৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং | ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্যারিসের আর্ট মিউজিয়াম ও শহীদবেদীতে সারাবেলা

আপডেট : জুলাই ১৪, ২০২০ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

290

দুইহাজার সতেরো সালের বারো জুলাই।বার্লিন হতে প্যারিসে এসেছে আমার ছোটভাই সজীব। মামাতো বোন ডা. ফারহানার কাছে ওর আসার কথা শুনে আমি দুইদিন আগেই বেলজিয়াম হতে চলে এসেছিলাম। অনেকদিন পর তিন ভাই বোনের দেখা হলো প্যারিসে। দুইভাইকে পেয়ে বোনের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সকাল দুপুর রাতে আমরা দুইভাই কি খাবো, আমাদের কি কি পছন্দ এই নিয়ে বোনের দারুন ব্যস্ততা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনভাই বোনের তুমুল আড্ডাবাজিও চলে। একটু পর পর কিচেন হতে আসতে থাকে কত কি খাবার।

আমার কাজিন সজীব বার্লিনে বসবাস করছে প্রায় চার বছর। পড়াশুনোর পাশাপাশি পার্ট টাইম জব করে।আমি বার্লিনে একবার তার বাসায় উঠেছিলাম। তখন সে তিনদিনের ছুটি নিয়ে আমাকে বার্লিনের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। নিজের হাতে আমার প্রিয় কাচ্চি বিরিয়ানি রেঁধে খাইয়েছে। তিনরাতেই ডিনারের জন্য আমাকে নিয়ে গেছে নামী দামী রেস্টুরেন্টে। আমি বার্লিন থেকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ যাবার আগের দিন দুপুরে সজীব ব্র‍্যান্ডের দামী স্যু গিফট করে।

সজীব এবারই প্রথম প্যারিস এসেছে । বড়ভাই হিসেবে দায়িত্ব পড়লো তাকে প্যারিস ঘুরিয়ে দেখানোর।দুইদিনে প্যারিসের অলিগলি, দর্শনীয় স্থান যতোটা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখাই। আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর মিউজিয়াম, থিয়েটার, শঁজেলিস, নটরডেম, গার্দুনর্দ, ফ্রাঁসোয়া মিঁতেরা বিবেলথেক, বাস্তিল মনুমেন্ট, রিপাবলিক স্কয়ার,গার্দুলিস্ট, এনভার্স, লেডি ডায়নার দুর্ঘটনাস্থল, সেইন নদী, ফ্রান্সের বীরযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভ, স্ট্যাড দ্যা ফ্রঁসে, আর্ট মিউজিয়ামসহ কত কত জায়গায় ঘুরেছি। একবিকেলে আমাদের দুইভাইয়ের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম প্রিয় শওকতভাইকে। প্যারিস থেকে সজীবের রোম যাবার সময় আইডির কারনে টিকেটের ঝামেলা হয়েছিল। আমার অনুরোধে শওকতভাই লন্ডন থেকে তাঁর একবন্ধুর মাধ্যমে ইউরোলাইনের টিকেট কেটে প্যারিস থেকে সজীবের রোম যাত্রার সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিলেন।

সজীবকে নিয়ে প্রথমদিন আইফেল টাওয়ার দেখে আমরা গিয়েছিলাম লেডি ডায়নার গাড়ি দুর্ঘটনাস্থল আলমা ট্যানেলে। ডায়নার কথিত স্মৃতিস্তম্ভে কিছু সময় কাটিয়ে দেখতে যাই সেইন নদীরপাড়ে ফ্রান্সের বীরযোদ্ধাদের স্মরনে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ । আইফেল টাওয়ার এবং আলমা ট্যানেলের মাঝামাঝি আলজেরিয়া যুদ্ধে নিহত ফ্রান্সের বীরযোদ্ধাদের স্মরনে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত।

ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ চলে। ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আলজেরিয়ার অভ্যুদয় হয়। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল কোন ইউরোপীয় শক্তি ও তার উপনিবেশের মধ্যে সংঘটিত দীর্ঘতম যুদ্ধ।

