২৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বিটোফেনের শহর বনে

আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

50

সেবার মানে ২০১২ সালে জার্মানী এসেছি বনে শিলার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের আমন্ত্রনে। উঠেছি বনের কেন্দ্রেই এস্টোরিয়া হোটেলে৷ আমার সাথে ঢাকা থেকে এসেছেন সাংবাদিক চয়ন রহমান। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় বেশ ঠান্ডা ৷ মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হচ্ছে৷ হোস্ট বেঞ্জামিন ইফারের কাছে জানতে পারি এই হোটেলে রোজ রাতে, কোনও একটি ফোন থেকে অর্গান বেজে ওঠে৷ বেশ জোরালো আওয়াজ৷ ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু অনেকেই ইউরোপীয় নিস্তব্ধতার মধ্যে জোরালো অর্গানে মিউজিক শুনে শিউরে উঠে৷ তখন সে আর সঙ্গীত থাকে না৷ পরে শুনেছি ওই হোটেলে নাকি অতীতে কোনও এক উচ্চপদস্থ নাৎসি অফিসার বসবাস করতেন৷ তিনি নাকি মোজার্ট, বিটোফেনের ভক্ত ছিলেন। তাদের মিউজিক শুনতে শুনতে রাতে ঘুমাতেন। এমনই এক তুমুল বরিষন রাতে বিটোফেন শুনতে শুনতে কপালে গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন। শুনেই শীতের রাতে ঘেমে উঠি। আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল৷ ভুত প্রেত আছে কিনা কে জানে!
হোটেলে ঢুকলেই মনে হত আমি সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলিতে ঢুকে পড়েছি, এটি বুঝি একটি বান্কার৷ সারাদিন নানান শিডিউল, ব্যস্ততার মধ্যে থাকলেও সেই হোটেল কিন্তু আমায় আর্কষণ করত।

মাত্র পাচদিনের বন সফরের প্রথম দুইদিন ছিল অফিসিয়াল ট্যুর। বাকী তিনদিন ছিল ব্যক্তিগত।
অফিসিয়াল ট্যুরের প্রথম দিন কেটেছে খুব ব্যস্ততার মাঝে। সকাল ৮টায় শিলার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের ডিরেক্টর বেঞ্জামিন ইফেরের সাথে ব্রেকফাস্ট এবং ৯টা পর্যন্ত মিটিং। এরপর সারাদিনব্যাপী শুরু হয় একগাদা শিডিউল প্রোগ্রাম। পরের দিনটি ছিল বন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজে পড়তে আসা বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের সাথে মতবিনিময় সভা এবং লাঞ্চ। বিকেলটি ছিল বন বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিট। সন্ধ্যায় অফিসিয়াল ডিনারের মধ্য দিয়ে আমি ও আমার সাথের চয়নভাই ফ্রি হয়ে যাই। রাতে প্ল্যান করে ফেলি বাকী দুইদিন বন ও কোলনের কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বাল্যবন্ধু মিল্টন ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী যুবরাজভাই আমাদের গাইড করবেন।

তৃতীয়দিনদুপুরে মিল্টন নিয়ে যায় তাঁর বাসায়। প্রায় ২৬ বছরের প্রবাসে কাটিয়ে দিয়েছে।মিল্টন বন শহরের যে অঞ্চলে থাকে তার নাম ‘বাড গডেসবার্গ’৷ খুবই শান্ত পরিবেশ৷ তাঁর জার্মান স্ত্রী এলিজ ও দুই কন্যা নিয়ে ছোট সংসার।
এলিজ চমৎকার বাংলা বলতে পারায় খাবার টেবিলে আমাদের আড্ডা জমতে বেশী সময় লাগেনি। ওর কন্ঠে ” আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি ” শুনে চয়নভাই ও আমি আবেগে আপ্লুত হয়েছি।
বিকেলে মিল্টন আমাদের বন শহর ঘুরিয়ে দেখায়। রাইন নদীর তীরে বন শহর গড়ে উঠেছে।যতদুর চোখ যায় সবুজ পাহাড়ের গায়ে থাকে থাকে সাঁজানো লালরঙের ত্রিকোণ ছাদের বাড়ির সারি, গির্জার চুঁড়া, তোরণ, ঝলমল রোদের আলোয় কি যে মায়াময় লাগে!

সারাবিকেল ঘুরে ঘুরে কোলনের ষোড়শ কিংবা সপ্তদশ শতকের গির্জা, রাইন-নদীতে ষ্টীমারে ভ্রমণ, বনে বিটোফেনের বাড়ি, চিত্রশালা, অপেরা দেখা হলো।
প্যারিসের মতন এখানেও ট্র্রাম, বাস বা ট্রেনে সব বয়সী মানুষের হাতে বই দেখে ভাল লাগল। অনেকে ট্যাবে, কিন্ডলে বই পড়ছে। বইয়ের গন্ধ নেই।তাতে কী? যে কোন মাধ্যমেই কাউকে বই পড়তে দেখলে আমার আনন্দ ও ভাললাগে।

ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতন বন শহরেও প্রচুর সাইকেলপ্রেমী আছেন। সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী বা উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা সবাই।
বনের একেবারে হার্ট পয়েন্ট হচ্ছে সিটি সেন্টার।এখানে আছে বিশাল এক চার্চ । যারা ইউরোপের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তারা ভাল করে জানেন, ইউরোপের প্রতিটি ছোট বড় শহরে অসংখ্য চার্চের ছড়াছড়ি। মিল্টন পে-পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমাদের নিয়ে চার্চের ভেতরে ঢুকে। অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। কোথাও কোন টু শব্দটি নেই। একদিকে মোমবাতি জ্বলছে। অন্যদিকে যিশু ও মা মেরির মূর্তি, সবকিছুই সুন্দর। স্বল্প আলোয় ভীষণ গা ছমছমে একটা ব্যাপার স্যাপার আছে। দু’একজন প্রার্থনারতদের কেমন ভুতূরে লাগে। চার্চের দেয়ালজুড়ে মেরী, যিশুর বেশ কিছু পোর্টেট ঝুলানো।

চার্চ থেকে বের হয়ে সামনে পড়লো বিটোফেনের স্ট্যাচু। হাতে একটা কাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিটোফেন। আমাদের পরের গন্তব্য বিটোফেনের বাড়ি। তার আগে কফি খেতে পোস্ট অফিসের পেছনের দিকে কিছুটা হেঁটে যাই। মিল্টন ‘মিনি এশিয়া’ নামে একটা দোকানে নিয়ে যায়। এই দোকানের মালিক একজন আফগান। বেশ মিশুক হাসিখুশী মানুষ। বাংলাদেশী, ইন্ডিয়ান খাবার দাবারও পাওয়া যায়। তাই দোকানটি বাংলাদেশীদের কাছে খুবই পরিচিত। পাশে কফিশপ থেকে আমরা কফি নিয়ে হাঁটতে থাকি। সিটিসেন্টারে অনেক বড় বড় ব্র‍্যান্ডের শোরুমের পাশে রয়েছে বইয়ের একটি দোকান যার নাম ‘থালিয়া’। এই দোকানটা ভীষণ সুন্দর। কোন এক অতীতে এটা ছিলো একটা সিনেমা হল। পরে বইয়ের দোকান হলেও থিয়েটার দেখানোর জায়গাটায় বসার চেয়ার ওভাবেই রাখা হয়েছে। এখান থেকে মিল্টন আমাকে বিখ্যাত জার্মান লেখক গুন্টারগ্রাসের ক্যাট এ্যন্ড মাউস এবং ডগ ইয়ার্স কিনে গিফট করে।

এরপর আমরা গেলাম বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট শামীম, খালিদ, মলয়রা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ওদের কথা দিয়েছিলাম বন থেকে ডুসেলড্রফ যাবার আগে দেখা করে যাব। মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ। সেন্টারের একদম কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসটা খুব একটা বড় না হলেও সামনে বিশাল মাঠ, পাশে রাইন নদীর কারণে জায়গাটা বেশ বড় দেখায়। প্রায়ই শিক্ষার্থীরা মাঠে বসে আড্ডা দেয়, কখনো ফুটবল বা অন্য কিছু খেলে। অনেকে সবুজ ঘাসের ওপর টাওয়েল বিছিয়ে শুয়ে বসে বই পড়ে।

শামীম, খালিদ, মলয়,শিমু, জয়িতাদের সাথে মাঠে বসে বেশ কিছু সময় কাটে। ওরা প্রত্যেকে এখানে এসেছে ঢাকা থেকে এসএসবিসিএলের মাধ্যমে। সবাই গ্রাজুয়েশন করছে। সবারই স্বপ্ন গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে দেশে ফিরে যাওয়া। যদি সেখানে কিছু করতে না পারলে আবার ওদের বিদেশমুখী হওয়া হবে দুঃখজনক।
বিকেল ঘনিয়ে আসছে। আমরা বিটোফেনের বাড়ি দেখবো বলে আড্ডা ভঙ্গ দিয়ে উঠতে হলো।
বিটোফেনের বাসা বনের আর দশটা বাসার মতই দোতলা কাঠের বাড়ি। একেবারেই সাদামাটা।এই শহরে
কালজয়ী সংগীত সম্রাট লুডভিগ ফন বিটোফেনের জন্ম। তিনি জন্মেছিলেন ১৭৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর। পাশ্চাত্য সংগীতের ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক যুগের অর্ন্তবতীকালীন সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, সংগীতজ্ঞ ও শ্রোতারা তাঁর কাছে নানাভাবে ঋণী।
৫ ইউরো করে ১৫ ইউরো দিয়ে ৩টি টিকেট কাটতে হলো। সবাই ঢুকে পড়লাম বিটোফেনের বাড়ির ভেতর। এই বাড়িতে বিটোফেনের জন্ম ও বেড়ে উঠা।

১৭ বছর বয়সী কাউন্টেসা গুয়েলিটা গুইচ্চিআরদি নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন বিটোফেন। মেয়েটি ছিল বিটোফেনের ছাত্রী। শোনা যায়, বিটোফেন মেয়েটিকে ‘মুনলাইট সোনাটা’ উৎসর্গ করেছিলেন।শৈশবেই বিটোফেনের সংগীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। এ সময় তিনি বাবার কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। বনে প্রথম ২২ বছরের জীবনে তিনি বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ মোজার্টের সঙ্গে অধ্যয়ন করতেন। সংগীতের আরেক দিকপাল যোশেফ হেইকেনও তাঁর বন্ধু হয়েছিলেন । ১৭৯২ সালে বিটোফেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে আসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানেই থাকেন। ফরাসি বিপ্লব এই মহান সুরকারকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার অনেক কম্পোজিশন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। এর মধ্যে ‘মুনলাইট সোনাটা’র সঙ্গে স্নিগ্ধ আর বিষাদভাব রয়েছে বলে এর খ্যাতি আকাশচুম্বী। বিটোফেন পিয়ানোয় ‘পিয়ানো সোনাটা নং ফোরটিন ইন সি সার্প মাইনর’ নামে একটি কম্পোজিশন করেছিলেন। যা কোয়াসি ইনা ফানটাসিয়া নামে পরিচিত। এটিই সাধারণভাবে ‘মুনলাইট সোনাটা’ নামে পরিচিত। তবে বিটোফিনের সবচেয়ে বিখ্যাত কম্পোজিশন হচ্ছে নাইন সিম্ফনি।

মিল্টনের কাছে বিটোফেনের জীবনী ও ইতিহাস শুনতে শুনতে আমরা বাড়ির অন্দত্মহলে প্রবেশ করি। ছোট ছোট ঘর, প্রতিটি ঘরে বিভিন্ন ছবি-চিঠি, কাগজপত্র, কোনটা পরিবারের কোনটা অন্য কোন সঙ্গীতজ্ঞের পাঠানো। একটি ঘরে বিটোফেনের মৃত্যুর সময় তার মুখের আদলে বানানো মূর্তি রাখা আছে।
এসব দেখে নিচের বেজমেন্টে নামলে একটি ঘর রয়েছে দর্শনার্থীদের বসার জন্য। যেখানে বসে আপনি উপভোগ করতে পারবেন বিটোফেনের মুনলাইট সোনাটা বা অন্য কোন সঙ্গীত। হতে পারে সেটা নাইনথ সিম্ফোনি যা বাঁজানো হয়েছিল বার্লিন দেয়াল পতনের সময়।

সন্ধ্যার কিছু আগে যুবরাজভাই ফোন করেন। আমরা যেন বিটোফেনের বাড়ির সামনে অপেক্ষা করি। রাতে বনের সবচেয়ে বড় চাইনীজ রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে আমাদের নিয়ে যাবেন। একই সময় ডুসেলড্রফ থেকে হাসনাতভাইয়ের ফোন। আগামীকাল যেন দুপুরের ট্রেনে ডুসেলডর্ফে যাই। মিল্টন হাসতে হাসতে বললো, তুই তো দেখি ভিআইপি। আমার ভাগ্যভাল তোকে আগেভাগেই বাসায় নিতে পেরেছি।
রাতে যুবরাজভাইয়ের দেয়া ডিনার ও আড্ডা দিয়ে হোটেলে ফিরতে রাত দেড়টা বেঁজে যায়। মিল্টন আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে যায়। কাল সকালে যুবরাজভাইয়ের সাথে যাব কোলন। সেখান থেকে বিকেলে ডুসেলড্রফ।