২৭শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফ্রাংকফ্রুট থেকে বার্লিন

আপডেট : ডিসেম্বর ১৭, ২০২০ ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

19

ডিআইডি ডয়েচ ইন্সটিটিউটের আমন্ত্রনে বার্লিন আসা হলো জার্মানির ফ্রাংকফ্রুট থেকে। ঢাকা হতে জার্মানীর ফ্রাংকফ্রুট এসে বেশ কয়েকদিন ছিলাম ভিসভাডেন। এখানে আমার বাল্যবন্ধু বাপীর বড় দুইভাই আরিফ ও আসিফভাই থাকেন। তাদের জাপানী ফুডসের ব্যবসা, সুশি ওয়ান। প্রতিষ্ঠানটির খুব নামডাক। বেচাকেনাও বেশ। সব সময় লোকজনের আনাগোনায় গমগম করে।
ভিসভাডেনে ছিলাম মাত্র তিনদিন। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়িয়েছি। রাত হলে আসিফভাইয়ের সাথে ক্লাবে। ডিজে পার্টি কিংবা স্পোর্টস বারে সময় কেটেছে।

এক বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পেয়েছি কলেজ জীবনের বন্ধু স্বপনকে। দীর্ঘ ২১ বছর পর দেখা।সেও দেশ ছেড়েছে ১৮/১৯ বছর। স্বপনের মাধ্যমে পরিচয় ও ঘনিষ্টতা হয় রাজীবভাইয়ের সাথে। স্বপন তখন ব্যাচেলর। একাই থাকে বিশাল এপার্টমেন্ট নিয়ে।সেইদিন তার বাসায় রাতভর আমাদের আড্ডায় কত স্মৃতিরচারণ, কত বন্ধুর গল্প উঠে এসেছে। বারবার ফিরে গেছি ১৯৮৭-৮৯ সালের যৌবনের উত্তাল দিনগুলোতে। ফিরে গেছি তোলারাম কলেজ, ডাকবাংলো, চাষাড়া, জামতলা থেকে পঞ্চবটি শাসনগাঁও। কত দুপুর আড্ডায় বসে উঠেছি রাতে।আমরা আড্ডায় বসলে সময়, খাওয়া দাওয়া সব শিকে উঠতো! আহা কি দিন ছিল আমাদের!

ডিআইডির প্রোগ্রামের পুর্বের দিন ভিসভাডেন হতে দুপুরে বাস চেপে ফ্রাংকফ্রুট এসে বিমানে উঠে বসি।ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে পৌঁছে যাই বার্লিন। টেগেল বিমানবন্দরে যখন বিমান ল্যান্ড করে তখন পড়ন্ত বিকেল। হাইরাইজ বিল্ডিং ও গাছের ফাঁকে ফাঁকে চোখ জুড়ানো মিষ্টি রোদের আভা। ল্যান্ডিংয়ের সময় আকাশ থেকে দেখেছি চতুর্দিকে শুধু বিল্ডিং নয়, ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি। বাংলাদেশে পৌষের শীতের সময় শেষ বিকেলের নরম আলো যেমন উষ্ণতা দেয়, তেমনি বার্লিনের পড়ন্ত বিকেলের মিস্টি আলোর উষ্ণতায় ভ্রমণের ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

শীতপ্রধান দেশের মানুষজন সামারের জন্য অপেক্ষা করে তীর্থের কাকের মতন। ইউরোপজুড়ে জুন মাসের এই সময়টা সম্ভবত বছরের সবচেয়ে উপভোগ্য সময়। সামারের ছুটিতে হাজার হাজার টুরিস্ট ভ্রমনে বেড়িয়ে পড়েন। বিমানবন্দরে দেখা মেলে বিভিন্ন দেশের শত শত ট্যুরিস্টদের। কেউ মাত্রই এসেছেন বার্লিন। আবার কেউ ভ্রমন শেষে অন্যকোন শহরের উদ্দেশ্যে ডিপারচারের জন্য অপেক্ষা করছেন।

টেগেল বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সারতে খুব একটা সময় লাগল না। টার্মিনালের লাউঞ্জে অপেক্ষায় ছিলেন জসিমভাই । অভ্যর্থনা জানিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর আমাকে নিয়ে ছুঁটলেন মেট্রো স্টেশনের দিকে।জার্মানরা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহবোধ করেন না। মুলতঃ পার্কিং ও গ্যারেজের কারনে। তাদের গণপরিবহন ব্যবস্থা এতটাই আরামদায়ক এবং সুবিধাজনক যে, ব্যক্তিগত গাড়ি সেখানে একটি বাড়তি ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই নয়! ইউরোপের সব শহরেই গাড়ি পার্কিং বড় সমস্যা। তাই জার্মানীদের মতন আমার অনেক পরিচিতজন গাড়ি ব্যবহারে আগ্রহবোধ করেন না।

