২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশবন্ধু গুন্টার উলফারত

আপডেট : অক্টোবর ৬, ২০২০ ১০:৩১ অপরাহ্ণ

51

জার্মানে আমার পছন্দের শহর বার্লিন। ছিমছাম পরিপাটি সুন্দর শহর।এখানে আমার দুইজন কাজিন পড়াশুনো করে। বেশ ক’জন নিকটাত্মীয় দীর্ঘদিন যাবত থাকেন। আমার অনেক রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, মিডিয়ার সহকর্মী বাস করেন বার্লিন। এর বাহিরে অসংখ্য বাল্যবন্ধু, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী এখন সপরিবারে জার্মান সিটিজেন। তাদের কারনে বার্লিন আমাকে চুম্বুকের মতন আকর্ষন করে।

ইউরোপের মধ্যে প্যারিস, ভেনিস, রোম,মিলানো, ফ্রাংকফ্রুট, ভিসভাডেন, ডুসেলড্রফ, তুলুজ, ব্রাসেলস , এন্টারপ্রেন , ওয়ারশ, পোজনান, লন্ডন, ডাবলিন, স্টকহোম, কোপেনহেগেন, জুরিখ, প্রাগ কিংবা লিসবন গেলে আমি কখনো নিজেকে একা অনুভব করি না। বন্ধু,স্বজনদের সংস্পর্শে সবসময় মনে হয় আমি দেশেই আছি। কাজের ফাঁকে তাদের সাথে রাত দিন প্রচুর আড্ডা হয়।

বার্লিনে আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, শুভাকাংখি দুলাল উলফারত। অসম্ভব পরপোকারি বন্ধুবৎসল দুলালভাইকে বার্লিনে সবাই একনামে চেনে, জানেন। বার্লিনে আমি গিয়েছি ৭/৮ বার। একবার ছাড়া প্রতিবারই আস্তানা গেড়েছি দুলালভাইয়ের আমরুর স্ট্রাসের বাসায়। এ বাসাটি বার্লিনে পড়তে আসা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের যে কোন বিপদ আপদের ভরসাস্থল। দুলালভাই দিনের বেশীরভাগ সময় ব্যয় করেন শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে। আমি কখনো দেখিনি দুলালভাইয়ের কাছ থেকে কোন শিক্ষার্থীকে শুন্যহাতে ফিরতে। দুলালভাই গুন্টার উলফারতের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন।তিনি ছিলেন জার্মানে দুলালভাইয়ের লিগ্যাল গার্ডিয়ান।

এ শহরে আমার অনেক ছোটভাই থাকেন। তাদের মধ্যে মোরশেদ, অসম্ভব ভাল মনের মানুষ। বার্লিন গেলে ওর সাথে দেখা হবে না এটা ভাবাই যায় না। আমার কাজিনদের সাথে দেখা না হলেও আমি সবসময় প্রাধান্য দিয়ে দেখা করি মোর্শেদ, সানি , রুবেলভাই, রাসেল, মাসুদভাই, মানিক, পিয়ারি আপা ও নাজিরভাইয়ের সাথে। তারা সবাই খুবই আন্তরিক, সজ্জন মানুষ। ২০১৩ সাল থেকে জার্মান গেলে গুন্টারের সাথে একবার দেখা করা রেওয়াজে পরিনত হয়েছিল। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে চলে গেলেন চির শান্তির দেশে। এখন তিনি সব কিছুর উর্ধ্বে। বার্লিনে গেলে আর কখনো তার সাথে দেখা হবে না।

২০১৩ সালের মধ্য জুলাইতে বার্লিনে দুলালভাইয়ের মাধ্যমে আমার পরিচয় হয় গুন্টার উলফারতের সাথে। এই জার্মান প্রৌঢ় সিটেজেন অসম্ভব ভাল একজন মানুষ। বয়সের কারনে কম কথা বললেও প্রথম দেখায় মানুষকে আপন করে নিতেন।

