২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হীরকের শহর আন্টারপন

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১ ১০:৩৬ অপরাহ্ণ

29

২০০৯ সালের নভেম্বর। বার্লিনে ইউরেশিয়া ইনস্টিটিউটের দুইদিনের অনুস্টানমালা শেষে আমি চলে গিয়েছিলাম বেলজিয়াম। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ক্ষুদ্রতম ও সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির একটি। বেলজিয়াম হচ্ছে ইউরোপের সর্বাধিক নগরায়িত দেশ।জনগোষ্ঠীর মোট সাতানব্বই ভাগ লোক শহরে বাস করে। দেশটির শাসনব্যবস্থায় রাজতন্ত্র বহাল রয়েছে।

এবার বার্লিন থেকে সরাসরি বাসে এসেছি আন্টারপন।শেল্ড্টের নদীর তীরের বন্দর শহর হিসেবে যার পরিচিতি।শহর হিসেবে আন্টারপন খুব বড় নয়। হীরকের ব্যবসার জন্য শহরটির সুখ্যাতি রয়েছে। এই শহরে রয়েছে হাজার হাজার হীরা ব্যবসায়ী, কাটার এবং পলিশার । ওল্ডটাউনের সেন্ট্রাল স্কয়ার গ্রোটা মার্কেটের কাছে ফ্লেমিশ রেনেসাঁ আর্কিটেকচার দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ভীড় করেন। খুব কাছেই রয়েছে পল রুবেন্স হাউজ। যেখানে সতেরো শতকের চিত্রশিল্পী পিটার পল রুবেন্সের অসংখ্য চিত্রকর্ম রয়েছে ।

আন্টারপনে রয়েছে ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন রেলপথ ও পৌনে দুইশত বছরের পুরানো সেন্ট্রাল রেলস্টেশন। নির্মান স্থাপত্যে বহন করে চলেছে প্রাচীন গোথিক ও রোমান নির্দশন।

আন্টারপন যাবার উদ্দ্যেশ সেখানে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী দুই বড়ভাই ওমর ফারুক ও প্রিয়জন নিপুভাই থাকেন। অনেকবার পরিকল্পনা করেও জার্মান বা ফ্রান্স থেকে সেখানে যাওয়া হয়ে উঠেনি। এ যাত্রায় ফারুকভাইয়ের বাসায় দুইরাত থেকে ব্রাসেলস হয়ে গিয়েছিলাম হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট।

নভেম্বর মাস আসলে ইউরোপ ঘোরার জন্য মোটেও ভাল সময় নয়। তাপমাত্রা থাকে হিমাংকের নীচে। প্রচন্ড শীত ও তুষারপাতে আমার মতন অনভ্যস্তদের জন্য ভীষন অসহনীয় ও অস্বস্তিকর। মোটা কাপড়, জ্যাকেট,কান টুপি,গ্লোভস ও স্নোবুটে আমার কেমন যেন আইটাই লাগে,স্বস্তি পাই না।

ইউরোলাইন বাস থেকে নেমে রোদ দেখে বেজায় খুশী হয়েছিলাম। কল্পনায় ছিল না চারদিক জুড়ে সোনারঙা আলোর ঝিকিমিকি, ঝকঝকে পরিস্কার আকাশ দেখবো। মোবাইলে গুগল ঘেটে আবহাওয়ার রিপোর্ট দেখে জেনে যাই, আগামী দুইদিন বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত নেই। যাক এ যাত্রায় দু’টো দিন ভালোয় ভালোয় কেটে যাবে! কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি। যখন তাপমাত্রা দেখলাম মাইনাস ১৬, তখন আমার হাসিখুশী মুখ কালো হতে বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি। মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দেই, ‘হাই রনি, তুমি এসেছো উইন্টারে, ঠান্ডার সময় ঠান্ডাতো কিছুটা থাকবেই। ‘

