন তারা ক’ছিলিম গাঁজা টেনেছে গবেষনা হওয়া উচিত!
আমার কথা শুনে তিনি হো হো হো করে হেসে উঠেন।
কোথাও ঘুরতে গিয়ে আমি একইস্থান দ্বিতীয়বার দেখি না। নির্মানের দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস গাঁজাখুরি মনে হওয়ায় রোখ চেপে গেল গোথিক ক্যাথেড্রালটি আবার দেখার।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুবরাজভাই আমার সাথে ক্যাথেড্রালের ভেতরে ঢুকলেন। তাকে পিছনে ফেলে আমি দ্রুতলয়ে ঘুরে ফিরে দেখি। এবার দেখায় সত্যি বিস্মিত হই। কি দারুন দক্ষতায়, কারুকাজে বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী কত যত্ন নিয়ে ক্যাথেড্রালটি রোমানরা নির্মান করেছেন। হয়তো নির্মান শুরুর মাঝপথে কাজ থেমে গেছে, হয়তো ডিজাইন পরির্বতিত হয়েছে। হয়তো নতুন চিন্তার প্রতিফলন দেখতে চেয়ে আবার নতুন করে ভেঙ্গেচুরে নির্মান করা হয়েছে।জানি না এজন্যই কি কয়েক শতাব্দী লেগেছে ক্যাথেড্রালটির পূর্নাঙ্গরূপ পেতে!

ইতোমধ্যে ইউনেস্কো গোথিক ক্যাথেড্রালটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষনা করার পর ট্যুরিস্টদের আর্কষনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এটি এখন জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের একটি। এই গোথিক মাস্টারপিস পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম ক্যাথিড্রাল হিসেবে পরিচিত।

ক্যাথেড্রালের পাশে রয়েছে আধুনিক রোমিসিস- জার্মেজিস মিউজিয়াম। এগুলো আমার পূর্বেই দেখা। যারা কোলন শহরে ভ্রমনে আসবেন, যদি প্রাচীন সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুরাগী হন তবে এই দুইটি দর্শনীয় স্থান দেখতে ভুল করবেন না। পুরো একটি দিন এখানে ঘুরে ফিরে দেখার জন্য যথেষ্ট ।

এবার কোলন আসার পর যুবরাজভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম, এই শহরে ইউরোপের সর্বাধিক সমকামী বাস করে। প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সাপ্তাহে গে প্রাইড উৎসব হয়। বিশ্বের নানান প্রান্তের সমকামীরা এখানে জড়ো হন। প্যারেডের পাশাপাশি তাদের অধিকার নিয়ে সেমিনার, ফিল্ম, ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।

অবশ্য এর আগে আমি মন্ট্রিয়েল ও বার্লিনে গে প্রাইড উৎসব দেখেছি।সেগুলোকে কেন্দ্র করে দিনব্যাপী মেলা ও শোভাযাত্রা হয়। সেদিক হতে কোলনের উৎসবটি নাকি ব্যতিক্রম। কখনো জুলাই মাসে এখানে এলে উৎসবটি দেখার ইচ্ছে রইলো।

বেলা দেড়টায় ক্যাথেড্রাল থেকে বের হয়ে স্টেশনে চলে আসি। ঠিক দুইটায় ট্রেন কোলন ছেড়ে যাবে। আমার এবারের গন্তব্য ডুসেলড্রফ। জার্মানের অন্যতম প্রধান শহর। সেখানে থাকেন বন্ধুসম বড়ভাই ইঞ্জিনিয়ার হাসনাত মিয়া। বিকেল পাঁচটায় তিনি ডুসেলড্রফ স্টেশনে অপেক্ষা করবেন।

ট্রেনে চড়ে বসি, যুবরাজ ভাই ট্রেন না ছাড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। কয়েক বছরে তার সাথে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সব সময় তার আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। এরকম সজ্জন মানুষ যখন বিদায়বেলায় দাঁড়িয়ে থাকেন তখন বুকটা কেমন কেমন করে উঠে। কন্ঠ বাস্পরুদ্ধ হয়ে যায়। সজল চোখে হাত নেড়ে বিদায় নিতে কস্ট হয়। তবুও বলি,
এবারের মতন বিদায় যুবরাজ ভাই। আবার কোন একদিন দেখা হবে।

ট্রেন ছেড়ে দেয়।
একটু একটু করে চোখের আড়ালে চলে যেতে থাকে কোলন স্টেশন। একসময় যুবরাজভাইও আমার দৃষ্টির আড়াল হয়ে যান।

বুকের খুব গভীরে তখন বাজতে থাকে,

“আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন।
যাবার বেলায় দেব কারে বুকের কাছে বাজল যে বীন॥সুরগুলি তার নানা ভাগে
রেখে যাব পুষ্পরাগে,
মীড়গুলি তার মেঘের রেখায় স্বর্ণলেখায় করব বিলীন॥
কিছু বা সে মিলনমালায় যুগলগলায় রইবে গাঁথা,
কিছু বা সে ভিজিয়ে দেবে দুই চাহনির চোখের পাতা।
কিছু বা কোন্‌ চৈত্রমাসে
বকুল-ঢাকা বনের ঘাসে
মনের কথার টুকরো আমার কুড়িয়ে পাবে কোন উদাসীন…”

১৮.০৪.২০১৪
কোলন, জার্মান




ছবি