৮ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, বলছেন পুলিশ কর্মকর্তারাই – কিন্তু দায় কার?

আপডেট : জানুয়ারি ১৪, ২০২১ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

19

ভয়েস বাংলা ডেস্ক

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের কয়লাঘাট এলাকায় পায়ে পাড়া দেয়ার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যা করা হয়েছে সিফাত নামে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে। এ ঘটনায় যে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় – তাদেরও বয়স ছিল ১০ থেকে শুরু করে ১৪ বছরের মধ্যে।

“গ্রেফতারের পর সবাই হত্যার কথা স্বীকার করেছে, পরে তাদের কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়” – জানান কামরাঙ্গীচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান।

শুধু এই ঘটনাই নয়, বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি ধর্ষণের ঘটনায়ও ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত দুজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে আলোচনা রয়েছে।

বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সী যেসব শিশু কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরকে জেলে নেয়ার পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে – যেন তারা সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, কাউকে আটক করা হলেও তাকে থানায় আলাদা প্রোবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে অন্য অপরাধীদের থেকে আলাদা রাখার নিয়ম রয়েছে।

২০১৯ সালের অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে কিশোর গ্যাং-কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি অপরাধ এবং খুনের ঘটনার পরই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি পদক্ষেপ নেয়।

এর পর ঢাকায় শুরু হয় কিশোর গ্যাং-বিরোধী অভিযান।

একদিনেই অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় শতাধিক কিশোরকে। এর মধ্যে শুধু হাতিরঝিল থানাতেই আটক করা হয় ৮৮ জনকে।

পরে কিশোর গ্যাং-বিরোধী এ ধরণের অভিযানে ঢালাওভাবে কিশোরদের আটকের ঘটনার সমালোচনা হলে হাইকোর্টের নির্দেশে তা বন্ধ করে দেয়া হয়।

তিন কারণে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, বলেন পুলিশ প্রধান

এর আগে মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশে আইনের জটিলতা, জনবলের অভাব এবং অবকাঠামোর অভাবে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

“কিশোর অপরাধ করলে মোবাইল কোর্ট করা যেতো, এখন হাইকোর্ট বলেছে না এটা করা যাবে না। মোবাইল কোর্ট করা যাবে না, নরমাল আদালতে বিচার করা যাবে না, জেলে রাখা যাবে না, রাখবো কোথায়? বিচারে পাঠাবো কোথায়?” – বলেন বেনজির আহমেদ।

তিনি বলেছিলেন, কিশোর অপরাধ দমনের জন্য পরিবারকে দায় নিতে হবে। পরিবার থেকেই সুশিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অবকাঠামোতে শিশু বা কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তবে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য অনেক সময় পদক্ষেপ নেয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেশিরভাগ সময়েই তা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, প্রশাসনিক কিছু জটিলতার কারণে দেখা যায় যে, কোন এক কর্মকর্তাকে শিশু বা কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে কিভাবে ডিল করতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনার পর হয়তো সে অন্য কোথাও বদলি হয়ে গেল। কিংবা ওই থানাতেই অন্য কোন দায়িত্বে চলে গেল।

“তখন আর ওই থানায় এ বিষয়ক প্রশিক্ষিত কোন কর্মকর্তা থাকে না” – বলেন তিনি।

বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সী অপরাধীদের উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সী অপরাধীদের উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।

মি. রহমান বলেন, শিশুদের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা গেলে বর্তমান অবকাঠামোর আওতাতেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

তিনি বলেন, “এগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা সম্ভব যদি মানসিকতাটা আমাদের সেরকম হয়।”

‘সবারই দায় রয়েছে, কেউই দায় এড়াতে পারে না’

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজ পরিবর্তনের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন চর্চার বিষয়টি ভেঙ্গে পড়েছে।

যার কারণে সমাজে একটা শূন্য অবস্থা তৈরি হওয়ায় শিশু কিশোররা নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

তবে এর জন্য কোন ভাবেই কিশোর আইনের ধারা দায়ী নয়। বরং সারা বিশ্বেই এটি স্বীকৃত।

“আমি যদি বলি যে, আইনের কারণে এটি হচ্ছে – তাহলে সেটা কখনোই সঠিক নয়। এ কারণেই নয়, কারণ ১৮ বছরের কম বয়সীদের সংশোধন করে সমাজে পুনর্বাসনের একটা সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত থাকে। আর এ জন্যই একে কিশোর অপরাধ বলে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, কিশোর অপরাধের পেছনে পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

“আমাদের স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি, এলাকা ভিত্তিক সংগঠন, সবারই দায় রয়েছে। কেউই দায় এড়াতে পারে না।”

কিশোর অপরাধ সংশোধনে অবকাঠামোর অভাবকে চিহ্নিত করাটাও একটা ইতিবাচক দিক।

তবে এটি কাটিয়ে উঠতে হলে সমাজের সব সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ ও সদিচ্ছা দরকার বলে মনে করেন মি. রহমান।

মি. রহমান অনেকটা অভিযোগের সুরেই বলেন যে, “আমরা সবাই পপুলার কথা বলছি যে এটা করা যাচ্ছে না, এটা করতে হবে, কিন্তু কেউ এটা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছে না।”

ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার কারণ

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধীদের জন্য মোট তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য টঙ্গি ও যশোরে দুটি এবং গাজীপুরে মেয়েদের জন্য একটি।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক সমাজে পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গঠন এবং জীবনযাত্রা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়াটাও শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ।

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, শিশু কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরণের বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়াও অপরাধ-প্রবণতার বড় কারণগুলোর অন্যতম।

এমন অবস্থায় পরিবারের পাশাপাশি, সামাজিক সব সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা