১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মেতে ওঠা নয়, মাতোয়ারাও নয়

আপডেট : এপ্রিল ২৪, ২০২১ ৯:০৯ অপরাহ্ণ

33

পথহারা পথিকের কথা

করোনার প্রকোপ রোধে ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ‘লকডাউন’ শেষ হচ্ছে আগামী ২৮ এপ্রিল। এর আগেও কিছুদিন ‘লকডাউন’ ছিল তবে তা ছিল সীমিত আকারে। এবারের লকডাউনকে বলা হচ্ছে ‘কঠোর’ লকডাউন। ‘কঠোর’ ও ‘সীমিত’ লকডাউনের মধ্যে পার্থক্য শুধু একটা বিষয়ে আর তা হচ্ছে সে সময় গণপরিবহন খোলা ছিল কিন্তু উঠতে হতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে, আর ‘কঠোর’ লকডাউনকালে গণপরিবহন বন্ধ।

মানুষের চলাচলে এমন দৃশ্য যেভাবেই হোক রোধ করতে হবে

২৮ এপ্রিল লকডাউন পুরোপুরি তুলে দেয়া হবে না, আবার সীমিত আকারে থাকবে। কঠোর লকডাউন তুলে নেয়ার আগে ২৫ এপ্রিল রোববার থেকে খুলে দেয়া হচ্ছে দোকানপাট, মার্কেট ও শপিং মল। লকডাউন প্রত্যাহার এবং দোকানপাট খোলা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন হুট করে সবকিছু খুলে দেয়া হলে ১৪ দিনের যে অর্জণ তা আর কোন কাজে আসবে না, বাড়তে পারে ঝূঁকি। তাদের অনেকে অন্তত: আরও ২ সপ্তাহ লকডাউন অব্যাহত রাখার পক্ষে।

যে যেভাবে পারে বাড়ি যাওয়ার এই ধারাটি অন্তত এবার বন্ধ করতে হবে

করোনা সারা বিশ্বকে থমকে দিয়েছে, সবদেশই নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে করোনার বিস্তার রোধে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তাই করোনা রোধে ও বিস্তৃতি ঠেকাতে বাংলাদেশ কিছু কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। চলমান কঠোর লকডাউন করোনার বিস্তার ঠেকাতে কিছুটা হলেও সফল হয়েছে, গত কয়েকদিনে করোনায় সংক্রমণের হার দেখলেই বিষয়টি ষ্পষ্ট হবে। ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায় করোনায় একদিনে মারা গেছে ৮৮ জন, ওই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬শ’ ২৯জন। শনাক্তের হার ১৪ শতাংশ। এর আগের দিন মৃতের সংখ্যা ছিল ৯৮জন, মোট শনাক্ত ৪ হাজার ১৪জন, শনাক্তের হার ১৪.৬৩। আগের দিনের পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যাগুলো হচ্ছে মৃত্যু ৯৫জন, আক্রান্ত ৪ হাজার ২শ’ ৮০জন, শনাক্তের হার ১৫.০৭। মৃত্যু ৯১জন, শনাক্ত ৪ হাজার ৫শ’ ৫৯জন, শনাক্তের হার ১৬.৮৫। মৃত্যু ১১২ জন, শনাক্ত ৪ হাজার ২শ’ ৭১জন, শনাক্তের হার ১৭.৬৮, মৃত্যু ১০২, শনাক্ত ৩ হাজার ৬শ’ ৯৮ জন, শনাক্তের হার ১৯.৬। মৃত্যু ১০১, শনাক্ত ৩ হাজার ৪শ’ ৭৩ জন শনাক্তের হার ২১.৪৬। মৃত্যু ১০১জন, শনাক্ত ৪ হাজার ৪শ’১৭, শনাক্তের হার ২৩.৩৬। মৃত্যু ৯৪, শনাক্ত ৪ হাজার ১শ’৯২জন, শনাক্তের হার ২১। মৃত্যু ৯৬, শনাক্ত ৫ হাজার ১শ’ ৮৫, শনাক্তের হার ২০.৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ যেদিন ‘কঠোর লকডাউন শুরু হয় সেদিন শনাক্তের যে হার ছিল ( ২০.৮৯ শতাংশ) তা ১০ দিনে অনেক কমে ২৩ এপ্রিলে দেয়া তথ্যে শনাক্তের হার নেমে আসে ১৪ শতাংশ। এই সময়ে আক্রান্তের হার নিয়মিতই কমেছে, অবশ্য এ সময়টাতে মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি হেরফের হয়নি, এ সময়টাতে সর্বনিম্ন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৩ এপ্রিল, ৮৮ জন আর সর্বোচ্চ ছিল ১৯ এপ্রিল ১শ’ ১২জন।