আমরুর স্ট্রাসের বাসা থেকে হাঁটাপথে মাত্র সাত মিনিটের দুরত্বে কারাসন শপিংমল। এখানকার এক কফি শপে দুলালভাই পরিচয় করিয়ে দেন গুন্টারের সাথে। প্রথম পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় নিরহংকার সহজ সরল মানুষটিকে আমার ভাল লেগে যায়। এরপর তার মৃত্যুর পুর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত আমাদের অনেকবার দেখা হয়েছে। একসাথে কফি খেতে খেতে দুই তিনঘন্টা আড্ডা হয়েছে।
স্বল্পভাষী সত্তুরোর্ধ গুন্টার বাংলাদেশ ও তার মানুষকে অসম্ভব ভালবাসতেন। কথা প্রসংগে তার কাছেই জেনেছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। অর্থ দিয়ে,জনমত গঠন করে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে নানানভাবে সহযোগিতা করেছেন।

১৯৭১ সালের ষোল ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতালাভের পর বাহাত্তুর সালে স্বাধীন বাংলাদেশে
ছুঁটে এসেছিলেন। ঢাকার বাহিরে গিয়েছিলেন মহকুমা, থানা পর্যায়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুর্নগঠন প্রক্রিয়া দেখতে।

এরপর ভালবাসার কারনেই পাঁচবার তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। ঢাকার বাইরে রামগঞ্জে দুলালভাইদের বাড়ি যাওয়া আসার মধ্যদিয়ে সেখানে তাঁর অনেক বন্ধু ও শুভাকাংখি গড়ে উঠেছে।

যতোবারই তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে তিনি খুঁটিয়ে
খুঁটিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা জানতে চাইতেন। পথ ঘাট ব্রীজসহ নানান অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা শুনে তাঁর চেহারায় আনন্দের ঢেউ খেলে যেত । তিনি বলতেন , ‘ ইনফাস্ট্রাকচার ডেভেলোপমেন্ট না হলে বিজনেসে গতি আসবে না। ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে না।অর্থনীতির চাকা সচল ও এগুবে না। তোমাদের সরকারের উচিত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে গোটা দেশকে একসুঁতোয় গেঁথে ফেলা।’

বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রচন্ড অনুরাগ ও ভালবাসা ছিল। দুলালভাই ও অন্যান্যদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের গল্প শুনতেন। আমাদের সংস্কৃতিকে বোঝার চেস্টা করতেন। সময় সুযোগ পেলেই তিনি বাংলাদেশীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যেতেন। জার্মানে বাংলাদেশ দুতাবাসেও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। দুতাবাসের যেকোন অনুস্টানে তাঁর সরব উপস্থিতি জানান দিত ‘ আমি বাংলাদেশকে ভালবাসি। ‘

বাংলাদেশের যে কোন সাফল্যের সংবাদে আনন্দিত হতেন । বন্যা, প্রাকৃতিক দূর্যোগের সংবাদে যেমন উদ্বিগ্ন হতেন, তেমনি জংগিবাদ, সন্ত্রাসের সংবাদেও বিমর্ষ হতেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় প্রায় বলতেন, বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা।

বাংলাদেশ অন্ত:প্রান এই মানুষটির সাথে বার্লিনে আমার অনেক গল্প। অনেক স্মৃতি। কখনো ভাবিনি পরিচয়ের তিন বছরের মধ্যে তিনি চলে যাবেন । আর কখনো বার্লিনে দেখা হবে না।জানতে চাইবে না কেমন আছে বাংলাদেশ ।

২০১৬ সালের আগস্ট গুন্টার উলফার‍্য মৃত্যুবরণ করেন। একমাস পর সেপ্টেম্বরে বার্লিনে পৌঁছাই ভোরে। আমরুর স্ট্রাসের বাসায় ল্যাগেজ রেখে দুলালভাই ও মোর্শেদকে নিয়ে জিস্ট্রাসে খৃস্টান সমাধিস্থানে যাই । বাংলাদেশের বন্ধু গুন্টার উলফারতের সমাধিস্তম্ভে পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই।

গুন্টারের মৃত্যুর পর আরো তিনবার আমার বার্লিন যাওয়া হয়। প্রতিবারই সময় করে গুন্টারকে দেখে আসি জিস্ট্রাসে খৃস্টান সমাধিস্থানে। প্রতিবার ফেরার পথে বলে আসি, ভাল থেকো বাংলাদেশবন্ধু। ‘