বার্লিন জার্মানির সব থেকে বড় শহর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে লন্ডনের পরই এখানে বেশি মানুষের বসবাস।ব্রান্ডেনবুর্গ প্রদেশের একটি শহর হচ্ছে বার্লিন।

বরাবরের মতন বার্লিনে আমার আস্তানা-ঠিকানা হয় জসিমভাইয়ের আমরুমারস্ট্রাসের এপার্টমেন্ট। অবস্থানগত কারনে এখান থেকে সহজেই যাওয়া যায় বাসস্টেশন, সাবওয়ে, বিমানবন্দর।

আগের অনেক পর্বেই লিখেছি, বার্লিন পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ শহর বিখ্যাত তার বহুজাতিক সংস্কৃতি , রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও বিজ্ঞানচর্চাসহ বিভিন্ন কারনে। জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন শিক্ষকতা করেছেন Humboldt University of Berlin এ। বিসমার্ক, গ্যেটে, ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ার, কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগেসহ কত বিখ্যাত মানুষের জন্ম, বেড়ে উঠা ও আনাগোনা ছিল এই শহরে।

বাসায় ফ্রেশ হয়ে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় জাসিমভাইয়ের সাথে বের হই। রাতের বার্লিন অদ্ভুত সুন্দর। ঝকঝকে পথঘাট, নিয়ন আলো, রাস্তার দু’পাশে বিশাল বিশাল অট্রালিকা। খাবারের দোকান, বার,পাব, নাইটক্লাবগুলোতে মৃদু মিউজিকের সাথে উপচেপড়া ভীড়। রাত যতোই গভীর হোক না কেন আকন্ঠপানে ডুবে থাকা তারুন্যের উচ্ছাসে মনে হবে সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে! রাত ১২টায় এতো কোলাহলের মাঝে আপনি বলতেই পারেন, night is still young.

পূর্ব সিদ্ধান্তানুযায়ী আমরা ঘুরতে ঘুরতে চলে যাই রুবেল ভাইয়ের রেস্টুরেন্টে। চমৎকার মানুষ নুরে আলম সিদ্দিকী রুবেল ভাই। ঢাকার প্রানকেন্দ্র ফার্মগেইট এলাকায় জন্ম, বেড়ে উঠা। তেজস্বী এই তরুন একসময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, ঢাকার রাজপথ দাবড়ে বেড়িয়েছেন। এখনো সক্রিয় রাজনীতি করেন। বার্লিন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক।

অনেকদিন পর তার সাথে দেখা। কাস্টমারদের চাপ সামলে বারবার তিনি আমাদের টেবিলে ছুঁটে এসে অনেক গল্প করলেন। ডিনার শেষে মধ্যরাতে যখন বাসায় ফিরছি তখন ছিচকাঁদুনে বৃষ্টি শুরু হয়। এখানে যতোবার এসেছি ততোবারই বৃস্টি আমাকে ভিজিয়েছে। বার্লিনে আমি আসবো আর বৃস্টি আমাকে ভিজিয়ে দিবে না, একি হয়! আমার রাশি মনে হয় বৃস্টির রাশি!

সকালে ফ্রুসটুক মানে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা শহর ঘুরতে বের হই। জসিমভাইয়ের ডে অফ থাকায় আমাকে সময় দিতে পেরেছেন। বিকেলে আমাকে যেতে হবে ডিআইডি’র বার্লিন ক্যাম্পাসে। প্রোগ্রাম শেষ করে পরেরদিন চলে যাব প্যারিস। তাই সময়ক্ষেপন করার কোন সুযোগ নেই। যতোটুকু সম্ভব ঘুরে দেখা শ্রেয়।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল হাইটেক পার্ক দেখার। তাই প্রথমে যাই ক্লিনটেক বিজনেস পার্ক দেখতে উলফনার স্ট্রাসে। এডলোরসফ বিজনেস পার্ক হচ্ছে বার্লিনের সবচেয়ে বড় হাইটেক পার্ক। এখানে গড়ে উঠেছে অনেক বড় বড় হাইটেক ফার্ম, ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি। বর্তমানে বার্লিন পুরো ইউরোপের সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইটি শিল্পের জন্য একটি হাবে পরিনত হয়েছে। প্রচুর পরিমানে স্টার্টআপ কোম্পানি এখানে ব্যাবসা করতে শুরু করেছে। কিছুক্ষন থেকে চলে যাই মিউজিয়াম আইল্যান্ড।

এটি খুবই টুরিস্টিক জায়গা। এখানে দৃষ্টিনন্দন একটি ক্যাথেড্রালসহ কিছু মিউজিয়াম আছে।মিউজিয়াম গুলোর ভেতরে ঘুরে দেখার সুযোগ ছিল না অল্প সময়ের জন্য। এখানে বেড়াতে আসলে আইল্যান্ডের পাশের নদীতে ভ্রমনের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত না। প্রতিটি ভবনের নির্মানশৈলী খুবই অবাক করার মত যা কাছে থেকে না দেখলে অনুধাবন করা যায় না।কয়েক শতবর্ষী ক্যাথেড্রালের সামনে দাঁড়িয়ে অভিভুত হয়েছি তার বাহ্যিক দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য্যের।

আমার কাছে বার্লিন সবসময় একটি আকর্ষণীয় শহর। ইতিহাসের একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল, তবে শহরের পূর্ব ও পশ্চিমের এখনও প্রায় ৩০ বছর ধরে বিদ্যমান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং শারীরিক বিভাজনের লক্ষণ দেখা যায়! দেখার মতো প্রচুর পরিমাণ রয়েছে – গ্রাফিতির প্রাচীরের আচ্ছাদিত অংশ থেকে শুরু করে হিটলারের বাঙ্কার এবং ইহুদিদের নতুন সিনাগগ কেন্দ্র পর্যন্ত। বিলাসবহুল হোটেল এবং গুরমেট রেস্তোঁরাগুলি আড়ম্বরপূর্ণ জৌলুশ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

চলতি পথে চোখে পড়ে হোটেল অ্যাডলন ক্যাম্পিনস্কি।
এই গ্ল্যামারাস হোটেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমা ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর, ১৯৯৭ সালে হোটেলটি পুনঃনির্মানের মধ্য দিয়ে তার পূর্ব গৌরব পুনরুদ্ধার করে। এ হোটেলে চার্লি চ্যাপলিন, হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বো এসেছিলেন।

দুপুরে আমাদের সাথে যোগ দেয় মানিকভাই। আকুলভাইয়ের রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে তিনজনে চলে যাই নোভালিস স্ট্রাসে। বেলা তিনটায় ছিল আমার এপয়েন্টমেন্ট। মানিকভাইয়ের গাড়িতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই পৌঁছে যাই ডিআইডি ক্যাম্পাসে। ডিআইডির স্কুল ডিরেক্টর মার্শেল কিয়ামিচ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। আনুষ্ঠানিক আলোচনার শুরুর আগে ঘুরিয়ে দেখান ক্যাম্পাস। পরিচয় করিয়ে দেন বেশ ক’জন বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের সাথে। এরা সবাই জার্মানী পড়তে এসেছেন ঢাকার এসএসবিসিএলের মাধ্যমে।

ডিআইডি মুলতঃ এখানে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জার্মানভাষা শেখার স্কুল। প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশী শিক্ষার্থী জার্মানে আসেন উচ্চশিক্ষার জন্য। তাদের অনেকেই ডিআইডিতে আসেন ভাষা শিখতে। ডিআইডির মার্শেল জানায়,বাংলাদেশে তাদের কাউন্টারপার্ট এসএসবিসিএল। তাদের মাধ্যমেই এসব শিক্ষার্থী এখানে ভাষা শেখার রেজিষ্ট্রেশন করে থাকেন।
মার্শেল ও অন্যান্যদের সাথে প্রায় দেড়ঘন্টার আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রথমদিনের অফিসিয়াল মিটিং শেষ হয়। পরেরদিন সকালে মার্শেলের ইন্টারভিউ নিয়ে আমাকে ফিরতে হবে প্যারিস।
ডিআইডির ক্যাম্পাস থেকে যখন বের হই তখন সুর্য পশ্চিমাকাশে ডুবি ডুবি করছে। সারাদিনের ছোটাছুটিতে শরীর ক্লান্ত। তাই মানিকভাইয়ের দেয়া রাতের ডিনার ক্যান্সেল করতে হয়।