২৫শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অসহায় মৃত্যু,নিঃসঙ্গ যাত্রা

আপডেট : মে ২০, ২০২০ ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

484

আনিস আলমগীর, সিনিয়র সাংবাদিক

[ফটো সাংবাদিক মিজানুর মৃত্যু গণমাধ্যামের সবাইকে আলোড়িত করেছে। মিজানের সহকর্মী ছিলেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তাকে নিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন ‘বন্ধুর জন্য শোকগাঁথা’। লেখাটি নীচে তুলে ধরা হলো]

করোনা আর রোজা মিলিয়ে দিনরাত এর কর্মসূচি উল্টে গেছে। একেবারে সেহেরি খেয়ে ঘুমাই। অনেকের ফোন ধরতে পারি না বেলা করে ঘুম থেকে উঠি বলে। চারিদিকে শুধু মৃতুর খবর। আজ জেগেই ইনবক্সে খবর পাই মিজান আর নেই। মিজানুর রহমান খান (৫৪) ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় আমার কলিগ ছিল। তারসঙ্গে বন্ধুত্ব সেই ধানমন্ডি এক নম্বর রোডের বেল টাওয়ার থেকে। আমাদের নগর কেন্দ্রীক বন্ধুত্বগুলো বেশিরভাগই হয় ধান্দা আর লেবেল মেইনটেইন করে। আমরা ছিলাম লেবেল ছাড়া, বিচরণ ক্ষেত্র আলাদা। ওর সরলতা আমাকে মুগ্ধ করতো। পাগলা বলে ডাকতাম। ঝগড়ায় ঝগড়ায় বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ওকে ডাকলেই বাসায় আসতো, কোনো আয়োজনে তার বাসায়ও ডাকতো। সর্বশেষ ডেকেছিল তার ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে। করোনার মধ্যে দেখা হয়নি। কললিস্টে দেখছি গত ৫ মে তার মিসকল পড়ে আছে। নর্মালি সে একেবারে কল করে ক্ষান্ত হয়না, সেদিন আর কল করেনি। শিওর আমি অসময়ে ঘুম থেকে জেগে রিপ্লাই দিতে ভুলে গিয়েেছি। আজ বন্ধু লিটনের কাছ থেকে খবর পেয়ে প্রথমে ওর বাসায় ফোন করি। কে ধরেছে জানি না, শুধু ভাবীর কান্না শুনছিলাম। ওর ছেলের সঙ্গে কথা বলে ঘটনা নিশ্চিত হলাম। আমি জানতাম ও কিডনির সমস্যায় ভুগছে অনেক দিন ধরে। একটু বেখেয়ালি ছিল। আজ জানলাম করোনার কিছু লক্ষণ ছিল সেটা নিয়েই সে ডিআরইউ গিয়েছিল, সেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়লে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছে। কিন্তু পরীক্ষা ছাড়া তো নিশ্চিত হতে পারছি না তার করোনা হয়েছে কি- হয়নি। দুপুরের পর ওর জিগাতলার বাসায় গিয়েও দেখলাম কান্নার রোল। ভাবী বিলাপ করছেন- আমার সোনার মানুষটি চলে গেলো..। কিছু নিকটাত্মীয় ছিল। ওর ছেলে শাফিনকে পেলাম। মিজানের বাবা-মা আরিচার থাকেন, উনারা আসতে পারেননি। আবার করোনা সন্দেহকরা লাশ দাফন নিয়ে গ্রামে ঝামেলা এড়ানোর জন্য ঢাকার দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় মসজিদে গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, বাদ আসর জানাজা পড়লাম সেখানেই। মিজান সর্বশেষ বাংলাদেশের খবর নামে একটি পত্রিকায় কাজ করতো। আমি তার পত্রিকার কাউকে দেখলাম না সেখানে। ছিল না ফটোজার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের কেউ, সাংবাদিক ইউনিয়নের কেউ বা অন্য কোনও সাংবাদিকক। করোনা কালের মৃত্যুতে যেখানে ছেলে মৃত বাবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আসছে না, আপনজনকে খুঁজে পাওয়া যায় না- সেখানে সবাইকে পাবার প্রত্যাশাও করিনি। তবে মিজান খুব সৌভাগ্যবান- মসজিদ ভর্তি মানুষ তার জানাজায় অংশ নিয়েছে। পবিত্র রমজান মাসের পবিত্র রজনীর আগে সে জানাজা পেল। এই পবিত্র রাতে অনেকের দোয়া পাবে সে। তাকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। খুব খারাপ লাগছে তার অকালে চলে যাওয়াতে। কলেজ পড়ুয়া ছেলে আর একটি অবুঝ মেয়ে, স্ত্রীকে রেখে চলে গেল। সংসার চলত তার যৎসামান্য আয়-রোজগারে। এখন কে ধরবে তার সংসারের হাল!




স্মৃতি ও স্মরণ

ছবি