৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

লুকিয়ে আছে সাহেদ, কথা বলছে তার ছবি

আপডেট : জুলাই ১০, ২০২০ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

22

মাসুদ কামাল

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মিডিয়ার যে সকল মহারথীদের সঙ্গে এই সাহেদের কঠিন সখ্য ছিল, তার সঙ্গে যাদের হাসিমুখ ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল, তাদের মিডিয়াতেই দেখি আবার সাহেদের অপকর্ম নিয়ে নানামুখী সংবাদ। হতে পারে ওনারা সাহেদের কাছাকাছি ছিলেন বলে তার অপকর্মগুলোর সম্পর্কে একটু বেশিই জানেন। সে কারণেই এতদ্রুত এত ভিতরের কথা লিখতে পারছেন। অথবা এমনও হতে পারে, পঁচা ডিম ভেঙ্গে দুর্গন্ধ যখন ছড়িয়েই পড়েছে, তখন তার নৈকট্য স্বীকার করা কেন? বরং তাড়স্বরে বলা যাক- এই ডিম যে পঁচা সেটা আমি আগেই জানতাম।

তাহলে আপনার টেলিভিশনে সে নিয়মিত টকশো করতো কিভাবে? তাহলে রিজেন্ট হাসপাতালকে কিভাবে আপনার মিডিয়ার ‘হসপিটাল পার্টনার’ বানালেন? কিভাবে আপনি লিখিতভাবে সার্টিফিকেট দিলেন যে- করোনাযুদ্ধে রিজেন্ট হাসপাতালের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়? আবার আর একটি টিভিকে দেখলাম রিজেন্ট হাসপাতালের আইসিইউ ডাক্তারের লাইভ ইন্টারভিউ করে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এই হাসপাতালটি কত ভালো! অথচ বাস্তবে কি দেখা গেল? রিজেন্টের আইসিইউ নাকি অন্য হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের চেয়েও খারাপ! আইসিইউ এর প্রয়োজনীয় কোন যন্ত্রপাতিই নাকি ওখানে নেই!

প্রশ্ন হচ্ছে- মিডিয়ার তথাকথিত এই জায়ান্টদের কেন এই দ্বিচারিতা? তারা কি জানতেন না- সাহেদ একজন প্রতারক, বাটপার? না জানার কি খুব একটা জোরালো কারণ ছিল? নাকি জেনে শুনেই তারা তাকে সহযোগিতা করেছেন, বিনিময়ে পেয়েছেন নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা? এমন নয় যে, এসব কথা আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। আসলেই এমন এমন কথা উচ্চারিত হচ্ছে আজকাল। এসব কথা বলা হচ্ছে কিছু ছবির কারণে। ছবি যে কথা বলে। যে কথা বলতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে হয়, সেকথা কিন্তু একটি ছবি, তাতে থাকা চরিত্রগুলোর ভাবভঙ্গিতেই প্রকাশিত হয়ে যায়। কেউ কেউ হয়তো এই ছবিগুলো বানানো বা ফটোশপের কারুকাজ হিসাবে অভিহিত করে উড়িয়ে দিতে পারেন। সেটা কিন্তু হতে পারে। আজকাল ফটোশপে অনেক কিছুই হয়। তাছাড়া আপনি হয়তো কোন একটা অনুষ্ঠানে গেলেন, কেউ আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে চাইলো, চক্ষুলজ্জার খাতিরে আপনি মানা করতে পারলেন না। ব্যস আপনার সঙ্গে তার একটা ছবি হয়ে গেল।