বাস স্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ওমর ফারুকভাই। ডুসেলড্রফ থেকে ইঞ্জিনিয়ার হাসনাতভাই তাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন আমার বাস কখন পৌঁছাবে। ঠিক সময়ে বাস আন্টারপন পৌঁছে যাওয়ায় কনকনে ঠান্ডার মাঝে ফারুকভাইকে আমার জন্য বেশীক্ষন অপেক্ষা করতে হয়নি।

ফারুকভাইয়ের গাড়িতে যেতে যেতে অনেক কথা হয়।তিনি ফেনির মানুষ। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তাঁর প্রবাস জীবন। যৌবনের শুরুতেই দেশ ছেড়েছেন। নানান দেশ ঘুরে অবশেষে বেলজিয়ামে থিতু হয়েছেন একযুগেরও বেশী সময়। কঠিন লড়াই সংগ্রাম করে প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেইসব কাহিনী কল্পনার গল্পকেও হার মানায়। একটা পর্যায় এসে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে সফল হয়েছেন। এই ছোট শহরে তাঁর যথেস্ট নামডাক রয়েছে।ফেনির ওমর ফারুক, এই নাম বললেই সবাই একবারে চেনেন।

ফারুকভাইয়ের বাসা শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে যাই। তিনতলায় তাঁর বেডরুমের পাশে আমার থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকেলে শহর ঘুরতে বের হবো। বিশেষতঃ ওল্ডটাউন ও সিটিহল। ল্যাগেজ রেখে দ্রুত শাওয়ার নিয়ে দোতলায় যেতে চক্ষু ছানাবড়া। ডাইনিং টেবিলের পুরোটাজুড়ে নানান পদের খাবার সাঁজানো।ফারুকভাই ও ভাবীর খাবারের বাহারী পদ দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন মেহেমানদারীর জন্য শাহী আয়োজন।
এই আয়োজনে কি ছিল না!
সাদা ভাত থেকে পোলাও, বিভিন্ন পদের ছোট মাছ থেকে বড়মাছ, চিকেন থেকে মাটন-বিফ, শাক সবজি থেকে ভর্তা-ভাজি-ডাল, সালাদ, পায়েশ, মিস্টি সবই ছিল। রীতিমতন ভড়কে যেতে হলো। ভয় পেয়ে বলি,
ভাই, কথা হচ্ছে মানুষ তো আমি একা, এতো পদ খাই কি করে?
যা পারেন একটু একটু করে সব কিছু খেতে হবে।
কে শোনে কার কথা!
জোর করে এটা সেটা পাতে তুলে দেন।
কপালে লেখা ছিল, পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে!

খাওয়া শেষে আমার তো নড়ন চড়ন বন্ধ। কিছু সময় ঝুটা হাতে চেয়ারে বসেছিলাম। তা দেখে ফারুকভাই ও ভাবী হেসে অস্থির।
কিছুই তো খেলেন না। আপনার বয়সে কত কিছু হজম করে ফেলেছি।

এতো বেশী খাওয়া হয়েছে যে, আমার আর মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। হাত ধুয়ে এসে ‘রাতে আর খাবো না ভাবী’ বলেই বাসা থেকে বের হয়ে যাই।

বিকেলের আলো ফুরানোর আগেই ফারুকভাইয়ের সাথে গেলাম সেন্ট্রাল রেলস্টেশন দেখতে। পৌনে দুইশত বছরের পুরানো। ইউরোপের প্রাচীনতম একটি রেল স্টেশন। এখান হতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়া যায়।

সামান্য হেঁটেই যাওয়া হলো আন্টারপন সিটি হলে। সামনে দু’চারটে বেঞ্চ পাতা আছে, যাতে বসে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। অনেকগুলো পুরানো বিল্ডিং। বেশিরভাগই গোথিক আর্কিটেকচারে তৈরি। গোথিক কালচারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাইবেল, ছোট ছোট মূর্তি দিয়ে দেয়াল ডিজাইন করা হয়েছে।
বিল্ডিংগুলোতে ছোট ছোট জানালা। ভেতরটা গোলাকৃতির। ঘরে আলো হাওয়া যাতে প্রবেশ করতে পারে সেভাবেই ডিজাইন করা।

বেলজিয়ামের শহরগুলোর মধ্য দিয়ে প্রচুর খাল বা ক্যানেল রয়েছে।এর আগে ওয়াটারলু, ব্রাসেলসে দেখেছিলাম।সবচেয়ে বেশী খাল সম্ভবত ব্রুজ সিটিতে রয়েছে। সেখানে বাড়িঘর ঘেঁষে সেইসব খাল বয়ে গেছে। তাই ব্রুজকে ভেনিসের সাথে তুলনা করা হয়।কিন্তু আন্টারপনে তেমন একটা খাল নেই। যা দু’একটা দেখলাম তা রাস্তার পাশ দিয়েই গায়ে গায়ে ঘেঁষে চলে গেছে । লম্বা সরু এসব খাল কেমন যেন সাপের মতন একেবে‌ঁকে গেছে। এপার-ওপার যাওয়া আসা করার জন্য রয়েছে ছোট ছোট পুল। ক্যানেলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে নৌকা আর ছোট বাষ্পচালিত চাকাওয়ালা জাহাজ। সামারে প্রচুর দর্শনার্থী এসব নৌকা করে ঘুরে বেড়ায়।

সেন্ট্রাল স্টেশনের আশেপাশে অনেক খাবারের দোকান চোখে পড়ে। সব দোকানে দেখলাম কমন খাবার ফ্রেন্স ফ্রাই। অনেকের মতন আমারও ধারনা ছিল ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হচ্ছে ফ্রান্সের আবিস্কার।কিন্তু এই ভুল ধারনা ভেঙ্গে গেল আন্টারপন এসে।

জানলাম ফ্রেন্স ফ্রাই বেলজিয়ামই প্রথম খাবার হিসেবে নিয়ে আসে। ফ্রেন্সফ্রাই ছাড়াও এখানকার ফিঙ্গার টিপস, সস, মেওনেজ আর স্ক্রিম পটেটোর সুনাম রয়েছে। পেটে জায়গা না থাকায় এসবের স্বাদ চেখে দেখা হলো না। একটি ছোট কফিশপ থেকে রেগুলার কফি হাতে নিয়ে ঘুরতে থাকি।

সন্ধ্যায় চলে আসি ফারুকভাইয়ের গ্রোসারিতে। তার ভাগিনা মিজান মুলতঃ দোকান দেখাশুনো করেন। গ্রোসারির খুব কাছেই আন্টারপন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ হোস্টেল। এখানকার নিয়ম অনুযায়ী দোকানটি প্রতিদিন খোলা হয় বিকেল পাঁচটায়, বন্ধ হয় ভোর ছয়টায় । হোস্টেলগুলোর কাছে গ্রোসারিটি হওয়ায় সারারাতই কেনাকাটা করতে আসে শিক্ষার্থীরা।
রাতে নিপুভাই ও মোশারফভাই এলেন দেখা করতে। গ্রোসারির ভেতরে চারজন মিলে কথা, গল্পে চলল আড্ডা। শেষ হলো রাত ১টায়।

পরের দিন ছিল রবিবার। ছুটির সকাল বলেই একটু দেরীতে আমাদের ঘুম ভাঙে। নাস্তা সেরে বের হতেই বেলা গড়িয়ে যায়। দুপুরে ফারুকভাইয়ের সাথে শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ফিরে দেখি। প্রশস্ত রাস্তা ঘাটে ঝাঁ ঝকঝকে গাড়ির পাশাপাশি পুরানো গাড়িও চোখে পড়ে। তবে এগুলো আমাদের দেশের মতন ভাঙ্গাচেরা কিংবা আনফিট গাড়ি নয়।

ফারুকভাই জানালেন, বেলজিয়াম হচ্ছে বিয়ার আর চকলেটের দেশ। নানান পদের বাহারি নামের বিয়ার পাওয়া যায়। প্রায় আটশ প্রকারের বিয়ার রয়েছে বেলজিয়ামে। রাস্তার আশপাশে প্রায় সব জায়গায়তেই ছোট বড় অসংখ্য বার, পাব, ক্লাব রয়েছে। দেশে থাকতেই শুনেছি বেলজিয়ানদের বিয়ার প্রীতির কথা।এদের উৎপাদিত বিয়ারের খ্যাতি তো জগৎজুড়েই।কিছুদুর হাঁটলেই চোখে পড়ে কেউ কেউ পাব বা বারে বড় বড় গ্লাসে বিয়ার পান করছে। কোথাও খেতে বসলে কয়েক প্রকারের বিয়ার না হলে ওদের যেন পানাহার হয় না। এখানকার চকোলেট নাকি খুবই বিখ্যাত। প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ টনের বেশি চকলেট তৈরি হয় বেলজিয়ামে।

ফারুকভাইয়ের বাসার কিছুদুরে ছুটির দিনগুলোতে হলিডে মার্কেট বসে। কেউ কেউ ওপেন মার্কেট বলেন।অনেকটা আমাদের দেশের গ্রাম গঞ্জের সাপ্তাহিক হাটের মতন। বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষুদে ব্যবসায়ী, উৎপাদক সরাসরি তার পন্য নিয়ে হাজির হন। তুলনামুলক সস্তায় জিনিসপত্তর পাওয়া যায় বলেই মানুষজন তার প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে আসেন। হলিডে মার্কেটে অনেক খাবারের দোকান থাকে।সবই ফাস্টফুড টাইপের। অনেককে দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছেন। এদের খাওয়া দেখে আমার কোলকাতার স্ট্রীটফুড খাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। খাবার গরম বা ভাঁজার সময় চারপাশ গন্ধে কেমন মৌ মৌ করে উঠে। তেমনি গন্ধ পেলাম ওপেন মার্কেটে।
এখানে ঘুরে ঘুরে দেখি সবজি থেকে ইলেক্ট্রনিক পন্য, শার্ট, গেঞ্জি সবকিছু পাওয়া যায়। বেশ ক’জন বয়স্ক পুরানো এনটিক জিনিস নিয়ে এসেছেন। আগ্রহ নিয়ে কিছু কাঁসা ও রৌপ্য দিয়ে তৈরি জিনিস দেখি।স্যুভেনিয়র হিসেবে কিনে ফেলি কাঠের তৈরি স্ফিংকসের মুর্তি।

শুরুতে বলেছিলাম আন্টারপন সিটি ডায়মন্ড বা হীরকের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। বলা হয়ে থাকে, দুবাই, সিঙ্গাপুর, লন্ডনের মতন আন্টারপনও হীরার দাম দস্তর উঠানামায় বিশ্ববাজারকে নিয়ন্ত্রন করে। কেনার সামার্থ্য না থাকায় অনেকটা অতৃপ্তি নিয়ে বেশ বড় বড় কয়েকটি ডায়মন্ড বিক্রির দোকান ঘুরে ফিরে দেখি।

আন্টারপনের ওল্ডটাউনে ২৬ তলা উঁচু কেবিসি বিল্ডিং দেখে বাসায় ফিরে আসি সন্ধ্যার আগেই। ফ্রেশ হয়ে সাত সন্ধ্যায় ডিনার সেরে কিছু সময় নিপুভাই, ফারুকভাইসহ গল্প করে ঘুমিয়ে পড়ি। পরের দিন খুব সকালে আমার ট্রেন। ব্রাসেলস থেকে বুদাপেস্ট যাব। এবারের ঝটিকা ভ্রমনে আন্টারপনের অনেক কিছুই দেখা হলো না। বিশেষ করে হীরার শহরে এসে হীরার ইন্ড্রাস্টি না দেখার আক্ষেপ রয়েই গেল।