২৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মন্ট্রিয়েলের দেয়ালচিত্রকর্ম

আপডেট : সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

51

ছাত্র রাজনীতির কারনে এক সময় প্রচুর দেয়াল লিখন বা চিকা মারতাম। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় রাত জেগে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিকা মারা হতো। দেশে বা বিদেশে চলতিপথে যেখানে দেয়াল লিখন দেখলে পড়ার ও খুঁটিয়ে দেখার চেস্টা করি।দেশে রাজনৈতিক বক্তব্য বা কোন সংগঠনের দেয়াল লিখনের বাহিরে বেশ কিছু ব্যক্তি বিশেষের দেয়াল লিখন, বলিষ্ঠ বক্তব্য চোখে পড়েছিল। বিশেষতঃ নব্বইয়ের দশকে ঢাকাশহর তো বটেই , বিশেষ করে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয় এলাকায় ‘কষ্টে আছি—আইজুদ্দিন’—দেয়াল লেখাটি অনেকের মনে থাকার কথা। সেই সময় এই দেয়াল লিখনটি সবারই বেশ নজর কেঁড়েছিল। এর অনেক পরে আরেকটি দেয়াল লিখন পথচলতি মানুষের দৃষ্টি কাঁড়ে। “অপেক্ষায়… নাজির’। “

গত ৮/১০ বছরে আরো একটি দেয়াল লিখন নগরবাসীর নজরে আসে। ” সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।’ ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে।’ ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই’, কিংবা ‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে বাস করছে মানুষের মনে’। আর এই প্রতিটি দেয়ালচিত্রের লোগো আকারে ব্যবহার করা হয়েছে একটি শব্দ: ‘হবেকি’ (HOBEKI?)। সুবোধ সিরিজের এই দেয়াল লিখন ও ছবি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আমাদের দেশে মুলত দেয়াল লিখন হয়ে থাকে রাজনৈতিক দল ও তার অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন দাবী ভিত্তিক, আর্দশ প্রচার, কারান্তরে থাকা নেতৃবৃন্দের মুক্তি চেয়ে, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে। এসব দেয়াল লিখনকে রাজনৈতিককর্মীদের ভাষায় “চিকা মারা ” বলা হয়ে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও এই দেয়াল লিখন, ছবি আঁকা যা গ্রাফিতি নামে পরিচিত এবং খুবই জনপ্রিয়।বিভিন্ন রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটা শিল্পিত মাধ্যম হিসেবে এটা এখন পুর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্রই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

কলকাতার মনফকিরা থেকে প্রকাশিত গ্রাফিতি এক অবৈধ শিল্প নামের গ্রন্থে লেখক বীরেন দাশ শর্মা গ্রাফিতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: ‘এক অর্থে গ্রাফিতি সাহিত্য না হয়েও লেখার শিল্প, চিত্রকলা না হয়েও অঙ্কনশিল্প।’

সারাবিশ্বে এই গ্রাফিতি বা দেয়াল লিখন – চিত্রকে অনেকে স্ট্রীট আর্ট বা পথচলতি শিল্প বলেন। অনেকে এসব নিয়ে দারুন উস্মা প্রকাশ করেন নগর সৌন্দর্যের হানি ঘটে বলে।

বিভিন্ন সময়ে ইউরোপের নানান দেশে যাওয়ার সুবাদে দেখা হয়েছে দেয়ালজুড়ে, ফ্লাইওভারের নীচের দেয়ালে গ্রাফিতি। কিছু মুগ্ধ করেছে শিল্পীর অংকনশৈলীর কারনে, কিছু টেনেছে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তব্যের কারনে। আবার কিছু বক্তব্যে বিরক্তবোধ করেছি অশ্লীলতার মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাওয়ায়। কানাডার মন্ট্রিয়েল,টরন্টো, অটোয়া ও কুইবেকের বিভিন্ন স্থানে দেখেছি একই রকম গ্রাফিতির ছড়াছড়ি।

এই গ্রাফিতিগুলোর মূল বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে সমসাময়িক বিভিন্ন রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক ঘটনা। পথচলতি জনতার খুব সহজে দৃষ্টি কাঁড়ে বক্তব্য প্রধান ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে আঁকা দেয়াল চিত্রগুলো।রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, প্রচলিত নীতি কিংবা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে দেয়াল লিখন রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে । এর বাহিরে গ্রাফিতি-শিল্পীদের কাছে পৃথিবীর সব দেয়ালই যেন একেকটা বিশাল ক্যানভাস।

রবিবার বিকেলে দ্যু পার্ক এভিনিউর রুয়ে বার্নাডের একটি গলিতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। সেই দেয়ালচিত্রের ভাষা কোন রাজনৈতিক শ্লোগান নয়। দেয়ালজুড়ে কোন শিল্পী বা খেয়ালী তরুনের মনের অব্যক্ত যন্ত্রনার অনুরন।

২৭.০৯.২০২০, রুয়ে বার্নাড, দ্যু পার্ক এভিনিউ, মন্ট্রিয়েল