আপনি বিখ্যাত লোক- পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, অথবা সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, কিংবা কোন পত্রিকার সম্পাদক, বা কোন টিভির শীর্ষ পদাধিকারী, আপনার সঙ্গের সেই ছবি ওই বাটপার লোকটা তখন ব্যবহার করতেই পারে। এমন কিন্তু আগেও হয়েছে। এই তো বছর কয়েক আগে বনানীর এক আলোচিত ধর্ষকের সঙ্গে একটি টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ভদ্রমহিলার একটা সেলফি প্রকাশিত হল। তা নিয়ে দারুন হইচই। ভদ্রমহিলা যতই বলেন, ছবিটি তিনি শখ করে তুলেননি, অনুরোধে ঢেঁকি গিলেছিলেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা। শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে হলো। এ ব্যাপারে আমার এক চিকিৎসক বন্ধু মোক্ষম একটা কথা বলেছেন। তার মতে, এ ধরনের ছবির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তিটির চোখের দিকে তাকান। যদি দেখেন যে তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নেই, তাহলে বুঝবেন- এই ছবিটি তার অনিচ্ছায় তোলা হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য মনে হলো। মনে পড়লো- মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে মোঃ সাহেদের ছবির কথা। এরকম দুটি ছবি আমি দেখেছি, দুটিতেই দেখলাম সাহেদ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকলেও ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি অন্যদিকে। তার মুখে যেন কিছুটা বিরক্তিও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের ছবিটিও দেখুন, প্রধানমন্ত্রী অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন। কিংবা প্রেসিডেন্ট মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে করমর্দনের ছবিটি, সেটিকেও খুবই কৃত্রিম মনে হচ্ছে। আমার ওই বন্ধুটি বলছিলেন, ছবিটি ইচ্ছার বিরুদ্ধে নাকি আগ্রহের সঙ্গে- তা বোঝার আরও উপায় আছে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজের দিকে তাকান, বুঝতে পারবেন। দেখুনের সাহেদের সঙ্গে থাকা মহারথীর মুখে কোন হাসি আছে কি-না, সেই হাসি কি কৃত্রিম নাকি স্বতস্ফূর্ত? আমার ধারণা, পাঠকরা এরই মধ্যে সেরকম অনেক ছবি পেয়ে গেছেন, ছবিগুলো এখন বরং একটু মিলিয়ে দেখতে পারেন।

আচ্ছা, আমার বাসায় একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান হবে, সেখানে আমি কাদেরকে দাওয়াত করবো? যাদেরকে দাওয়াত করবো- তারা নিশ্চয়ই আমার অতি কাছের মানুষ। অথবা ধরেন, কোন একটা অনুষ্ঠানে অনেকেই আছেন, আমি একজনকে মুখে তুলে কেক বা বিস্কুট খাইয়ে দিচ্ছি, এটা কি প্রমাণ করে? আমি জানি লোকটা বাটপার, প্রতারক- তারপরও হাসিমুখে যদি তাকে মুখে কেক বা অন্যকিছু তুলে খাইয়ে দিই, সেটা দেখে আমার সম্পর্কে লোকে যদি নেতিবাচক কিছু ভাবে- সেটা কি খুবই অন্যায় হবে? এটা সত্য, অনেক সময় পাশে এমন কেউ বসে যায়, যার উপর আমার তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেমন ধরা যাক, কোন টেলিভিশনের টকশো। টিভি কর্তৃপক্ষ একাধিক অতিথিকে আমন্ত্রণ করে। তো যেয়ে দেখা গেল আপনার সঙ্গে অপর অতিথি হিসাবে মোহাম্মদ সাহেদ আছে। তখন তো কিছু করার থাকে না। পরস্পরের বিপরীত মতাবলম্বীদের টকশোতে হাজির করার একটা প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়। সে বিচারে সাধুর সঙ্গে শয়তান কিন্তু থাকতেই পারে। এত কথা বলছি এ কারণে যে, আমি নিজেও এই লোকের সঙ্গে একাধিক টকশোতে বসেছি। সেখানে আমি, সে এবং আরও যারা আলোচক ছিল- সবাই টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আমন্ত্রিত। কাজেই দায়টা আমাদের ওপর পড়ে না, পড়ে আমন্ত্রকের ওপর। এমন কথাই সেদিন জানালেন একজন সাংবাদিক। বললেন- সহকর্মী একজন সাংবাদিক নেতার বাসায় আমন্ত্রণ ছিল, সেখানে তিনি গিয়েছিলেন। যেয়ে দেখেন- আরও অনেক সাংবাদিক নেতার সঙ্গে মোঃ সাহেদও আছেন। ভাব দেখে মনে হচ্ছে- হোস্ট বুঝি সে-ই। এরপর কিভাবে সেখানে গ্রুপ ছবি তোলা হলো, সেই ছবিতে তিনি কিভাবে অন্তর্ভূক্ত হলেন তার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। আমি বেশ একটু সময় নিয়েই সেই গ্রুপ ছবিটি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। আমি কিন্তু কারও মুখেই তেমন কোন আড়ষ্টতা দেখতে পেলাম না। এমনকি যে ভদ্রলোক- না জেনে সেখানে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন, তার মুখের হাসিটাও অতি আন্তরিক মনে হলো।

আমাদের গুরুজনরা একটা কথা বলতেন, কোনো মানুষ সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইলে তার বন্ধু-বান্ধবদের দিকে তাকাও। দেখো, সে কাদের সঙ্গে মেশে, কাদের সঙ্গে আন্তরিক ভঙ্গিতে আড্ডা দেয়। ইয়ার-দোস্তদের দেখে মানুষ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মানুষ তো আর হাঁস নয়, যে পচা পানিতে নামলেও তার দেহে পানি লেগে থাকবে না, শরীর দিয়ে দুর্গন্ধ বের হবে না। ময়লা পানিতে অবগাহনের দায় তাকে অবশ্যই বহন করতে হবে। রাস্তায় বের হলে- লোকজন অবশ্যই তার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকাবে। বিষয়টা কি আমাদের সাংবাদিক নেতারা এরই মধ্যে টের পাচ্ছেন না? কদিন আগে এটিএন নিউজের একটা টকশোতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি বললাম- সাহেদ তো নিজেকে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতো। তার ফেসবুক আইডিতে লেখা আছে- সে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য। (ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো আজ, ১০ জুলাই, যখন এই লেখা লিখছি, তখনও ফেসবুকের সেই পরিচিতিটা জ্বলজ্বল করছে!) তো এটিএন নিউজের সেই টকশোতে বিষয়টি আমি উল্লেখ করলাম। এর প্রতিক্রিয়াটি হলো তাৎক্ষণিক। অনুষ্ঠান চলাকালেই ফোন করলেন ডঃ শাম্মী আহমেদ। ইনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তিনি দাবী করলেন- মোঃ সাহেদ তার কমিটির সদস্য নন। এমনকি এর আগের কমিটিরও তিনি সদস্য ছিলেন না। শুনে ভালো লাগলো। টকশো শেষ করে বাসায় ফিরতে পারলাম না, রাস্তায় থাকতেই একজন মেসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠালেন। একটা অনুষ্ঠানের, ২০১৮ সালের অক্টোবরের ছবি। কারেন্ট পলিটিক্যাল ইস্যু নিয়ে একটা ব্রিফিং অনুষ্ঠানের ফটোসেশন। সেখানে একেবারে সামনের সারিতে মোট ছয়জন বসে আছেন। তাদের একেবারে মাঝখানে ডঃ শাম্মী আহমেদ। ওনার বাম পাশে ডাঃ দীপু মনি আর ডান পাশে মোঃ সাহেদ! তাহলে দাঁড়ালোটা কি? ২০১৮ সালে কি আওয়ামী লীগের আগের কমিটিও ছিল না? মানুষকে ভুল তথ্য দেওয়া কি রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বৈধ আচরণ?

পরদিন একজন আমাকে ২০১৬-২০১৯ মেয়াদের আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির একটা তালিকা পাঠালেন। কমিটির সভাপতি অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ জমির, সদস্য সচিব ডঃ শাম্মী আহমেদ। সদস্য তালিকায় রয়েছেন ডাঃ দীপু মনি, শাহরিয়ার আলম, হাবিবে মিল্লাত, অ্যাম্বাসেডর সৈয়দ শাহেদ রেজার মত খ্যাতিমান মানুষেরা। এই তালিকার ২৪ নম্বর নামটাই মোঃ সাহেদের! এরপর কি আর কিছু বলার থাকে? সবই বুঝি জাতি হিসাবে আমাদের নিয়তি। এসব সত্য, মিথ্যা, হিপোক্র্যেসি নিয়েই আমাদেরকে বাঁচতে হবে। তবে জনগণের মনে কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়। তারা বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা আর ছবিকে ঠিক মিলাতে পারে না। তারা বুঝতে পারে না- ‘শাহেদকে চিনি না,’ ‘সে আমাদের কেউ না,’- উচ্চারিত এইসব সুশীল বাক্যগুলো সত্য, নাকি ছবিতে যে কথাগুলো প্রকাশিত হয় সেসব সত্য? আমার মনে হয়, সাধারণ মানুষের মনে যে এই প্রশ্ন, তার যথাযথ জবাবটা প্রতারক সাহেদের সঙ্গপ্রাপ্ত ওই বিখ্যাত ব্যক্তিরাই দিতে পারবেন।

তাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ- আপনারা জবাব দিন, আপনাদের অবস্থানটা পরিষ্কার করুন। আমরা সাধারণ মানুষ আপনাদেরকে শ্রদ্ধা করতে চাই। সাহেদকে যখন আপনি মুখে তুলে কেক খাইয়ে দেন, তাকে জড়িয়ে ধরে কৃতার্থ বোধ করেন আর সেটা চেহারায় ফুটিয়ে তুলেন, তখন সেই শ্রদ্ধাটা কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে যায়।