১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ষ্পর্শকাতর নাগরিক ও মা-বাপ ‘সরকার’ এর কাছে অনুরোধ

আপডেট : এপ্রিল ৫, ২০২১ ২:১৯ অপরাহ্ণ

18

পথহারা পথিকের কথা

করোনা কখনো দেশ থেকে বিদায় নেয়নি। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় আর এ কারণে প্রথম মৃত্যু ১৮ মার্চ। তারপর এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। করোনা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে, মৃত্যুর সংখ্যা কখনো সবার মধ্যে আতংক সৃষ্টি করেছে আবার কখনো সে সংখ্যাটি অনেক কম হওয়ায় মানুষের মন থেকে ভয় কিছুটা কমেছে। এরপরে ধীরে ধীরে মৃত্যু আর শনাক্তের সংখ্যা যত কমতে থাকলো ততই মানুষের মন থেকে ভয়টা দূর হলো, শুধু ভয় নয় অনেকটা বিদায় নিলো সতর্কতা আর সচেতনতা। একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে সব খোলা। ( অবশ্য সবচে ঘণবহুল শিক্ষা কওমি মাদ্রাসা খোলা)।

সব স্থানে মানুষের উপস্থিতি স্বাভাবিক, জীবনকে স্বাভাবিক করতে হয়তো এমন স্বাভাবিকতার প্রয়োজন ছিল কিন্তু সতর্কতা ও সাবধানতা বিষয়টি কেন এত অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠলো? দেশের মানুষকে শেখানো কোন সহজ বিষয় নয়, শক্ত হাতে আইন মান্য করানোটাও বেশ কঠিন, সরকার তাই রশি ঢিলে করেছে, আর মানুষ সেই ঢিলে রশি একেবারে খুলে ফেলেছে। গত বছর মসজিদে দেখেছি প্রত্যেকটি মানুষের মুখে মাস্ক, কিন্তু গত কয়েক জুমা ধরে দেখছি মাস্ক পড়া মানুষের দিকে সবাই আড় চোখে তাকায়। মার্কেট, কর্মস্থল, বাসসহ সব গণপরিবহন কোথা্ও ছিল না স্বাস্থ্যবিধির বালাই, সবার আচরণে এমন একটা ভাব ছিল যেন ‘সদ্য স্বাধীন’ হয়েছি আমরা। একটু বল্গাহীন তো হওয়াই যায়। বাংলাদেশের মানুষ আবার একটু বেশিই ষ্পর্শকাতর। আমার মুখে মাস্ক নেই, এটা আপনি বলার কে? এই বাক্যটি শোনা কোন ভদ্রলোকের জন্য সম্ভব নয়, তাই ‘মুখোশধারী’ ভদ্রলোকরা অনেক সময় চোখ বুজে সহ্য করেছেন পাশের মুখোশবিহীন যাত্রীর মোবাইলে প্রায় পুরোটা পথ ধরে বলা প্রেম, বিরহ কিংবা পারিবারিক নানা টানাপোড়েনের গল্প।
যাইহোক করোনা বিদায় নেয়নি, বার বার সেটি তার ধরণ বদলাচ্ছে। এবার নাকি নতুন রূপে, আরও শক্তিশালী হয়ে হানা দিয়েছে। বিষয়টা প্রমাণিত সত্য, মৃত্যু আর শনাক্তের সংখ্যার দ্রুত বড় হওয়া কিন্তু তাই প্রমাণ করে।
করোনা মোকাবেলায় এবার আমাদের প্রস্তুতি ভাল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে বিপরীত টিত্রই দেখতে পাচ্ছি। ‘লকডাউন’ ঘোষণা নিয়ে তেলেসমাতি কারবার। বলা হচ্ছে ‘লকডাউন’ কিন্তু সব খোলা, শুধু গণপরিবহন বন্ধ। যানবাহনই যদি বন্ধ থাকে তাহলে রায়ের বাগের মিজান পুরানা পল্টনে কিভাবে যাবে? সায়দোবাদের রহমানই বা কীভাবে যাবে কাওরান বাজার, মিরপুরের নর্গিস বেগম কিভাবে যাবেন নিউ মার্কেট? উত্তরার সুলতান কিভাবে যাবেন মতিঝিল? ফলে লকডাউনের প্রথম দিনটাতেই আজ সোমবার দেখা গেল, পুরো নগর জুড়ে বিশৃঙ্খলা, মানুষ লকডাউনের বিরুদ্ধে মিছিলও করেছে।
সরকার ‘মা-বাপ’ সরকার যা করেছে তা আমাদের ভালর জন্যই করে এই বিশ্বাস নিয়ে যারা আইন মানতে চান তারা হেটে হেটেই গন্তব্যে রওনা দিয়েছেন। সন্ধ্যায় তারা যখন ঘরে ফিরবেন তখন হয়তো ওই পদযুগলই তাদের ভরসা হবে। কিন্তু ৫+৫=১০ কিলোমিটার কিংবা আরও বেশি রাস্তা হেটে অফিস করা আবার বাসায় ফেরা কতটা কঠিন তা সরকার বা ‘মা বাপ’ এর বুঝতে হবে।
অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা হাস্যকর যা আরও অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। আমরা মনে করি সরকারের উচিত লকডাউন কার্যকরে আরও বেশি হোমওয়ার্ক করা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কিংবা সচিবালয়ে বসে বসে কয়েক দফা নির্দেশনা লিখে তা প্রচার করে দিয়ে ভাবলেন এবার মানার দায়িত্ব জনগণের অতোটা আশা করা ঠিক না। মানুষ যাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়, দুর্ভোগ কম হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চয়ই সরকারের সংশ্লিষ্টরা তা নিয়ে ভাবছেন।

