৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ব্রাসেলসে সর্বশান্ত!

আপডেট : নভেম্বর ২০, ২০২০ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

52

প্যারিসে এবার উঠেছি প্লাস দ্যু ক্লিসি এভিনিউর ক্যাফে লুনার রেস্টহাউজে। ক্যাফে লুনার সত্ত্বাধিকারী কাজী এনায়েতউল্লাহ, আমাদের প্রিয় ইনুভাই। আমি এসেছিলাম জার্মানীর বার্লিনে ডিআইডি’র আমন্ত্রনে। দুইদিনের একটি সেমিনার শেষে চলে এসেছি প্যারিস ঘুরতে। এখান থেকেই ঢাকায় ফিরবো।
ক্যাফে লুনায় ইনুভাইয়ের দেয়া ডিনারে দেখা হয় সঙ্গীতশিল্পী বাদশা বুলবুল ও আব্দুল মান্নানভাইদের সাথে। এসেছেন বাংলারমেলায় আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে। তিনদিন পরে অনুষ্ঠান। এর আগেও আমরা তিনজন বহুবার প্যারিস এসেছি। এখানকার সবই দেখা। তাই আগামী দুইদিন এখানে কিভাবে কাটবে ভেবে বুলবুলভাই বললেন, চলেন কাল সকালে বেলজিয়াম যাই। একদিন থেকে আবার চলে আসব।
বিশেষ কিছু কাজ থাকায় তাদের সাথে পরের দিন আমার ব্রাসেলস যাওয়া হয়নি। প্যারিসের কাজ গুছিয়ে দুইদিন পরে কিন্তু একাই ব্রাসেলস যাওয়া হয়।

পুর্ব থেকে কোন প্ল্যান ছিল না বেলজিয়াম যাব। প্যারিস আসার পর আন্টারপ্রেন থেকে ফারুকভাই বারবার করে বলেছেন, এতো কাছে এসে আন্টারপ্রেন আসবেন না, এটা কেমন করে হয়?

বেলজিয়ামে আমার দুই শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু ফারুকভাই ও নিপুভাইয়ের জন্য এবার আমার বেলজিয়ামে যাওয়া। তাদের উষ্ণ আতিথেয়তায় দারুন ক’টা দিন কেটেছে। সেখানে কয়েক দফা গিয়েছি, ফারুকভাই ও নিপুভাইয়ের বাসায় দীর্ঘদিন থেকেছি। অদ্ভুত ভাললাগার শহর আন্টারপ্রেন। সেই গল্প পরের কিস্তিতে লিখব। এখন লিখছি দুইবার ব্রাসেলস ভ্রমন বৃত্তান্ত।

বুলবুলভাইরা বেলজিয়াম ঘুরে আসার দুইদিন পর সকালে প্যারিসের গার্দুনর্দ রেলস্টেশন থেকে থালেজ ট্রেনে চেপে সোজা ব্রাসেলস রওয়ানা দেই। মাত্র দেড়ঘন্টায় পৌঁছে যাই মিডি রেল স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমেই ব্যাকপ্যাক কাঁধে শহর ঘুরতে বের হই। হাতে তিন ঘন্টা সময়, বিকেল ৫টার ইউরোলাইন বাসে যাবো বেলজিয়ামের আরেক প্রসিদ্ধ শহর আন্টারপ্রেন।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস। ১৬২ স্কয়ার কি,মি, আয়তনের ছোট এই শহরটি সাঁজানো, গোছানো ও কোলাহলমুক্ত। নানান কারনে ইউরোপের এ শহরটি আমার পছন্দের। এখানে রয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের হেডকোয়ার্টার, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও ন্যাটোর দপ্তর। এছাড়াও অনেক নান্দনিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।

স্টেশন থেকে বের হয়ে প্রথম দেখায় ব্রাসেলসের সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। সত্যি ছিমছাম শান্ত সুন্দর ছোট্ট একটি শহর। এতো সুন্দর আর পরিপাটি যে, যেদিকে তাকাই চোখ জুড়িয়ে যায়। পুরানো আমলের শতবর্ষী দালান আর আধুনিক হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের অপুর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস। ইউরোপের অন্যতম পুরোনো শহর। ইউরোপীয় সংস্কৃতি এবং জীবনাচারণের দারুণ সংমিশ্রণ ঘটেছে এই শহরে। বেলজিক ভাষার সাথে ফরাসি, জার্মান ও ডাচ ভাষার প্রচলন রয়েছে।বড় বড় শহরগুলোতে ইংরেজি ভাষাটাও চলে। তবে বেলজিকরা ইংরেজিতে অতোটা স্বাচ্ছন্দ্য নয়। তাই সহজে তারা ইংরেজি বলতে চায় না।

আগেই উল্লেখ করেছি এখানে আমার আসার কথা ছিল না। আন্টারপ্রেন যাচ্ছি বলে মনে হলো একটু ব্রাসেলস ঘুরে যাই। এ যাত্রায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড কোয়ার্টার দেখাটা আসল উদ্দ্যেশ। আমার পরিচিত একজন শুভাকাংখি লিটন খন্দকার থাকেন ব্রাসেলসের ওয়াটারলুতে। সেন্ট্রাল স্টেশনের পাশে তার ব্যবসা প্রতিষ্টান, সুরমা। দু’কদম এগিয়ে যেতেই সুরমায় পেয়ে যাই লিটনভাইকে। অনেকদিন পর দেখা।
তাকে আগেই জানিয়েছিলাম,স্বল্প সময়ের জন্য আসবো, দু’চারটে দর্শনীয়স্থান দেখতে চাই।
স্বল্প সময়ের কথা শুনে তিনি একটু মন খারাপ করেন।

লিটন ভাইয়ের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বের হয়ে পরি শহর দেখতে। পুর্ব সিদ্ধান্তানুযায়ী তিনি আমাকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিল্ডিং দেখাতে নিয়ে যান। সুবিশাল স্টার আকৃতির এই কাঁচের বিল্ডিং সত্যিই খুব মনোমুগ্ধকর। ১৯৬০ সালের নির্মিত এই ভবনটি প্যারিসের ইউনেস্কো হেড কোয়ার্টারের আদলে নির্মিত।

বেলজিয়ামকে বলা হয় বিয়ার আর চকলেটের দেশ।হাজারো রকমের বিয়ার আর চকলেট পাওয়া যায় এখানে। ছোট বড় রাস্তার আশপাশে পাব, বার, স্পোর্টস বার ও ক্লাবের ছড়াছড়ি। এগুলোতে বিয়ারের জয় জয়কার। বেলজিকদের চকোলেট প্রীতি ঈর্ষনীয়। প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ টনের বেশি চকলেট তৈরি হয়। আর বেলজিয়ামের গ্লাস তো জগদ্বিখ্যাত।

ব্রাসেলসের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইউরোপের অন্যন্য নামীদামী শহরের চেয়েও ভাল। ট্রাম, মেট্রো, রেল, বাস, বিমানসহ সবধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ব্রাসেলস হয়ে উঠেছে ইন্টারন্যাশনাল হাব। আশির দশকে বাংলাদেশ বিমান লন্ডন, ফ্রাংকফ্রুট, প্যারিস, রোম ও ব্রাসেলস এই রুটে চলাচল করতো। এখন বিমান ইউরোপের লন্ডন রুটে চলাচল করে। উচ্চশিক্ষার জন্যও ব্রাসেলস বিখ্যাত। ইউনিভার্সিটি লিবার ডি ব্রাসেলস, ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি লুভেন এর মতন বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ইইউ সদর দপ্তর থেকে আমরা চলে আসি ” দ্যা গ্র্যান্ড প্লেস” দেখতে। এরপাশে ‘দ্য সিটি টাউন হল’। অসাধারন নান্দনিক স্থাপত্যের জন্য আলাদাভাবে নজর কেড়ে নেয় গ্র‍্যান্ড প্লেস। এই স্থানটিকে কেন্দ্র করেই ব্রাসেলসের সবচেয়ে বড় বাজার গড়ে উঠেছে। আড্ডা হোক কিংবা রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি, সবকিছুই অনুষ্ঠিত হয় ব্রাসেলসের এই প্রাণকেন্দ্রে।
গ্র‍্যান্ড প্লেসের ঠিক লাগোয়াই বলা চলে টাউন হল। ১৪০২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর্চড জানালা এবং বিভিন্ন ভাস্কর্যের সঙ্গে তৈরি টাওয়ার, এখানকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বহন করে চলেছে বেলজিক ঐতিহ্য।

ঘুরতে ঘুরতে আমরা চলে আসি রয়্যাল মিউজিয়াম অফ ফাইন আর্টস বিল্ডিংয়ের সামনে। সময় স্বল্পতার কারনে ভেতরে ঢোকা হয় না। বাহির থেকে অতৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি মিউজিয়াম ভবন।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে। লিটনভাই মজা করে বলেন, মিয়া ব্রাসেলস এসে রাজাবাড়ি না দেখে চলে যাবে নাকি? রাজা রানী দু’জনের দর্শন নিয়ে যাও।
-কতদুর রাজবাড়ি?
এইতো সামনেই। মিনিট পাঁচেক হাঁটতে পারবে তো?
-কন কি, এতো মেলা দূর রে ভাই!

আমার কথা শুনে লিটনভাই হো হো হো করে হাসেন।
শোন মিয়া, দুই মিনিটে রাজবাড়ি দেখে রেস্টুরেন্টে ফিরে যাব। খাওয়ার জন্য তো কিছু সময় লাগবে।
দেরি হলে বাস ধরতে পারবে না।
-চলেন তাহলে, নেক্সট টাইম দুই তিনদিন
থেকে পুরো ব্রাসেলস সময় নিয়ে দেখব।
ধুর, তুমি আর আইবা, এর আগেও কথা দিয়া কথা রাখোনি।
-না ভাই, সামনে আবার আসব।
দেখা যাক। এখন চলো রাজাবাড়ি দেখাই।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে দ্যা রয়্যাল প্যালেস অফ ব্রাসেলসের সামনে চলে আসি। একসময় বেলজিয়ামের রাজা-রানি এই প্যালেসে থাকতেন। এখন এই প্রাসাদ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।
সব সময় দর্শনার্থীদের ভীড় লেগেই থাকে।

রাজার প্যালেস দেখে আমরা সুরমায় ফিরে আসি।
কিছু সময় লিটনভাইয়ের সাথে আড্ডা দিয়ে বিদায় নেই। সেন্ট্রাল মেট্রোর সামনে থেকে ইউরোলাইন বাসে চেপে বসি আন্টারপ্রেনের উদ্দ্যেশ্যে।
২.
দ্বিতীয়বার ৪ বছর পর ব্রাসেলসে আমি ব্যাগ, টাকা হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছি। সেটা ২০১৭ সালের ঘটনা।প্যারিস থেকে বেলজিয়ামের আন্টারপ্রেন যাচ্ছি ইউরোলাইন বাসে। সাথে ছোট একটা সাইডব্যাগে কিছু টি শার্ট,প্যান্ট, পাঞ্জাবীসহ ২টা গল্পের বই ,ডায়েরি,কলম ও কিছু নগদ ইউরো। আর বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। এই একটা জিনিস, আমার সব ল্যাগেজ, হ্যান্ডব্যাগ একটি করে থাকে। পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন সব সময় প্রিয় দেশ, প্রিয় পতাকা ব্যাগে থাকবেই।

প্যারিস থেকে বাস ছাড়ার পর ঘুমিয়ে পড়ি। সেই ঘুম ভাঙ্গে ব্রাসেলসে এসে। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন কমিশন বিল্ডিংয়ের সামনে বাস থামলে নীচে নামি কফি খাওয়ার জন্য। ৫/৭ মিনিট পরে এসে দেখি আমার ব্যাগ হাওয়া মে উড়তা যায়ে..!
বাস থেকে নেমে যাবার সময় কেউ একজন চুরি করে নিয়ে গেছে।
ব্যাগ, ইউরো হারিয়ে দুঃখ নেই কিন্ত ভীষন মন খারাপ হলো জাতীয় পতাকাটির জন্য। চোর এই পতাকার মর্যাদা বুঝবে না।তার কাছে এটি শুধু এক টুকরো কাপড় ছাড়া কিছুই না। সে কখনো বুঝবে না, এর সাথে কত আবেগ ভালোবাসা জড়িয়ে আছে।
পাবো না জেনেও শুধু পতাকাটির জন্য বাসের ভেতর অনেক খুঁজেছি।

১৮.১১.২০২০
মন্ট্রিয়েল