৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্যারিসে কথা’র আবৃত্তি সন্ধ্যায়

আপডেট : জুলাই ২৩, ২০২০ ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

7

প্যারিসে যতোবারই গেছি ততোবারই কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানান অনুষ্ঠানে যেতাম। স্রেফ বাংলাদেশী সংস্কৃতি, মানুষের সংস্পর্শে থাকার জন্য। মনখুলে আড্ডা দেয়ার জন্য কোন উৎসব বা অনুষ্ঠান বাদ দিতাম না।
প্রথমবার প্যারিসে নেমে যাকে খুঁজে বের করেছি তিনি শওকত হোসেন হাওলাদার। আমাদের প্রিয় শওকতভাই। যার হাত ধরে আমার প্যারিসের অলিগলি চেনা। খ্যাতিমান আলোকচিত্রশিল্পী, প্যারিসে মোটামুটি সবাই তাকে একনামে চেনেন, জানেন। অসম্ভব পরোপকারী, সদাহাস্যজ্বল মানুষ।সারাজীবন তিনি নিজের খেয়ে পরের মোষ তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন।

শওকতভাইয়ের সাথে ঢাকার রাজপথে স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের অনেক স্মৃতি। আমরা দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম। আমাদের হাজারো স্মৃতি, সেইসব লিখতে গেলে নতুন করে একটা মহাভারত লিখতে হবে।

শওকতভাইয়ের মাধ্যমে প্যারিসে খুঁজে পেয়েছি আমার বাল্যবন্ধু আতিককে। আতিক রাশিয়া, লিথুনিয়া ও ফ্রান্সে কাটিয়ে দিয়েছে ত্রিশটি বছর। প্রায় একযুগেরও বেশী সময়ের পর তার সাথে লা প্লানে আমার দেখা হয়েছে।এখানে একদিন কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে যায় আরেক বাল্যবন্ধু একরামের সাথে। লন্ডন হয়ে প্যারিসে একরামেরও একযুগ হয়ে গেছে। মুলতঃ ইন্টারমিডিয়েটের পর একরামের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার শুরু হয়েছিল। তার সাথে পুনঃযোগাযোগ স্থাপিত হয় আতিকের মাধ্যমে। শওকতভাই একদিন টেলিগ্রাফে নিয়ে যান নারায়ণগঞ্জের মোয়াজ্জেম হোসেন নয়নভাইয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। কি অদ্ভুত কান্ড আমার এতো প্রিয় একজন মানুষ প্যারিস আছেন, জানতামই না!
লন্ডন, তুলুজ হয়ে প্যারিসে থিতু হয়েছে রাজপথে আমার সহযোদ্ধা কমরেড রাকিবুল ইসলাম। রাকিবকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে জার্মানীর বার্লিনে বসবাসরত আমার আরেক কমরেড নজরুল রাসেল। এরপর থেকে প্যারিস যাওয়া মানে অবধারিতভাবে রাকিবের সাথে দেখা সাক্ষাত করতে হয়। রাকিবের মাধ্যমে আমাদের চারন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বাসদের নিলয় সুত্রধর, মামুন ভাইসহ অনেক কমরেডদের সাথে পুনঃযোগাযোগ স্থাপিত হয়।

২০১৩ সালে প্যারিসে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মানের অনুষ্ঠানে পররাস্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি আসবেন শুনে শওকতভাইয়ের সাথে গিয়েছিলাম। সেখানে দীর্ঘদিন পর খুঁজে পেয়েছিলাম বেশ কিছু পরিচিত মুখ। যাদের সাথে দেশে প্রতিনিয়ত দেখা হত। তাদের কারো কারো সাথে দশ কিংবা আট/নয় বছর দেখা হয়নি।

২০১৬ সালে ইউনেস্কোতে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষার অনুষ্ঠান কাভার করতে গিয়ে দেখা হয়েছিল বিশ্বখ্যাত মাইমশিল্পী পার্থ প্রতীম মজুমদারের সাথে। তার সাথেও দেখা দীর্ঘ পাঁচ বছর পর।

একই বছর প্লাস দ্যু ক্লিসির ক্যাফে লুনায় টোকাইখ্যাত রফিকুননবী রনবীসহ বেশ ক’জন চিত্রশিল্পীর দেখা,দীর্ঘ আড্ডা ও ইনুভাইয়ের দেয়া ডিনার ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। ক্যাফে লুনায় পেয়েছি একসময়ের তারকা ক্রিকেটার সদরুলভাইকে। কোন এক সকালে সদরুল ভাইয়ের সাথে আমার প্রায় তিনঘন্টার একটি আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়েছিল। এ প্রজন্মের অনেকেই তাকে চিনবেন না। আশির দশকে বাংলাদেশ বিমানের হয়ে দীর্ঘদিন তিনি দাপটের সাথে ক্রিকেট খেলেছেন। রিটায়ার করার পর এখন প্যারিসে স্থায়ী নিবাস গেড়েছেন।

বাঙালীপাড়া হিসেবে খ্যাত গার্দুর্নদের ক্যাফে রয়েলের আড্ডায় নিয়মিত যাওয়া হত। এই আড্ডায় একদিন আবিস্কার করি পুঁথিশিল্পী কাব্য কামরুলকে। আহা কতদিন পর তার সাথে দেখা! ঢাকায় আমাদের অনেক স্মৃতি। প্যারিসে তাকে পেয়ে কিছু সময় আনন্দে
কেটেছে।

প্যারিসে কাজের ফাঁকে মাঝেমাঝে সাংবাদিক আবু তাহিরভাইয়ের সাথে এখানে সেখানে যেতাম। তার আমন্ত্রনে একবার যেতে হয়েছিল প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাবের আয়োজিত মতবিনিময়সভায়। সরকারী খরচে প্রবাসীদের লাশ দেশে পাঠানো নিয়ে বক্তৃতাও করতে হয়েছিল।

আসলে প্যারিসে আমার এতো ঘনঘন যাবার পিছনে অন্যতম কারন এসব প্রিয়মানুষগুলোর সানিধ্য পাওয়ার লোভ কাজ করেছে।
২০১৭ সালের জুলাইতে বাচিকশিল্পী রবিশংকর মৈত্রীর আমন্ত্রনে গিয়েছিলাম গার্দুনর্দে ‘কথা’র আয়োজনে অাবৃত্তি সন্ধ্যায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতন আড়াইঘন্টা শুনেছি দুই বাংলার জনপ্রিয় আবৃত্তিকার ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবৃত্তি। তার কন্ঠে কি যে জাদু, সেই আবৃত্তি না শুনলে ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ।!

ব্রততীদি’র সাথে আরো আবৃত্তি করেন শ্রীমন্ত্র সেনগুপ্ত, রঞ্জনা সেনগুপ্ত, রবিশঙ্কর মৈত্রী ও শ্রাবন্তী বসু, সুমন্ত্র সেনগুপ্ত, রঞ্জনা সেনগুপ্ত, রবিশঙ্কর মৈত্রী ও শ্রাবন্তী বসু। সবার আবৃত্তি ও কথপোকথন শুনেছি তন্ময় হয়ে।

চমৎকার ছিল সন্ধ্যাটি। যা আমার দীর্ঘদিন মনে থাকবে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *