৭ই আগস্ট, ২০২০ ইং | ২৩শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রবাসবন্ধু কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু

আপডেট : জুলাই ৪, ২০২০ ২:৩১ অপরাহ্ণ

284

ফ্রান্স শুধু নয়, গোটা ইউরোপজুড়ে প্রবাসীদের সুখ দুঃখের সাথী, শুভাকাংখি কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু।
এ মুহুর্তে তিনি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা দেড়কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতমুখ।

২০১৩ সালে ঢাকায় চেঞ্জ মেকার্সের প্রেসিডেন্ট এডভোকেট তানবীর সিদ্দিকীর মাধ্যমে কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু ভাইয়ের সাথে পরিচয়। একুশে টেলিভিশনের ক্যান্টিনে চা-পান করার সময় বলেছিলেন, এবার প্যারিস গেলে তাঁর ওখানে যেন উঠি। ঘন্টাখানের পরিচয় ও আলাপচারিতায় জেনে যাই, ইনুভাই অনেক বড়মাপের ব্যবসায়ী ও বিশাল হ্রদয়ের অধিকারী। ব্যবসায়ী পরিচয়ের বাহিরে তিনি সামাজিক,সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত। ফ্রান্সে বসবাসরত যে কোন বাংলাদেশীর দুঃসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।প্যারিসে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মানের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্স সরকারের সাথে
আলোচনা করেছেন। প্রবাসীদের বিশ্বাস, তাঁর উদ্যোগ ও তৎপরতায় এই দাবী দু’টোই অচিরেই আলোর মুখ দেখবে।

২০১৩ সালের জুলাই মাসে শিলার ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রনে এক সাপ্তাহের জন্য জার্মানীর বনে যাই। তিনদিনের ভিজিট শেষে প্ল্যান করে ফেলি বাকী চারদিন প্যারিসে কাটিয়ে দেশে ফিরবো। প্যারিসে ইনুভাইকে ফোন করার সাথে সাথে বললেন, চলে আসেন। প্যারিসে সব দায়িত্ব আমার।

কোলন এয়ারপোর্ট থেকে প্যারিসের অর্লি এয়ারপোর্টে যেতে আড়াইঘন্টার ফ্লাইট। সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টায় অর্লি এয়ারপোর্টে নেমেই দেখা পেলাম চ্যানেল এস এবং একাত্তর টিভির ইউরোপ প্রতিনিধি নূরুল ওয়াহিদের।ইনুভাই পাঠিয়েছেন আমাকে প্লাস দ্যু ক্লিসি নিয়ে যেতে। সেখানে ইনুভাইয়ের রেস্টুরেন্ট ক্যাফে লুনা। প্যারিসের অন্যতম ব্যয়বহুল স্থানে ইউরোপের বাংলাদেশী ধনকুবের কাজী এনায়েত উল্লাহ ইনুর অনেকগুলো রেস্টুরেন্টের একটি হচ্ছে ক্যাফে লুনা।
ক্যাফে লুনায় টেরাসে দেখা হয়ে যায় ইনুভাইয়ের সাথে।উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে ক্যাফের ভিতরে নিয়ে যান। প্রায় ঘন্টাখানেক আড্ডা ও রাতের ডিনার সেরে ঠিকমতন বসতে পারছিলাম না। সারাদিনের ক্লান্তিতে তখন শরীর ভেঙ্গে আসছে। ইনুভাই আমার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে বলেন, রুমে গিয়ে রেস্ট নেন। আগামীকাল সারাদিন দেখা হবে না। রাতে একসাথে ডিনার করবো।ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এখানে করবেন। যখন যা প্রয়োজন নুরুলভাইকে বললেই হবে।

আড্ডায় ইনুভাই যখন আমাকে বারবার আপনি সম্বোধনে কথা বলছিলেন, সত্যি তখন অস্বস্তি ও সংকোচ লাগছিল। একবার বলেছিলাম, আমাকে তুমি করে সম্বোধন করলে খুশী হবো । কিন্তু আমি শুধু না বয়সে ছোটবড় সবাইকে তিনি আপনি সম্বোধন করেন। সবাইকে তিনি সম্মান দিয়ে কথা বলেন, যা তার উদার্য্য ও মহত্ব প্রকাশ করে।

নুরুল ওয়াহিদ আমাকে নিয়ে আসেন হোটেলে। ক্যাফে লুনার ঠিক বিপরীতে হোটেলের অবস্থান। পুরানো বিল্ডিংয়ের ছিমছাম ছোট্ট হোটেল। এই হোটেলের চারতলায় ইনুভাইয়ের আরো দু’জন অথিতি আছেন সঙ্গীতশিল্পী বাদশাহ বুলবুল ও আব্দুল মান্নান। দু’জনে এসেছেন বাংলারমেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে গান গাইতে।

হোটেলের দোতলায় আমার রুম।ল্যাগেজ রেখে চারতলায় বাদশাহ বুলবুলের সাথে দেখা করি।হঠাৎ আমাকে এখানে দেখে বুলবুলভাই অবাক। এ কথা সেইকথা, আড্ডা ও পানাহারে তাঁর সাথে ঘন্টা দুয়েক কেটে যায়।

পরের দিন বেলা করে ঘুম ভাঙ্গলো। ক্যাফে লুনায় ব্রেকফাস্ট করতে গিয়ে পেয়ে গেলাম সদরুল ভাইকে। আশির দশকে বাংলাদেশ বিমান দলের হয়ে ক্রিকেট খেলতেন ইকবাল আহমেদ বাচ্চু,জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ, ওমর খালিদ রুমি, আজহারুল ইসলাম, অলোক রায়, ফয়সাল, বড় জাহাঙ্গীর, সামিউর রহমান সামীভাইদের সাথে। অনেকদিন পর সদরুলভাইকে পেয়ে ক্রিকেটের নানান গল্প হলো। বিমান থেকে অবসর নেয়ার পর প্যারিসে স্বপরিবারে থিতু হয়েছেন।

এ যাত্রায় প্যারিস আমার দুইরাতের বেশী থাকা সম্ভব হয়নি।নির্ধারিত সময়ের আগেজরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরতে হয়েছিল। তবে এই দুইদিন ইনুভাইয়ের আথিয়েতা ছিল অসাধারন। নিজের ব্যস্ততার কারনে তিনি প্রতিটি মুহুর্ত খবর নিয়েছেন। রাতে ডিনার করতে করতে কত আড্ডা, গল্প হয়েছে, তা লিখে শেষ করা যাবে না।

এরপর প্যারিসে যতবার যাওয়া হয়েছে ক্যাফে লুনায় একবার শুধু ঢুঁ মারা নয়, আরো বেশ ক’বার ইনুভাইয়ের গেস্টহাউজে থেকেছি। প্রতিবারই দেখেছি বাংলাদেশ থেকে নামীদামি যতো ভিআইপি প্যারিস এসেছেন তাদের একবার হলেও ক্যাফে লুনায় ঢুঁ মেরেছেন। ইনুভাই আন্তরিকতার সাথে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, আথিয়েতা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ, দেশের মানুষ ও প্রবাসী বাঙালিদের কল্যাণে সবসময় কিছু না কিছু কাজ নিরবেই করে যাচ্ছেন। আমার সৌভাগ্য তাঁর মতন একজন বিরাট কর্মবীরের সংস্পর্শে আসতে পেরেছি।

প্রতিনিয়ত তাঁর চিন্তা ও ভাবনায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা আরো সচল ও শক্ত ভিতের ওপর কিভাবে দাঁড় করানো যায়। দেশের গার্মেন্টস সেক্টরকে পশ্চিমা বিশ্বে আরো বেশী এক্সপোজার দেয়ার জন্য একারনে তিনি বাংলাদেশ বিজনেস কনসাল্টিং (বিবিসি) নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তাঁর স্বপ্ন ইউরোপীয় নিত্য নতুন ফ্যাশনকে ধারণ করে আধুনিক প্রযুক্তি আর পোশাকের নিজস্ব মডেলিং,মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিংয়ের সমন্বয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের পোশাককে তুলে ধরা।

একদিন আড্ডায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাত ছুঁয়ে বিশ্বব্যাপী এতো পোশাক যাচ্ছে। অথচ আমাদের কোনো নাম নেই। বাংলাদেশের তৈরি গার্মেন্টসকে ব্র‍্যান্ডিং করা খুব জরুরী।

কাজ পাগল, পরিশ্রমী ও সুদুরপ্রসারি চিন্তার এই মানুষটি ফ্রান্সে বাংলাদেশীদের গর্ব। কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু ফ্রান্স-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের প্রেসিডেন্ট, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি এবং ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
ইনুভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে সমষ্টির মঙ্গলচিন্তায় তিনি নিজেকে নিমজ্জ৷ত রেখেছেন। তাঁর উজ্জল উপস্থিতি প্রবাসী বাঙালিদের উজ্জীবিত করে, নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি করে। মেধা, দৃঢ়তা ও পরিশ্রমের গুণে তিনি শক্ত ভিত রচনা করেছেন

বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক এই প্রত্যয়দীপ্ত মানুষটি সবসময় বাংলাদেশ ও প্রবাসীদের মঙ্গল কামনা করেন।

প্যারিসে ইনুভাইয়ের সাথে অনেক স্মৃতি। সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখতে গেলে ঢাউস সাইজের একটি বই লেখা হয়ে যাবে। ব্যবসায়ী, সংগঠক সব পরিচয় ছাপিয়ে কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু অনেক বড় হ্রদয়ের মানুষ। যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, তারা এ বিষয়ে ভাল বলবেন। একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। আমি তখন পোল্যান্ডের ক্রাকোভ। কোর্স সেমিস্টার ফি’র ঝামেলায় পড়ে ইনুভাইকে ছোট টেক্সট করি। ব্যাডলি নীড হেল্প। মুহুর্তের মধ্যে রিপ্লাই এলো, হোয়াট টাইপ অফ হেল্প ইউ ওয়ান্ট। লেট মি নো রনিভাই।
এই হচ্ছে ইনুভাই। কে পরিচিত, কে অপরিচিত এ সম্পর্কটি তাঁর কাছে গুরুত্ববহন করে না। সবাই তাঁর কাছে সমান। তিনি সবসময়ে চেয়েছেন মানুষের কল্যানে, সুখে দুঃখে তাদের পাশে থাকতে। এর বড় প্রমান, করোনায় বাংলাদেশে আটকেপড়া ফ্রান্স প্রবাসীদের প্যারিসে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।

কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু প্রবাসে বাংলাদেশীদের শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু ও আপনজন।