৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

রোমের পথে পথে

আপডেট : নভেম্বর ৯, ২০২০ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

71

Rome was not built in a day ছেলেবেলায় শেখা বাক্যটি নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। দীর্ঘকাল মনে মনে পুষে রেখেছিলাম একদিন এ নগরী দেখতে যাব, কেন বলা হয় নগরীটি একদিনে তৈরি হয়নি?
সেই সুযোগটি পেয়ে যাই জার্মানীর ডুসেলড্রফ থেকে। আমার খুব কাছের বন্ধু, প্রিয়জন বাংলাদেশের অনারি কনসুলার ইঞ্জিঃ হাসনাত মিয়ার প্রেরনায়। জার্মানী থেকে প্যারিস যাবার পূর্বরাতের ডিনার টেবিলে তিনি জোর দিয়ে বললেন, রনিভাই, প্যারিস তো বহুবার গিয়েছেন এবার ইতালি ঘুরে যান। রোম ভাল লাগবে।
আমি এমনি নাচুনে বুড়ি, তার ওপরে পড়লো ঢোলের বারি। আমাকে আর পায় কে?
-এখান থেকে প্লেনে রোম যেতে কতক্ষন সময় লাগবে?

মাত্র দুইঘন্টার ফ্লাইট। ডুসেলড্রফ হতে টিকেট এক্সপেনসিভ। বার্লিন থেকে ফ্লাই করেন। সস্তায় টিকেট পেয়ে যাবেন। অথবা ইউরো ট্রেনে যেতে পারেন।
ডিনার শেষে অনেক হিসেব নিকেশ শেষে মনস্থির করে ফেলি প্যারিস পরে যাব, কাল সকালে বার্লিন ফিরে ফ্লুগহাফেন ট্যাগেল বা ট্যাগেল বিমানবন্দর হতে রোম যাব। বার্লিনে দুলালভাইকে ফোন করে জানাই বিকেলে বা সন্ধ্যায় রোম যাবার কোন টিকেট পাওয়া যায় কিনা খোঁজ নিন।

এয়ার বার্লিনারের দু’টো টিকেট কনফার্ম করে কিছুক্ষন পর দুলালভাই ফোনে জানান,টেনশান কইরেন না ভাই। বিকেলের টিকেট পাওয়া গেছে। নান্নুভাই এয়ারপোর্টে ড্রপ করবে।’

পরের দিন বার্লিনে নান্নুভাইয়ের বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে দুলালভাইসহ বের হই। এয়ারপোর্টে পৌছে বোর্ডিংকার্ড নেয়ার সময় লাগেজ নিয়ে বিপদে পড়ি। এয়ারলাইন্সের পক্ষ হতে জানানো হয়, কেবিন লাগেজ ছাড়া বড় কোন লাগেজ নেয়া যাবে না।
কি মুশকিল রে বাবা।
আমার ঢাউস সাইজের লাগেজ, এটা ছাড়া আমি কিভাবে যাই?

দুলালভাই বুদ্ধি দেন, ‘বার্লিনে আপনাকে আবার ফিরতেই হবে। তাই লাগেজ রেখে যান। ‘
হ্যা, আমাকে বার্লিন ফিরতে হবে, এখান হতে ঢাকা ফিরবো। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় হ্যান্ডব্যাগে পুরে নিয়ে রোমের উদ্দেশ্যে প্লেনে উঠে বসি। এই এয়ারলাইন্স এতো ছোটলোক যে, যাত্রাপথে কোন খাবার দেয়নি। কিছু খেতে হলে কিনে খেতে হয়।
সন্ধ্যার কিছুপরেই রোমের ফুমিসিনো লিওনার্দো দ্যা ভিন্চি এয়ারপোট বিমান ল্যান্ড করে। বের হয়ে দেখা পেয়ে যাই মঞ্জুভাইয়ের। হাসনাতভাই আগেভাগেই এরাইভ্যালের সময় জানিয়ে রাখায় মঞ্জুভাই এসেছেন রিসিভ করতে। বারবার বলে দিয়েছেন, যে ক’দিন রোমে থাকবো সেই কয়দিন যেন তার বাসায় থাকি।
মাদারীপুরের সন্তান মঞ্জুভাই খুবই অমায়িক, ভদ্র ও মিশুক মানুষ। খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারেন। সে আমাদের তিনদিনে রোম, ভ্যাটিকান ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে। তার কারনে রোমের অলিগলি, ভ্যাটিকানের সমস্ত ধর্মীয় উপসনালয় দেখা সহজ হয়েছিল।

রোম থেকে আমরা বাই ট্রেনে মিলানো, ভেনিস, ফ্লোরেন্স গিয়েছি। এ শহরগুলোর ভ্রমনগল্প আরেক পর্বে লিখব। এ পর্ব শুধু রোম ভ্রমন বৃত্তান্ত বয়ান করি।
এয়ারপোর্ট থেকে মঞ্জুভাইয়ের বাসায় আসার সময় চোখে পড়ে বিশাল প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ। এটি রোমের বহু পুরাতন সুদীর্ঘ ও সুউচ্চ সুরক্ষা প্রাচীর “অরেলিয়ান প্রাকার”। ২৭১ থেকে ২৭৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে রোমান সম্রাট অরেলিয়াস ও প্রোবাসের শাসনকালে শহরের সুরক্ষার জন্য চুন , সুরকি ও পাতলা ইট দিয়ে ১১ ফুট পুরু ও ২৬ ফুট উচ্চ এই আরেলিয়ান প্রাচীর তৈরি করা হয়। সপ্তপাহাড়ের রোম নগরীর চতুর্দিক এই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। রোম সাম্রাজ্যের পতন পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে প্রাচীরের বেশীর ভাগ অংশই ধ্বংস করা হয়েছে।

কত ইতিহাস, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে রোমের পরতে পরতে। সেই সব জানার আগ্রহে আগামী ক’দিন ঘুরে ঘুরে দেখা হবে রোম।

২.
ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ নগরী রোম । সপ্ত পাহাড় নিয়ে খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ সালে রোম গড়ে ওঠে । রাজা রোমিউলাসের নামে শহরটির নামকরণ করা হয়। ইতালিয়রা ভালবেসে ‘রোমা’ নামে ডাকেন। নগরী জুড়ে ছড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্থাপনা। এ জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এবং তাদের পছন্দের তালিকায় তিন নম্বরে আছে রোম। প্রাচীন ঐতিহ্য কিংবা প্রত্নতাত্তিক স্থানগুলোর প্রতি যাদের আকর্ষণ আছে তারা ভ্রমনের জন্য রোমকে বেঁছে নেন।

সাধারন মানুষের আচার ব্যবহার, সংস্কৃতি,খাদ্যাভাস সর্বোপরি প্রাণবন্ত জীবন পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
ইতালীর খাবার দাবার বেশ জনপ্রিয়। এখানে এসে পিজ্জা, স্পাগেটি, পাস্তার স্বাদ নিতে কেউ ভুল করে না। কফির স্বাদ এককথায় অতুলনীয়।

রাতের রোম নগরী অপুর্ব। নিয়ন আলোয় প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে থেকে সহজে দৃষ্টি ফেরানো যায় না। আলো আধারিতে রাতের কলোসিয়াম অসাধারন।

রোমে দেখার জায়গা কি কম আছে?
না, অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। প্রায় ২,৭০০ বছরের ইতিহাসের চিহ্ন সারা নগরীতে ছড়িয়ে আছে৷ দুই তিন দিনে দেখে শেষ করা যাবে না। আমার মতে, রোম দেখতে হলে গাড়ি পরিহার করা উচিত। অবশ্য রোম শহরের কেন্দ্রস্থলে সাধারণ গাড়িঘোড়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ ৷ শুধুমাত্র ভেসপা স্কুটার প্রবেশ করতে পারে৷ তাই হেঁটে হেঁটে রোম নগরী দেখার আনন্দই আলাদা।