সরকার বিবেচনায় নেবে এই ভরসায় কয়েকটি ধারণা বা প্রস্তাব দিচ্ছি।
১. কাল মঙ্গলবার থেকে বৃহষ্পতিবার এই তিন দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন।
২. এই তিন দিন সরকারি কোন কোন অফিস কত জনবলে চলবে তা ঠিক করে বৃহষ্পতিবার বিকেলে ঘোষণা দিন।
৩. শুক্র ও শনিবার প্রত্যেকটি অফিস থেকে জানিয়ে দেয়া রবিবার থেকে কারা কারা অফিসে আসবে ( রোস্টার ঠিক করা)।
৪. গণপরিবহন বন্ধ করা যাবে না। রাজধানীর প্রত্যেকটি রুটেই অন্তত: অর্ধেক পরিমাণ গাড়ি চালাতে হবে। গাড়িগুলোতে দুই আসন এক যাত্রী নীতি পরিচালনা করেন কিন্তু সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টপেজ থেকে গাড়ি ছাড়তে হবে। ধরা যাক বলাকা বাস, এটি সায়েদাবাদ থেকে গাজীপুর যায়। এখন সব গাড়ি যদি সায়েদাবাদ থেকে আসন ভর্তি হয়ে যায় তাহলে মালিবাগ, মগবাজার, মহাখালি থেকে মানুষ কিভাবে উঠবে? সে জন্য রুটের দূরত্ব কমিয়ে কিছু গাড়ি গাজীপুর থেকে মহাখালি পর্যন্ত এসে ফের গাজীপুর যাবে, কিছু গাড়ি গাজীপুর থেকে মগবাজার পর্যনর্ত এসে ফের গাজীপুর যাবে, এতে ওই এলাকায় অপেক্ষমাণ মানুষ গাড়ি পাবে। তিনটি গাড়ি পুরো রুটে চলবে এরপর একটি গাড়ি যদি মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হয় তাহলে মানুষের গাড়ি পেতে কোন সমস্যা হবে না। উল্টো পথের বেলায়্ও একই নিয়ম করা, কিছু গাড়ি মহাখালি গিয়ে ফিরবে, কিছু গাড়ি বিমানবন্দর থেকে ফিরবে, কিছু গাড়ি আবদুল্লাহপু গিয়ে সায়েদাবাদ ফিরবে। এভাবে নগরবাসের অন্যান্য রুটেও এটা করা যায়, মিরপুর থেকে মতিঝিল কিংবা উত্তরা থেকে সদরঘাট যায় এমন কিছু গাড়ি মাঝের দু’তিনটি জায়গা পর্যন্ত যদি রুটের শেষ করা হয় তাহলে তারা ঘোরার পথে যাত্রী নিয়ে যেতে পারবে।
৫. ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা সম্ভব। শুধু অনলাইন চালু রেখে, অর্ধেক শাখা বন্ধ রাখতে হবে। (এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক খোলার দিন ঠিক করে দিতে হবে)। যদি সীমিত জনবল দিয়ে সব ব্যাংক চালু রাখা হয় তা কোন সুফল দেবে না, ব্যাংকের কর্মী কম কিন্তু গ্রাহক ঠিকই আসবে, এতে কর্মীদের ওপর উল্টো চাপ পড়ে, গ্রাহকদেরও অনেক সময় যায় তারা হেনস্তারও শিকার হন।

৬. মার্কেট খোলা রাখার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম করা। এলাকাভিত্তিক মার্কেট খোলা রাখার ব্যবস্থা এখনই আছে, একে আরও নিবিড় করতে হবে। অর্থাৎ সাপ্তাহিক বন্ধের এলাকা আরও সীমিত করতে হবে। মিরপুর এলাকার মার্কেট খোলা থাকলে, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া বন্ধ থাকবে, পরের দিন ওই এলাকা খোলা থাকবে। অর্থাৎ মানুষ যেন একদিন না যেতে পারলেও পরের দিন যেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. মার্কেটগুলো দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখা। মার্কেটের খাবার দোকানগুলো সব খোলা রাখা যাবে না। সপ্তাহে দু’তিন করে একটি দোকান খোলা রাখা।
৮. হোটেল রেস্তোরাও খোলার সময় দিয়ে দিতে হবে। সকাল থেকে রাত ১২টা নয়, সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা রাখা যেতে পারে।
৯. কাচাবাজারও দিন রাত খোলা রাখা যাবে না। সকাল সাতটা থেকে সর্বোচ্চ রাত আটটা পর্যন্ত খোলা রাখা।
১০. মাস্ক না পড়ার ক্ষেত্রে কোন অজুহাত চলবে না, মাস্কবিহীন ব্যক্তিদের সর্বনিম্ন ১শ টাকা জরিমানা করা।
করোনার হাত থেকে মানুষকে বাচানোটাই সরকারের উদ্দেশ্য, কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে গৃহীত পদক্ষেপ যদি মানুষের জন্য দুর্ভোগ ডেকে আন, মানুষ যদি এর বিরুদ্ধে মিছিল বের করে তা সুফল দেবে না, উল্টো তা করোনার বিস্তার ঘটাবে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *