৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং | ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বিমানের ভাড়া নিয়ে তুঘলকি কারবার, কিভাবে ফিরে যাবে প্রবাসীরা?

আপডেট : জুন ২৯, ২০২০ ১০:০৮ অপরাহ্ণ

26

মাসুদ কামাল

আমার খুবই পরিচিত একজন ঢাকা থেকে রোম যাবেন। মার্চের তিন তারিখে ১৫ দিনের জন্য ঢাকায় এসে করোনার কারণে আটকে গেছেন। কাতার এয়ারওয়েজে এসেছিলেন। রিটার্ন টিকেট নিয়ে যোগাযোগ করলে এয়ার লাইনস থেকে জানানো হয় আগস্টের আগে কোন সিট পাওয়া যাবে না। এর মধ্যে এক ট্রাভেল এজেন্সি জানালো- বিমানের কিছু চার্টার্ড ফ্লাইট যাচ্ছে, ভাড়া হয়তো একটু বেশি লাগবে, তাতে টিকেট পাওয়া যাবে। ঢাকা থেকে রোমের ওয়ান ওয়ে টিকেটের জন্য তার কাছে চাওয়া হয় এক লাখ দশ হাজার টাকা। তিনি রাজি হলেন। বলা হলো ২ জুনের টিকেট পাওয়া যাবে। শেষ মুহূর্তে সে তারিখ পরিবর্তন করে বলা হয়, ২ তারিখের ফ্লাইটে কোন সিট নেই, ৬ তারিখে যেতে হবে। তবে এবার দাম পড়বে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা!
এত টাকা কেন? আগের ফ্লাইটে এক লাখ দশ, আর চারদিন পরের ফ্লাইটে এক লাখ ত্রিশ কেন? কোনই ব্যাখ্যা নেই। বিষয়টি জানার পর আমার পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। যা জানলাম, বুঝতে কষ্ট হলো না, বিশ্বব্যাপী আতংক সৃষ্টিকারী করোনা যেন আমাদের এভিয়েশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু সরকারি ও বেসরকারি লোকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। করোনাকে পুঁজি করে এরা রাতারাতি আকাশচুম্বি মুনাফা করতে নেমেছে। একটি সংগঠন বিমান চার্টার্ড করে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যে টিকেট বিক্রি করছে। তাদের এই মুনাফার ধারা অব্যাহত রাখতে বিমান বিলম্ব করছে তাদের নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায়। ফলে যে সকল প্রবাসীর এখনই বিদেশে নিজেদের কর্মস্থলে ফেরা জরুরি, তাদেরকে দুই তিনগুণ টাকা দিয়ে টিকেট করতে হচ্ছে।
আর যারা চার্টার্ডের বাইরে নিয়মিত ফ্লাইটে যেতে চাইছেন, তাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা আরও বেশি। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি রুটে কাতার এয়ারওয়েজ এবং এমিরেটস এর কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এসব এয়ার লাইন্সে যাদের রিটার্ন টিকেট রয়েছে, তারা যোগাযোগ করলে এয়ারলাইন্স থেকে বলা হচ্ছে, ১৫ আগস্টের আগে কোন সিরিয়াল নাই। সব সিট বুকিং হয়ে গেছে। রিটার্ণ টিকেটের আশা বাদ দিয়ে নতুন করে টিকেট করতে গেলে চাওয়া হচ্ছে পাঁচ থেকে দশগুণ দাম। প্রথমেই বলা হচ্ছে ইকোনমি ক্লাসের কোন টিকেট নেই, নিতে হবে বিজনেস ক্লাসের টিকেট। আর দাম? দাম শুনে চক্ষু চড়কগাছ। যেমন ঢাকা থেকে রোমের বিজনেস ক্লাসের ওয়ানওয়ে টিকেটের আগে দাম ছিল ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। আর এখন বিজনেস ক্লাসের একটি টিকেটের দাম কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা!
আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসায় করে। সে জানালো- এমন তুঘলকি কাণ্ড নাকি তার ৩২ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে সে কখনো দেখেনি। সে বললো- যে যাত্রীরা বিদেশে যাচ্ছে, তাদের প্রত্যেকেরই করোনা টেস্ট করে পাঠানো হচ্ছে। তাহলে আর ২৫ শতাংশ সিট খালি রাখার প্রয়োজনীয়তাটা কোথায়? এই যে ২৫ শতাংশ সিট খালি রাখা হচ্ছে, এই সিটের ভাড়া তো যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করা হচ্ছে। তাহলে লাভটা কি হলো? আবার বিদেশী যে এয়ারলাইনসগুলো আমাদের এখানে আসছে, তারা কি ওই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে? মোটেই না। তারা কিন্তু পুরো আসনেই যাত্রী নিয়ে আসছে।
বন্ধুটি জানালেন, বিদেশে ফেরার জন্য এখন লাখ লাখ যাত্রী অপেক্ষা করছে। কিন্তু যেতে পারছে প্রতি সপ্তাহে বড়জোর ৮০০ থেকে এক হাজার জন। ফলে মানুষের চাপ বাড়ছে প্রতিদিনই। প্রবাসীরা ফেরার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বাড়তি সেই আগ্রহকেই পুজি করেই মুনাফা ‍লুটছে একটি গোষ্ঠী। আর সরকার সব জেনেও চুপচাপ বসে দেখছে।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে কার্যইকর ক্ষেত্র হচ্ছে এই প্রবাসী আয়। এই যে কোটি কোটি ডলার প্রবাসীরা বিদেশ থেকে পাঠাচ্ছে, বিনিময়ে সরকারের কাছে থেকে তারা কি পাচ্ছে? তারা তো গার্মেন্টস মালিকদের মতো কোন প্রণোদনা চায়নি। তারা চেয়েছে কেবল- যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে। সে কাজটাও যদি সরকার করতে না পারে, তাহলে এ সরকারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু আর থাকতে পারে?
ভালোবাসা তো আর একতরফা হয় না, অথবা একতরফা ভালোবাসা বেশিদিন থাকেও না।

(লেখক- সাংবাদিক)