এভাবে পায়ে হেটে শ্রমিকরা ঢাকা ফিরেছিল গতবার, ঈদের ছুটি কম হলে মানুষের ’বাড়িমুখো’ যাত্রা কমবে

করোনা আমাদের জীবনকে এমন তছনছ করে দিচ্ছে যার মুখোমুখি আগে কখনো হতে হয়নি মানুষকে। সারা দুনিয়ায় অজানা আতংক। মৃত্যু যেন সর্বদা পিছু তাড়া করে ফিরছে। একজন আক্রান্ত হলে পরিবার থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। মৃত ব্যক্তিকেও দেয়া যাচ্ছে না যথোপযুক্ত শেষ শ্রদ্ধা।
আগেই বলেছি করোনা মোকাবেলায় এক দেশ একে রকম পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে এক নাগারে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ছিল। এখন চলছে লকডাউন। এই লকডাউন শেষ হবে ২৮ এপ্রিল। প্রশ্ন হচ্ছে এরপর কী? আমাদের দেশের মানুষ অজ্ঞতায়, ব্যস্ততায় এবং অবশ্যই বাস্তবতায় করোনাকালীন আচরণ বিধি মানেন না বা মানতে পারেন না।

এমন দৃশ্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে

তারপরও সরকারের কড়াকড়িতে অনেক মানুষ কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। লক ডাউন থাকুক বা না থাকুক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে মানুষকে বাধ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে
১. গণপরিবহনে ২ আসনে এক যাত্রী নিয়মটি কোনভাবেই লঙ্ঘণ করা যাবে না। ( মোবাইল কোর্ট চালাতে হবে নিয়মিত, যাত্রীদের কেউ যদি গাড়িতে জোর করে ওঠে তাকেও জরিমানা করতে হবে)
২. গাড়ির সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঢাকায় বিআরটিসির যত বাস আছে সব রাস্তায় নামিয়ে দিতে হবে। প্রধান প্রধান সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার যতদূর সম্ভব সীমিত করতে হবে। এজন্য ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় চলতে পুলিশের কাছ থেকে নিয়মিত অনুমতি নিতে হবে (ট্রাভেল পাশ দেয়া) একটি ব্যক্তিগত গাড়ি সপ্তাহে চার দিনের বেশি রাস্তায় নামতে পারবে না।

ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ এমন অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেবে

৩. মার্কেটের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেলে ৫টা পর্যন্ত না করে সময়টা উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। স্বল্প সময় মার্কেট খোলা থাকলে এক সময়ে বেশি মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে। কিন্তু যদি রাত ২টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা থাকে তাহলে অনেকে রাত নয়টার পর, অনেকে তারাবিহ নামাজ পড়ে মার্কেটে যাবে। এতে মার্কেটে চাপ কমে আসবে।
৪. সরকারি-বেসরকারি সব ধরণের অফিসে শিফটিং ডিউটির ব্যবস্থা করা। সাপ্তাহিক ছুটি দু’দিন কার্যকর করা। বেসরকারি অফিসের স্টাফদেরও যতদূর সম্ভব নিজস্ব পরিবহনে আনা নেয়া করা।

মার্কেট খোলা রাখার সময় উন্মুক্ত হলে একই সময়ে ভীড় করবে না মানুষ

৪. এবার ঈদের ছুটি এক দিন করা। শুধুমাত্র ঈদের দিন। এবার যে যার কর্মস্থলের বাসস্থানে অফিস করবে। হুড়াহুড়ি আর গাদাগাদি করে বাড়ি যাওয়াটা যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
৫. ফেরিঘাটে ফেরির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া, ফেরিতে যানবাহনবিহীন যাত্রী পারাপার নিষিদ্ধ করা।
৬. ঢাকার ফুটপাতের ব্যবসা-বাণিজ্য ছড়িয়ে দেয়া। একটি দোকানের সাথে আরেকটি দোকানের অন্তত ৫ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা।

পুলিশকে হতে হবে তৎপর ও দায়িত্বশীল

মানুষ এখন কঠিন সময় পার করছে, ঈদ উৎসবে সবাই মেতে উঠতে চাইবে কিন্তু এবার যতটা সম্ভব কম মেতে উঠতে হবে, আর মাতোয়ারা হওয়া যাবে না মোটেই। করোনার এ সময়টা সবার জন্যই কঠিন সময়। সেই কঠিন সময়টাকে পার করতে সরকারকে অবশ্যই কঠিন হতে হবে।