কলোসিয়াম ,রোমান ফোরাম এবং প্যানথিয়নের মতো প্রাচীন স্হাপনাগুলি রোমানদের স্বর্ণযুগকে মনে করিয়ে দিবে। বিশ্বের খুব কম শহরই আছে যা শৈল্পিক স্থাপত্যের দিক দিয়ে রোমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

সকালে মঞ্জুভাইয়ের সাথে প্রথমে দেখতে গিয়েছি কলোসিয়াম। এটি পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি।খ্রীষ্টপূর্ব ৮০ সালে নির্মিত হয়েছিল সম্রাটদের মনোরঞ্জনের জন্য। ছোটবেলা থেকে গ্লাডিয়েটরদের সম্পর্কে শুনেছি আর মনের ভেতর লালন করেছি কোনদিন সুযোগ হলে কলোসিয়াম দেখব, যেখানে গ্লাডিয়েটদের হিংস্র পশুর সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হত। বুঝতে চাইবো কি নির্মম নিষ্ঠুর ছিল রোমান শাসকরা!

কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে গ্লাডিয়েটরদের পরিনতির কথা ভেবে বেদনায় আমার কি অনুভুতি হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একই অবস্থা হয়েছিল আমাদের লাতিন বন্ধু ইয়েকুডর ও আমেরিকার বেনিট জেনা এবং মেরিনা’র।

ছয় ইউরো দিয়ে টিকেট কেটে দীর্ঘ লাইন ঠেলে ভিতরে ঢুকতে হয়। কলোসিয়ামের উপবৃত্তাকারের ছাদহীন বিশাল মুক্ত রঙ্গমঞ্চটি ফ্লেভিয়ান এম্পিথিয়েটার নামেও পরিচিত।

ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, জেরুজালেমের ইহুদি মন্দির লুণ্ঠনে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদের একটা বিরাট অংশ কলোসিয়াম নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও প্রায় এক লক্ষ ইহুদি যুদ্ধবন্দীকে কলোসিয়াম নির্মাণকাজের ধরে আনা হয়। রোম থেকে ৩০ কি. মি.দূরের টিভোলির খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলন এবং সেখান থেকে রোমে বয়ে নিয়ে আসার কাজে লাগানো হতো। নির্মান কাজের শুরু থেকেই বহু মানুষের কান্না ও অশ্রু কলোসিয়াম নির্মানের সঙ্গে মিশে রয়েছে।

ডিম্বাকার চারতলা বিশিষ্ট বিশাল স্থাপনার উচ্চতা ১৫৭ফুট , দৈর্ঘ্য ৬১৭ ফুট এবং ৫১২ফুট প্রশস্ত । কলোসিয়ামের তিনটি তলার প্রতিটিতে ৮০ টি করে মোট ২৪০ টি আর্চ বা তোরণ ছিল। নিচের তোরণগুলি প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। উপরের তলার তোরন বা বড়ো গবাক্ষগুলির প্রতিটি গ্রীক পৌরাণিক দেব-দেবী ও গ্রীক বীরদের ব্রোঞ্জ মূর্তি দিয়ে সজ্জিত ছিল। রঙ্গমঞ্চটির দেওয়াল মূল্যবান ধাতুর তৈরি ভাস্কর্যে খচিত ছিল। রোম সাম্রাজ্য পতন পরবর্তী সময়ে এইসব মূর্তি ও ভাস্কর্য কলোসিয়ামের দেওয়াল থেকে উপড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দেওয়ালের অজস্র গভীর ক্ষত এখনও তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

রঙ্গমঞ্চকে ঘিরে থাকা সিঁড়ির মতন দর্শকাসনের বেশীর ভাগ অংশের মর্মর পাথর লুঠপাট হয়েছে। ক্ষুদ্র একটি অংশের উপর বাঁধানো শ্বেতমর্মর পাথর এখনও টিকে আছে । রঙ্গমঞ্চের মধ্যস্থলে মাটির উপর পাথরে নির্মিত দেয়ালের আচ্ছাদনহীন বহু প্রকোষ্ঠ ও সুড়ঙ্গ ছিল। এগুলি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেকালে এই প্রকোষ্ঠগুলির উপর কাঠের পাটাতন বিছিয়ে গ্লাডিয়েটরদের লড়াই ক্ষেত্রটি নির্মাণ করা হতো। নিচের প্রকোষ্ঠগুলিতে লড়াইয়ের জন্য গ্ল্যাডিয়েটর কিংবা দাসদের ও ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুদের রাখা হতো। ক্রীড়া প্রদর্শনকালে কাঠের তৈরি লিফট বা উত্তোলকের সাহায্যে কৌশলে হিংস্র পশুদের প্রদর্শনীস্থলে এনে গ্ল্যাডিয়েটর বা মল্লযোদ্ধা অথবা ক্রীতদাস কিংবা সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী বা যুদ্ধবন্দীর সামনে ছেড়ে দেওয়া হতো এবং ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর সঙ্গে চলতো মানুষের অসম লড়াই।
ইস, কি ভয়ংকর ছিল এই অসময় লড়াই!

সাংঘাতিকভাবে আহত বা মৃত্যুমুখে পতিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হতো। সংগ্রামে অসমর্থ আহত গ্ল্যাডিয়েটর হাত তুলে সম্রাটের নিকট প্রাণভিক্ষা চাইলে সম্রাট বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ উপরে উঠালে ক্ষমা এবং নিচের দিকে নামালে সেই ব্যক্তির মৃত্যু অবধারিত ছিল। রঙ্গমঞ্চে বসে থাকা প্রায় পঞ্চাশ হাজার দর্শকসহ উপস্থিত রোমানসম্রাট বুনোউল্লাসে এই পাশবিক ক্রীড়া উপভোগ করতেন।

বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে অনুষ্ঠিত পৈশাচিক এই খেলায় কয়েক লক্ষ মানুষ ও পশুর জীবন নষ্ট হয়। আমরা প্রায় ঘন্টা দেড়েক ধরে ঘুরে বিষাদাক্রান্ত মন নিয়ে কলোসিয়াম থেকে বের হই।

কয়েক পা এগোলেই রোমান ফোরাম৷ ক্ল্যাসিক রোমান যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খননের কাজ এখানেই হয়েছে৷ জুলিয়াস সিজার ও সম্রাট অগাস্টাসের আমলে মানুষ রোমে কীভাবে বসবাস করতো, এখানে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়৷
রোমান সাম্রাজ্যের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক, বিচারকার্যসহ সকল সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য ছিল রোমান ফোরাম। প্রাচীন রোমের সব নগরীতে ফোরাম থাকলেও রোমের ফোরামটি ছিল সর্ববৃহৎ। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর এই ফোরাম বহুকাল যাবৎ মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল।

ফোরামের সামনের বড়ো রাস্তায় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় । সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে, তা দেখতে আমরা কিছু সময় দাঁড়িয়ে যাই। বর্নিল পোষাকে কিশোর কিশোরীদের নৃত্যানুষ্ঠান বেশ উপভোগ করি।

হেঁটে হেঁটে চলে আসিবিখ্যাত আর্চ ডি কনস্টানটাইনের তোরণ দেখতে। ৩১২ খ্রীস্টাব্দে টাইবার নদীর মিলভিয়ান ব্রীজের যুদ্ধে রোম সম্রাট ম্যাক্সেনটিয়াসকে পরাজিত করে কনস্টানটাইন রোমের সম্রাট হন। কনস্টানটাইনের এই বিজয়ের স্মৃতিকে জাগরুক করে রাখার জন্য রোমান সিনেট ৩১৫ খ্রীস্টাব্দে এই বিজয় তোরণটি নির্মাণ করে।

এরপর আমরা সদলবলে চলে আসি ট্রেভি ফনটানা দেখতে। হেঁটে হেঁটে দুইপাশে কত কিছু দেখেছি আজ এগুলি আর মনে নেই। ডায়েরির পাতায় লেখা ইতালী ভ্রমনের দিনপঞ্জি আর ফুটনোট দেখে স্মৃতি হাতড়ে লেখা কঠিন।

