২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

৬৪তম বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

আপডেট : আগস্ট ৩০, ২০২০ ৩:১২ অপরাহ্ণ

76

২০১৪ সালে জার্মান ট্যুরে আমার অফিসিয়াল কাজ শেষে প্রধান লক্ষ্য ছিল ৬৪ তম বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল দেখার। একজন চলচ্চিত্র সংসদকর্মী হিসেবে এই ফেস্টিভ্যাল সম্পর্কে আগ্রহ ও জানাশোনা অনেক আগে থেকেই ছিল।

এবার বার্লিন যাত্রার আগেই ঢাকায় বসে যখন জানতে পারি ফেস্টিভ্যালের সময়সুচী, তখনই সিদ্ধান্ত নেই ফেস্টিভ্যালে ঢুঁ দিবো। ঢাকায় বসে ফেস্টিভ্যালের অর্গানাইজারদের সাথে মেইলে যোগাযোগ করি। তারা প্রত্যুত্তরে জানান, রেজিষ্ট্রেশন ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে।তুমি নেক্সট ফেস্টিভ্যালের আগেভাগে যোগাযোগ করো।

আমি দমে না গিয়ে শরনাপন্ন হই বার্লিনে আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর। তাকে মেইলে জানাই, যে কোনভাবে হোক আমার জন্য ফেস্টিভ্যালের এক্রেডিয়েশন কার্ড ম্যনেজ করতে হবে।

সে আমাকে আশ্বাস দেয়ার পর আমার ডিটেলস ও ছবি পাঠিয়ে দেই।কিন্ত ঢাকায় আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না। অনেকটা মন খারাপ করে আশা ছেড়ে দিয়ে বার্লিনে উড়ে যাই ইউরেশিয়া ল্যাংগুয়েজ স্কুলের শিডিউল প্রোগ্রামে।

বার্লিনে নেমেই আমার কাজের ব্যস্ততায় ভুলে গিয়েছিলাম ফেস্টিভ্যালের কথা।
বার্লিনে আমার চতুর্থদিন বিকেলে হঠাৎ ফোন আসে শুভাকাঙ্খী যুবরাজ ভাইয়ের। তিনি জানান, আপনার একটা স্পেশাল পাস তারা ইস্যু করেছে। যাতে সাংবাদিক হিসেবে ফেস্টিভ্যালের বিভিন্ন ভেন্যুতে অবাধে যেতে পারবেন, সিনেমা দেখতে পারবেন।কার্ডটি কাল সকালে ফেস্টিভ্যাল অফিস থেকে কালেক্ট করে নিতে হবে।
ওয়াও।

সেদিন সারাটি বিকেল,সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি আমার আনন্দ কে দেখে! মুশকিল হচ্ছে আমি একা একা ফেস্টিভ্যাল অফিস যাই কি করে,রাস্তা ঘাট তো কিছুই চিনি না?
রাতেই সেই সমস্যার সমাধান করে দেন জসিমভাই। ছুটি থাকায় তিনি আগামীকাল আমাকে ভেন্যুতে নিয়ে যাবেন।

পরেরদিন সকালেই ফ্রেডরিখ স্ট্রাসে ফেস্টিভ্যাল অফিস থেকে কার্ড সংগ্রহ করি। বিকেল থেকে পোস্টারডামের মুল ভেন্যুতে সিনেমা দেখা শুরু করে দেই। প্রথমেই ট্যালেন্ট ফোরামের অনেক ছবি দেখার সুযোগ হয়৷ এখানে বড় বাজেটের বা বাণিজ্যিক কোনো ছবি থাকে না, তাই তরুণ প্রতিভাবান অনেক পরিচালক এখানে তাদের মুভিগুলো দেখানোর সুযোগ পান। যেগুলোর বেশ কয়েকটি আমাকে অভিভূত করেছে৷ তাদের চিন্তা ভাবনায় নতুনত্ব আছে৷

পরপর দুইদিন ফেস্টিভ্যাল ভেন্যুতে আমার সময় কাটে সিনেমা দেখে। ট্যালেন্ট হান্ট বিভাগে ব্রাজিল, সাউথ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, সার্বিয়া, প্যারাগুয়ে ও সেনেগালের তরুনদের নির্মিত সিনেমা মুগ্ধ করে। তাদের গল্পবলার স্টাইল, নির্মান ভাবনা, এক্সপেরিমেন্ট সত্যি চিন্তার খোরাক জোগায়।

একটি সিনেমা দেখে আরেকটি সিনেমা দেখার মাঝের সময় কফি হাতে ঘুরে ঘুরে দেখেছি সিনেমা সংক্রান্ত বই পুস্তকের পাশাপাশি নানান রকম ক্যামেরার প্রদর্শনী।
চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে বার্লিন ইন্টান্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল খুব গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।সারাবিশ্বের চলচ্চিত্র প্রেমীরা আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকেন উৎসবের খবরা খবর জানার জন্য। বিশ্বের কোন প্রান্তের সিনেমা গোল্ডেন বিয়ার বা স্বর্ন ভল্লুক জিতে শ্রেষ্ঠ সিনেমার সম্মান অর্জন করবে, কোন পরিচালক শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান ছিনিয়ে নিচ্ছেন, এসব নিয়ে নানান জল্পনা কল্পনা চলে ফেব্রুয়ারী মাসজুড়ে।

উৎসবটি বার্লিনেল নামেও পরিচিতি, বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব। এটি প্রতি বছর জার্মানির বার্লিন শহরে অনুষ্ঠিত হয় । ১৯৫১ সালে পশ্চিম বার্লিন শহরে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে ১৯৭৮ সাল থেকে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজিত হয়। অস্কার, কান,ভেনিসের পর এটি বিশ্বের বৃহত্তম চলচ্চিত্র উৎসব। বিভিন্ন শাখায় চারশ’র মত চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। ২০টির মত চলচ্চিত্র স্বর্ণ ভল্লুক ও রৌপ্য ভল্লুক পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। এবারের উৎসবের উদ্বোধনী সিনেমা ছিল দ্যা গ্র‍্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল।

বার্লিনেলে প্রদর্শিত প্রথম চলচ্চিত্র হল আলফ্রেড হিচকক পরিচালিত রেবেকা। যদিও ১৯৪০ সালে ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে জার্মানিতে অনেকেই ছবিটি দেখতে পারে নি।

উৎসবের প্রতিযোগিতায় অনেকগুলো বিভাগ রয়েছে।শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা- অভিনেত্রী, আজীবন সম্মাননা, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য ছাড়াও রয়েছে প্যানারোমা। এ বিভাগে ট্রান্সজেন্ডারদের উপর মুভিগুলো প্রাধান্য দেয়া হয়৷ তবে একেক ফেস্টিভ্যালে এর একেকটা ধরন থাকে৷ বার্লিনালেরও ভিন্নতা রয়েছে সেই জায়গায়৷ এলজিবিটি বিষয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য রয়েছে টেডি পুরস্কার।

উৎসবের শেষদিন সিনেম্যাক্সে দেখেছি জার্মান পরিচালক ডিটারিখ বার্গমানের ‘স্টেশন অফ দ্যা ক্রস ‘ সিনেমা। খুব আহামরি ভাল লাগার মতন ছবি বলা যাবে না। তবে এ ফেস্টিভ্যালে মোট তিনদিনে ৭টি সিনেমা দেখা হয়েছে। আমার কাছে ফোরামে প্রদর্শিত তরুনদের সিনেমাগুলোই বেশী ভাল লেগেছে।সবচেয়ে ভাল লেগেছে প্রতিদিন প্রচুর দর্শকের উপস্থিতি।