সেই সময় যুদ্ধটি ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার উপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রোঁ দ্য লিবেরাসিওঁ নাসিওনাল বা আলজেরীয় জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট শহর ও গ্রামাঞ্চলে এই গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে আগেভাগে ফ্রান্স তাদের শক্তি, সৈন্য সামন্ত নিয়ে আলজেরিয়া ছেড়ে আসে। প্রায় দশ লক্ষাধিক আলজেরিয় নাগরিক যুদ্ধে মারা যান।অন্যদিকে ফ্রান্সেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।হতাহত হয়েছিল কয়েক হাজার ফরাসি সৈনিক। তাদের স্মরনে নির্মিত হয় এই স্মৃতিস্তম্ভটি।

শহীদবেদী থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে রুয়ে লা নটরে- বিটোভেন। এখানে দাঁড়িয়ে আছে প্যারিসের অন্যতম আর্ট মিউজিয়াম। এটা না দেখে কি করে ফিরে যাই? কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বেলা আড়াইটা বাঁজে। বাসায় ফিরতে হবে, আবার মিউজিয়ামটা দেখা দরকার। আমাদের হাতে খুব একটা সময় নেই। বোনের তাড়া তিনটার মধ্যে বাসায় যেন পৌছাই। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম মিনিট দশেকের ভেতর যতটুকু দেখা সম্ভব আর্ট মিউজিয়াম দেখেই ফিরবো।
ন্যাশনাল আর্ট মিউজিয়ামে রয়েছে এশিয়ান শিল্পের সংগ্রহ । ফরাসী ব্যবসায়ী গিম্মি এমিল গিউমেট নিজস্ব সংগ্রহে মিউজিয়ামটি ১৮৭৮ সালে নির্মান করেন।
১৮৮৫ সালে এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হয়ে ওঠে। ১৮১৮ সালে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়।

ফরাসী আধুনিকযুগের শিল্পীদের আঁকা চিত্র, শিল্পকর্ম রাখার জন্যে ল্যুভরে মিউজিয়ামে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না!উনিশ শতকের শুরুতে কিছু শিল্পকর্ম এখানে প্রর্দশনের জন্য নিয়ে আসা হয়। মর্ডান আর্টের মধ্যে যে বিরাট এক ব্যবধানে, ফরাসী শিল্পের ইতিহাসে, ফরাসী ইমপ্রেশনিস্টদের যে এক বিশাল অবদান ছিল, তার জন্যে তো এক বিশেষ জায়গা চাই। তখন ফরাসী ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের সৃষ্টি সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত করার জন্যে প্যারিসের কেন্দ্রে, আর্ট মিউজিয়ামের চেয়ে ভালো জায়গা ছিল না।

সে যাইহোক, প্যারিসের মিউজিয়াম বলতেই ল্যুভরের কথাই মনে হয়, কিন্তু প্যারিসের আনাচে কানাচে কত যে মিউজিয়ামের অস্তিত্ব আছে তা প্যারিসে না গেলে বোঝানো যাবে না। হতে পারে মোনালিসার মত নামী দামী শিল্প ওদের নেই কিন্তু প্র্যত্যেক মিউজিয়াম স্বকীয়তা বজায় রেখে, নিজস্ব গঠনশৈলীতে তারা অনন্য।

নানান সময়ের শিল্পের ইতিহাসসহ এই মিউজিয়ামের গায়ে গায়ে জড়ানো গথিক স্থাপত্যের নমুনা। আফসোস থেকে গেল পুরো মিউজিয়ামটি সময় স্বল্পতার কারনে ঘুরে দেখা হলো না। হয়তো আবার কোন একদিন প্যারিস গেলে দেখা হবে।
আমরা যখন মিউজিয়াম থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হই তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পড়ন্ত বেলার শেষ হলুদ নরম আলো মিউজিয়ামের আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে।সেই আলোয় এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব বোধ, এক আদিমতা, এক স্মৃতিমেদুরতা আমাকে ঘিরে ধরেছে।