ট্রেভি ফনটানা যেতে দুপাশে উঁচু উঁচু বাড়ির মাঝে ঢালু ও অপ্রশস্ত গলি পথ। প্রায় ৫/৭মিনিট হাঁটার পর একস্থানে বহুলোকের জটলা দেখতে পাই। এখানে রাস্তার গায়ে খোলা রেস্তোরাঁতে অনেকে চেয়ারে বসে খাচ্ছে, আবার অন্যদিকে রাস্তায় তখন স্কুলের ইউনিফর্ম পরা একদল শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। আমরা এই শিক্ষার্থীদলের পিছন ধরে এগিয়ে অল্পদূরেই তিনটি রাস্তার সংযোগস্থলে ট্রেভি ফনটানা বা ট্রেভি ফোয়ারা দেখতে পেলাম।
এই ফোয়ারায় গত শতকের ষাটের দশকের সবচেয়ে সুন্দরী নারী স্নান করেছিলেন৷ ফেদরিকো ফেলিনি’র ‘লা ডলচে ভিতা’ ছবিতে আনিটা একবার্গের পাশে ছিলেন মার্চেলো মাস্ত্রোইয়ানি৷ এই ফোয়ারায় ছবির শুটিং হয়েছিল৷

হাঁটতে হাঁটতে পা ভারী ও ক্লান্ত লাগায় ফোয়ারার সামনে সিঁড়ির গ্যালারিতে বসে পড়ি। নানান দেশের নানান ভাষার মানুষ গিজগিজ করছে। তাদের পাশে বসতে পেরে কিছুটা স্বস্তি ও আরাম পেলাম।

ট্রেভি ফাউন্টেনটি সুসজ্জিত ব্যারোক স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট নমুনা। এই স্থাপনাটি প্রায় ৮৬ ফুট উচ্চ এবং ১৬১ ফুট প্রশস্ত। রোম নগরীর ফোয়ারাগুলির মধ্যে বৃহত্তম এই ফোয়ারাটি পৃথিবীর জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। এর নকশাঁ করেছেন শিল্পী নিকোলা সালভি এবং পান্নিনি। ১৭৬২ খ্রীস্টাব্দে ফোয়ারার নির্মাণকার্য শেষ হয়। এখানে ওসেনাস বা মহাসাগরের মূর্তি রয়েছে। যার বাম দিকে প্রাচুর্য্য এবং দক্ষিণে স্বাস্থ্য মূর্তিরূপ ধারণ করে রয়েছে ।

গ্যালারিতে বসে লক্ষ্য করি, ট্রেভি ফাউন্টেনের পানিতে বহু মানুষ খুচরো মুদ্রা ফেলছে। কেন ফেলছে?
মুদ্রা ছুঁড়ে ফেলার ভঙ্গিটা অদ্ভুদ। ডানহাতে মুদ্রাটি নিয়ে বামহাতের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে মুদ্রা ফেলা হয়। লোকের বিশ্বাস, এই রকম করে ট্রেভির পানিতে মুদ্রা ফেললে পুনরায় রোমে ফিরে আসা যায়!

আমিও তাদের দেখাদেখি এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে পন্চাশ সেন্টের কয়েন ছুঁড়ে ফেলি। সুতরাং পুনরায় আমার রোমে যাওয়ার পথ আটকায় কে!

মেরিনার খুব ইচ্ছে প্রাচীন উপসনালয় দেখার। তার আগ্রহে আমরা এখান থেকে হেঁটেই চলে যাই প্যান্থিওন। রোমের একটি বহু পুরাতন মন্দির। প্যান্থিওন হলো দুই হাজার বছর পূর্বে রোমান আমলে তৈরি সর্বদেবতার মন্দির। পরবর্তীকালে খ্রীস্টধর্মের আগমনের পর ৭ম শতাব্দী থেকে এটি গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্যান্থিওনের করিডোর বা সামনের বারান্দাটিতে সারিবদ্ধ উচ্চ স্তম্ভের সারি রয়েছে।প্রথম সারিতে গ্রানাইট পাথরের তৈরি আটটি সুউচ্চ থাম এবং তার পিছনে দুই সারিতে চারটি করে আরো আটটি থাম রয়েছে । এই থাম সমন্বিত বারান্দার ছাদটিতে মুকুটের মতো ত্রিকোনাকার পেডিমেন্ট আছে। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের সময় সেনাপতি এবং মার্কাস আগ্রীপ্পা খৃ.পু.২৭ অব্দ থেকে ১৪ খৃ.এর মধ্যে এস্থানে একটি মন্দির তৈরি করেন। পুরাতন মন্দিরটি আগুনে বিনষ্ট হলে ওই স্থানেই ১১৩-১২৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে রোম সম্রাট ট্রাজান ও হাড্রিয়ানের শাসনকালে প্যান্থিওনের বর্তমান ইমারতটির নির্মাণকার্য আরম্ভ ও সম্পুর্ন হয়। চুন, সুরকি ও ইঁট দিয়ে তৈরি গম্বুজ যুক্ত এই বিশাল গোলাকার স্থাপনাটির বহির্ভাগের প্লাস্টার প্রায় উঠে গিয়েছে। সম্ভবতঃ ১২৬ খৃস্টাব্দে এটি দেবোদ্দেশে উৎসর্গীকৃত হয়।

প্যান্থিওনের ভিতর বিখ্যাত ইতালিয়ান শিল্পী রাফায়েলের সমাধি ছাড়াও রয়েছে ইতালির প্রথম সম্রাট ভিক্টর ইমানুয়েল ২য় এবং হামবার্ট ১ম এর সমাধি। প্যান্থিওনের পোশাকি নাম সান্তা মারিয়া রোটাণ্ডা এবং চত্বরটির নাম পিয়াজ্জা ডেলা রোটাণ্ডা।

প্যান্থিওন দেখার পর আমরা এর পিছনের দিকে অবস্থিত সান্তা মারিয়া সোপরা মিনার্ভা চার্চ দেখতে যাই। এই চার্চের সামনের চত্বরে একটি ছোট ওবেলিস্ক বা স্মারক স্তম্ভ এবং একটি শ্বেতহস্তীর মূর্তি রয়েছে।
আমরা যখন ঘুরে ঘুরে চার্চ দেখছি এমন সময় মান্নানভাই আমাদের জন্য মিনারেল ওয়াটার, চিপস, কোক নিয়ে আসেন। চার্চ থেকে বের হয়ে এগুলোর সদ্বব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে। খেতে খেতে প্ল্যান হয় আর কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। আমাদের সবার এককথা মন্জুভাই যেখানে নিয়ে যেতে চান সেখানেই যাব।

মন্জুভাই আমাদের নিয়ে যান পিয়াজ্জা নাভোনাতে ফিউমি ফাউন্টেন দেখার জন্য । প্যান্থিওন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কয়েকটি রাস্তা পার হয়ে করসোডেল রিনাস সেমেনটো নামের বড়ো রাস্তার পরে একটি সরু গলি ধরে কয়েক কদম গেলেই পিয়াজ্জা নাভোনা চত্বর। এই চত্বরটি খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে পুরাতন ডোমিটিয়ানের স্টেডিয়ামের উপর স্থাপন করা হয়। পুরাতন স্টেডিয়ামটি ৮০ খ্রীস্টাব্দে রোমান সম্রাট টিটিয়ান ফ্লেভিআস ডোমিটিয়ানাস রোম নগরীর জনগণের প্রতি উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। এটি মূলতঃ এথেলেটিক্স প্রতিযোগিতার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত।

রোম আসলে একদিনে ঘুরে দেখা মানে অন্ধের হস্তিদর্শন সমতুল্য। তবুও যতোটা পারা যায় হেঁটে, দৌড়ে দেখার চেস্টা করেছি। আর সবই সম্ভব হয়েছিল সঙ্গে মন্জুভাই থাকায়।

নভোনো চত্বর থেকে প্রায় ১ কি.মি. দূরের ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলো দেখতে যাই বাসে। টাইবার নদীর অপর পারে ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলোর অবস্থান। বাস থেকে নেমে আমরা হেঁটে
চলে আসি এঞ্জেলো সেতুর ওপর।
রোমান সম্রাট হাড্রিয়ান ১৩৪ খৃস্টাব্দে টাইবার নদীর উপর নির্মান করেছিলেম পন্টে সেন্ট এঞ্জেলো সেতু।
হাঁটার সময় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি হকারকে পশরা বিছিয়ে পর্যটকদের কাছে ছোট ছোট মূর্তি, ছাতা, চাবির রিং, ফটো ইত্যাদি স্যুভেনিয়র বিক্রি করতে দেখি। দু’জনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, তাদের বাড়ি সিলেট ও মাদারীপুর। এখানে অনেক হকারের দেখা মেলে। এই হকারদের মধ্যে শতকরা ৮০ জনই বাংলাদেশি, ১০ ভাগ আফ্রিকান ও বাকিরা অন্যান্য দেশের । ইতালিয়ান হকার প্রায় নেই বললেই চলে।

দ্বিতীয় দিন আমরা সেতু পার হয়ে ক্যাসেল সেন্ট এঞ্জেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ক্যাসেলের মূল ভবনটি গোলাকার এবং এর চারিদিক বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। রোমান সম্রাট হাড্রিয়ান তাঁর নিজের ও তাঁর পারিবারের সমাধি মন্দির হিসেবে ১৩৪-১৩৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই ভবনটির নির্মাণ করেন। ১৩৮ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট হাড্রিয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর চিতাভস্ম এখানেই সংরক্ষন করা হয়। পরবর্তী কালে এই বিশাল স্থাপনাটি দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চতুর্দিকে সুউচ্চ দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এই কমপ্লেক্সটি এখন সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে । এই ভবনের চারিদিক গাছপালা সমন্বিত বাগানের মতো। এছাড়া অনেকটা ফাঁকা জায়গাও রয়েছে। সান্ধ্য ভ্রমণার্থীদের পক্ষে এটি একটি আদর্শ জায়গা বলা যেতে পারে।

রোম শিল্পের সমাঝদার বলে এখানে অনেক নামী দামী গ্যালারি ও মিউজিয়াম আছে। সময়ের স্বল্পতা ও উচ্চমূল্যের টিকেটের কারনে আমাদের একটি মিউজিয়ামও দেখা হবে না – এ কি করে সম্ভব?

১০ ইউরো করে টিকেট কেটে ঢুকে পড়ি বর্গিজ গ্যালারি এন্ড মিউজিয়ামে। পোপ পল পঞ্চমের (১৬০৫-১৬২১) ভ্রাতুষ্পুত্র কার্ডিনাল সিপিওনে বর্গিজ এই শিল্পশালাটির প্রতিষ্ঠাতা। এখানে চিত্র, ভাস্কর্য ও পুরাতত্বের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। কার্ডিনাল সিপিওনে বর্গিজ ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী কারাভাজ্জিও এবং ভাস্কর জিয়ান লোরেঞ্জো বার্ণিনীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক । এখানে লোরেঞ্জো বার্ণিনীর তৈরি বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ভাস্কর্য রয়েছে।

ঘুরতে ঘুরতে টের পাইনি কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। নভেম্বরের বিকেল খুব ছোট। পাঁচটা বাঁজতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। সবাই ক্ষুধার্ত থাকায় রোমের দ্বিতীয় দিনের ঘোরাঘুরি এখানে শেষ করতে হয়। মেরিনা ও জেনি হোটেলে যাবার আগে মঞ্জুভাইকে বারবার বলে যায়, তাদের যেন আমরা কাল ভ্যাটিকান নিয়ে যাই।

৮.১১.২০২০
মন্ট্রিয়েল