২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ভিপি নুরের চরিত্র এবং প্রশ্নবিদ্ধ দ্বৈতনীতি

আপডেট : অক্টোবর ১৫, ২০২০ ১২:১৫ অপরাহ্ণ

86

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম

কিছুদিন ধরে গোটা দেশ ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল । সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের দাবী ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাশ করেছে । এ জন্য সরকারকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে চাই ।

নতুন এ আইনটি নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে অবশ্যই দেশে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন হ্রাস পাবে । এখন দরকার আইনটির সঠিক প্রয়োগ । তবে, ক্যাপিটাল প্যানিশমেন্টের ভয় দেখিয়ে আইনটির অপপ্রয়োগ হওয়ারও সমূহ সম্ভবনা রয়েছে । আমাদের সমাজের মানুষের এখনও ধর্ষিতা ও নির্যাতিত নারীকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়নি । ফলে,অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েও লোকলজ্জা ও অপবাদের ভয়ে বিষয়টা গোপন করে যান । তাইতো এ দেশের নারীদের বলা হয় অবলা অর্থাৎ বুক ফাটেতো বুক ফোটেনা । এমন পরিস্থিতিতে, ধার্মিক ও পর্দাসীন এবং ধর্ম বিষয়ে পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রী যদি নিজেই ধর্ষণের জন্য বিচার চান তখন অবশ্যই আমাদের উচিত সকল রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করে মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো ।

ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্ট্যাডিজের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী ফাতেমা আক্তার বিথি (যিনি এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কর্মী ছিলেন, যার পরিবার অত্যন্ত ধার্মিক ও পরহেজগার, যার এক ভাই কোরানে হাফেজ ) সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ ছয়নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ধর্ষণের সহযোগিতার অভিযোগে দু’টি মামলা করেছেন । মামলা সার সংক্ষেপ হলোঃ বিয়ের প্রলোভনে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহবায়ক হাসান আল মামুন তাকে মামুনের বাসায় ধর্ষণ করেন এবং পরে বিয়ের ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করলে হাসান আল মামুন তাকে এড়িয়ে চলতে থাকেন । উপায়ান্তর না দেখে এ ব্যাপারে ডাকসু ভিপির কাছে বিচার চাইলে তিনি ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বলেন এবং বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন । হাসান আল মামুন ঘটনার পর থেকে পালিয়ে বেড়ান । হাসান আল মামুনের খোঁজে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আরেক নেতা নাজমুল হাসান সোহাগ তাকে নিয়ে লঞ্চে চাঁদপুর যান । যাত্রাপথে, লঞ্চে অভিযোগকারিনী নাজমুল হাসান সোহাগ কর্তৃক আরেক দফা ধর্ষণের শিকার হন ।

মামলার আসামীরা গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভে দুঃখে মেয়েটি মামলার আসামীদের গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কার্যের কাছে আমৃত্যু অনশন শুরু করেন ।

মামলা করার পর পরই ভিপি নুর ও সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলনে মাঠে নামে । আর তাদের সাথে একই সুরে কথা বলতে থাকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির থিঙ্কট্যাঙ্কখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল, গণস্বাস্থ্যের জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও বিএনপি নেতারা । এ সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা একবারও অভিযোগকারিনী ভুক্তভোগী মেয়েটির কথা ভাবলেন না বা তার সাথে কথা বলার প্রয়োজনও মনে করলেন না । এটাই আমাদের দেশের রাজনীতির দৈন্যদশা । যাদের বিরুদ্ধে মেয়েটির অভিযোগ তারাই তদন্ত করে সার্টিফিকেট দিল এমন কিছু ঘটেনি । কি চমৎকার তামাশা !
অভিযুক্ত ২জনকে পুলিশ গ্রেফতার করলে ভিপি নুরসহ অন্য অভিুক্তরা গা ঢাকা দেন । গোপন অবস্থান থেকে ভিপি নুর ফেইসবুক লাইভে এসে আত্মপক্ষ সর্মথন করে নিজেদের কে ধোয়া তুলসী পাতা আ্খ্যা দিয়ে অনশনরত ছাত্রীটিকে দুশ্চরিত্রার সার্টিফিকেট দিলেন । তিনি বলেছেন “যে স্বেচ্ছায় একজন ছেলের সাথে বিছায় গিয়ে, লঞ্চে হাসিখুশিভাবে…’ । বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পর্দাসীন ছাত্রী সম্বন্ধে বিস্তারিত না জেনে এমন নগ্নভাবে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কলঙ্কিত ও লজ্জিত করেছেন ।

আসলে, যে যেটার যোগ্য নন তিনি সেটা পেয়ে গেলে ধরাকে সরা জ্ঞান করবে এটাই স্বাভাবিক । চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ নিয়ম বাতিলের আন্দোলন করে আন্দোলনের আতুরঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন অপরিচিত মুখ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেন । এ আন্দেলনে সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং আন্দোলনের সফলতায় ভর করে এ পরিষদের বেশ ক’জন ছাত্র ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হন । এ পরিষদের ব্যানারে অখ্যাত ও অপরিচিত নুরুল হক নুর ছাত্রলীগের হামলা-মামলার কারণে আলোচনায় সবার শীর্ষে উঠে আসেন । মিডিয়ার অভূতপূর্ব কভারেজ ও ছাত্রলীগের নির্যাতনে সাধারণ ছাত্র ও মানুষের সহানুভূতিতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নির্বাচিত হন । বলা হয়, ছাত্রলীগ ও সরকারের ভুল রাজনীতি ও কৌশলকে কাজে লাগিয়ে নুর এক্সিডেন্টাল ভিপি হয়েছেন । অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান নুর ভিপি হয়ে কান্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলা শুরু করে দেন । নিজেকে মুই কি হুনরে ভাব নিয়ে কথা বলতে থাকেন । সে নিজেকে জাতির ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ করে ফেলেন । তিনি জাতীয় সকল বিষয়েই জড়িয়ে পড়েন । তার বিশেষ কোন আয়ের উৎস না থাকলেও পরিবার নিয়ে থাকেন ফ্ল্যাটে এবং চলেন ব্যক্তিগত গাড়ীতে । রাতারাতি এমন ফুলে ফেঁপে উঠা নিশ্চয় প্রশ্নের উদ্রেগ করে ।

যাহোক আজকের আলোচনা বিষয় হলো, আমরা কেউই জানি না অভিযোগকারী ছাত্রীটির অভিযোগ সত্য না মিথ্যা। কিন্তু একটি অভিযোগ এসেছে যার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যে দুই জনকে গ্রেফতারও করেছে। নুর জাতীয় পর্যায়ের নানা ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে থাকেন এবং চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সরব । আমার প্রশ্ন, নুর কি একজন ভিক্টিমের চরিত্র নিয়ে এমন নগ্ন মন্তব্য করতে পারেন? অভিযোগকারিনী এর আগে বলেছিলেন যে নুর তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আজকে নুরের এই বক্তব্য কি সেটিকেই সমর্থন করছে না?

আইন তার নিজের গতিতে চলবে। সেখানে প্রভাব খাটাতে গেলে আপনাকে ভুল পথেই যেতে হবে। নুরের এই বক্তব্য আসলে আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া কুপুমুণ্ডুক জনগোষ্ঠীরই বক্তব্য, যারা নারীকে কেবল দুর্বলই ভাবে না, সুযোগ পেলেই নারীর চরিত্র নিয়ে মনগড়া কাহিনী গড়তে পিছ পা হয় না। নুরের বক্তব্য একজন নারীর প্রতি মারাত্মক অবমাননাকর ও আপত্তিজনক। স্বাধীন বাংলাদেশের আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার সবারই আছে। সুতরাং আমি মনে করি, নুরের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আরেকজনের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছেন। সামাজিকভাবে হেয় করেছেন একজন নারীকে।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাইবেন, আবার আপনি নিজেই ধর্ষকের আশ্রয়দাতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিবেন- এটা কারোই কাম্য নয়।

যখন নুরসহ সকল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া চলছে। এমন একটি মুহূর্তে নুরের এমন বক্তব্য আসলে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না’ টাইপ হয়ে গেল। নুরদের বিরুদ্ধে মামলার বাদী বলেছেন, ‘আমি দুশ্চরিত্রা হলে নুরের সহযোগীরা কি চরিত্রবান? ‘প্রথমত তিনি (নুর) যা বলেছেন সব বানোয়াট, মনগড়া কথা বলেছেন। এরপরেও তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে যদি ধরেও নেই আমি দুশ্চরিত্রা, তাহলে তার সহযোগী সোহাগ বা মামুন কী? তারা কি চরিত্রবান?’ কথাটি বেশ যুক্তিসংগত । নুরের কথা সত্যি ধরে নিলে বলতে হয়, নুর যাদের নিয়ে ঘুরেন, যাদের প্রশ্রয় দেন, তারাও দুশ্চরিত্র। ‘তারা তো এতদিন কিছু স্বীকারই করেননি। ভিডিওর মাধ্যমে এবার নুর কার্যত স্বীকার করে নিলেন তার সহকর্মীদের অপরাধ।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে রাজনীতির ফায়দা লুটার জন্য জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছেন অথচ, তাদের উচিত ছাত্রীটির পাশে দাঁড়ানো এবং তার কথা শোনা ।

(লেখক- যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী।)




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *