২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফের স্বরূপে মিয়ানমার, রোহিঙ্গাদের স্বস্তির জীবনের সন্ধানে বাংলাদেশ

আপডেট : সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০ ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

32

আব্দুর রহমান

করোনা পৃথিবীতে অনেক ‘নতুন’ কিছুর সঙ্গে পরিচিত করেছে আমাদের। আবার অনেক পুরনো বিষয়কে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। মানুষের জীবন বাঁচানোটাই যখন সারা বিশ্বের প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীর নানাপ্রান্তের অনেক সমস্যাই আর তখন ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখার কথা ভাবা যায়নি। এমনই একটি ‘সংকট’ হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট। অথচ এ বছরের শুরুটা দারুণভাবে শুরু হয়েছিল এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তোলপাড় তোলা এক রায়ের মধ্য দিয়ে।
এ বছরের ২৩ জানুয়ারি রোহিঙ্গা গণহত্যার ব্যাপারে বহুল আলোচিত একটি অন্তর্বর্তী রায় দেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে। আইসিজের ১৭ জন বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে এ রায়টি দেন। আদালত যে অন্তর্বর্তী আদেশ দেয় সেগুলো হচ্ছে- ১. গণহত্যাসহ সব নিপীড়ন থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া; ২. রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক, আধাসামরিক অথবা এ জাতীয় থেকে সংস্থা এমন কোনো ব্যবস্থা বা কাজ করবে না যাতে মিয়ানমারের পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে; ৩. গণহত্যার কোনো আলামত নষ্ট না করা; ৪. মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রতি চার মাস অন্তর অন্তর আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে পেশ করতে হবে।

আদালতের এ রায় রোহিঙ্গাদের পক্ষে গিয়েছিল যা বাংলাদেশের জন্য ছিল খুবই স্বস্তিকর একটি খবর। নভেম্বরে এ মামলাটি করেছিল গাম্বিয়া। মামলাটি দায়েরের পর অনেকেই মনে করেছিলেন এটি আসলে এমন কিছু না, কোন সুদূরের দেশ গাম্বিয়া মামলা করেছে তাতে আর কী হবে! কিন্তু মিয়ানমার এ মামলাটিকে নিয়ে নামলো সর্বাত্মক এক যুদ্ধে। তারা প্রথমে গাম্বিয়ার মামলা করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু সে আপত্তি টেকেনি। কারণ, গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুই দেশেই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ।
মিয়ানমার এ মামলাটিকে কত গুরুত্ব দিয়েছিল তা বোঝা যায় এ মামলার শুনানিতে দেশটির পক্ষে শুনানি করেন মিয়ানমারের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় যাকে সেই অং সান সু চি। ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর দ্য হেগে অনুষ্ঠিত শুনানিতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি নিজে মিয়ানমারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন।
এ রায়টি অন্তর্বর্তী আদেশ। মূল মামলা নিষ্পত্তি হতে আরও সময় লাগবে। অং সান সু চির নেতৃত্বে শক্তিশালী দল মামলা পরিচালনা করলেও রায়ের পর তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে, মিয়ানমারের দাবি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) আদেশ একপেশে। এতে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির বিকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মিয়ানমার যাই বলুক না কেন এ রায়টি তাদেরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে অপরাধি হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। মিয়ানমারের সামনে সুযোগ ছিল নিজেদের জাত্যভিমানের জন্য যে সমস্যার সমাধান তারা করতে চায়নি, আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে নিয়ে তা করার সুযোগটি গ্রহণ করার। কিন্তু তারা তা করেনি।

ডিসেম্বরে চীনে যে করোনা দেখা দেয়, তা ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ব্রিটেন, কানাডা, ইরান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়লো করোনা থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে বের করতে বলা যায় সবার নীতিই হয়ে উঠলো ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’। তবে নয় মাসের মাথায় বিশ্বব্যবস্থা আবার নিজ বলয়ে ঘুরতে শুরু করেছে, আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিশ্ব নেতারা। এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য একটা বড় সুখবর নিয়ে এলো কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।
সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানোর দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়েরকৃত মামলায় সহায়তা করার ঘোষণা দিয়েছে দেশ দু’টি। ২ সেপ্টেম্বর কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাসোঁয়া ফিলিপে শ্যাম্পে এবং নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফ ব্লক এক যৌথ বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের গণহত্যাকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে গাম্বিয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছে। এই কাজে সহায়তা করা দায়িত্ব মনে করে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।

গাম্বিয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘের আদালতে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করতে বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী অমল ক্লুনিকে নিয়োগ দিয়েছে মালদ্বীপ। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে রোহিঙ্গা সংকটের সাম্প্রতিক পর্ব শুরুর পর থেকেই এ ইস্যুতে সোচ্চার মালদ্বীপ। বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা প্রবেশ শুরুর পর প্রতিবাদ হিসেবে মিয়ানমারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে মালদ্বীপ। কানাডা, নেদারল্যান্ডস আর মালদ্বীপের এই তৎপরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশকে আরও শক্ত মাটিতে দাঁড় করাবে।
তবে বাংলাদেশের জন্য হতাশার দিক হচ্ছে ফের মিয়ানমার হাটছে তার পথেই। করোনাকালেও তারা নতুন করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সন্ত্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টি করছে। রাখাইনের কিউকতাও এলাকার একটি গ্রাম গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে স্থানীয় দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর ট্রাকগুলো পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং গ্রামবাসীকে ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়। এরপর সেনারা স্থানীয়দের ঘরের মালামাল লুট করে এবং বাড়িগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। গ্রামের প্রায় ৪০০ ঘরের মধ্যে ২০০টিরও বেশি আগুনে পুড়ে গেছে। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন। সেনারা বলেছিল, কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে তাকে গুলি করা হবে।

যাইহাক, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ সংকট সমাধানে বাংলাদেশ চেষ্টার সর্বোচ্চাই করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি তাদের স্বস্তির জীবন দেয়ার কাজও করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি ভাসানচরের আবাসন প্রকল্প পরিদর্শনে গেছেন ৪০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পের ৪০ জন রোহিঙ্গা নেতাকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিনিধি দল ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন। পরিদর্শন শেষে ৮ সেপ্টেম্বর তারা ফিরে আসবেন ক্যাম্পে। ক্যাম্পে ফিরে তারা রোহিঙ্গাদের কাছে সেখানকার অবস্থা বর্ণনা করবেন। প্রতিনিধি দলের কাছে ভাসানচরের পরিস্থিতি জেনে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে আগ্রহী হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ সরকার।
কক্সবাজারের ৩৪টি ক্যাম্পে থাকা ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা ভাসানচর দ্বীপে অস্থায়ীভাবে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে সরকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করেছে। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে সাইক্লোন সেন্টার, প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও চিকিৎসা অবকাঠামো।
মিয়ানমার যেখানে আগুন লাগিয়ে সংকটকে আরও ঘণীভূত করতে চায় সেখানে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে মিয়ানমারের তাড়িয়ে দেয়া নাগরিকদের সুন্দর জীবন উপহার দিতে। এমন বিপরীত চরিত্রের দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা করাই কঠিন সেখানে সমস্যার সমাধান করা আরও কঠিন তা বলা যায় নি:সন্দেহে।

লেখক: সাংবাদিক