৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পোপের দেশ ভ্যাটিকান

আপডেট : নভেম্বর ১৩, ২০২০ ১:১৬ অপরাহ্ণ

87

রোমে ঘুরে ফিরে তিনটি দিন কিভাবে যেন কেটে গেল।টেরই পেলাম না। গতরাত ছিল পবিত্র শবে বরাত।মঞ্জুভাইর স্বাভাবিক ছুটির দিন থাকায় বাসায় তিনি প্রচুর রান্নাবান্না করেছেন। লাঞ্চ ও ডিনারে ছিলো রাজকীয় ব্যাপার স্যাপার। দু’তিন পদের হালুয়া, ফিরনি, মিস্টি, রুটি যেমন করেছেন তেমনি পোলাও, গরুর মাংসের ঝাল কারি,কালাভুনা, চিকেন রোস্ট, টিকিয়া, বড় বড় চিংড়ির দোপেঁয়াজা আর সালাদ। কিচেনে তার ব্যস্ততা, রান্নার বহর দেখে অবাক হয়েছি। এতো কিছু কিভাবে পারেন সামাল দিতে?

পুর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকালে ইতালিয়ান এক রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করে আমরা পাঁচজন ভ্যাটিকান রওয়ানা দেই ‘হোপ অন হোপ অফ’ নামের
বাস চেপে। প্রায় চল্লিশ মিনিটের মধ্যে বাস এসে থামে এঞ্জেলো সেতুর কাছে। সেতুর ওপাড়ে ভ্যাটিকান সিটি।খৃষ্টান ধর্মালম্বীদের কাছে পবিত্র নগরী। এখানে থাকেন তাদের সর্বচ্চো ধর্মীয়নেতা পোপ।

আমরা বাস থেকে নেমে পড়ি। হেঁটে হেঁটে সেতু পার হয়ে ভ্যাটিকান সিটির সীমানায় পা রাখি।প্রচন্ড গরম পড়েছে রোম ও ভ্যাটিকানে। আমাদের দেশের মতন তালপাকা গরম। সামান্য কিছু পথ হেঁটে সবাই ঘেমে নেয়ে গেছে। পর্যটকদের আনাগোনার বাহিরে পুরো পবিত্র নগরী শুনশান, কোন হৈ হুল্লোড় নেই। কি শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। সৌম্য শান্তি বিরাজ করছে। অদ্ভুত ভাল লাগায় মনের ভেতর প্রশান্তি লাগে।

ভ্যাটিকান নিয়ে আমার অনেক কৌতুহল। কেন ভ্যাটিকান সিটি খৃস্টধর্মের অনুসারীদের পবিত্রস্থান, কেন এখান হতে সারাবিশ্বের চার্চ বা গীর্জা নিয়ন্ত্রিত হয় ইত্যাদী জানার আগ্রহ বহুদিনের। গুগল করে জেনে যাই, খৃস্টধর্মের অনুসারীদের পবিত্রস্থান হয়ে উঠার ছোট ইতিহাস। প্রথম শতাব্দীর এক ক্যাথলিক চার্চই ভ্যাটিকানের গোড়াপত্তন করেছিল বলেই ইতিহাসবিদদের ধারণা। কিন্ত আধুনিক ইতিহাস বলছে, ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কন্সট্যান্টাইনের হাত ধরে ভ্যাটিকানের পরিবর্তন শুরু হয়। ক্ষমতা পাওয়ার পরপরই তিনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নেন এবং পুরো ভ্যাটিকানজুড়ে প্যাগান স্থাপনাসমূহ ভেঙে ফেলেন। সম্রাট নিরোর সার্কাসখ্যাত প্রাঙ্গনে সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকা নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এই ব্যাসিলিকার নীচেই আছে পবিত্র সেইন্ট পিটারের সমাধি।

সেতু পার হয়ে একটু এগিয়ে গেলে নগরীর প্রবেশমুখে চোখে পড়ে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা। এটি শুধু ভ্যাটিকানবাসীদের কাছেই নয়, বরং সারাবিশ্বের সব ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কাছে পবিত্রস্থান। যদিও খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের আরো অনেক আগে থেকেই এই জায়গাটিকে পবিত্র মানা হয়। কেননা, এখানে রোমান দেবী সিবেল এবং তার স্বামী আটিসের উপাসনা করা হতো। সে যা-ই হোক, এই প্রাচীরঘেরা লিওনাইন শহর মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁর সময়কালে আধ্যাত্মিকতার প্রধান প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পোপ এই ব্যাসিলিকার সংরক্ষণ এবং সংস্কার করেছিলেন।সম্রাট কন্সট্যান্টাইন নির্মিত এই ব্যাসিলিকা তখন থেকে এখন পর্যন্ত ভ্যাটিকানসহ পুরো বিশ্বের ক্যাথলিক খ্রিস্টানধর্মী মানুষদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকা নির্মাণের মধ্য দিয়েই মূলত ভ্যাটিকান ও এর আশেপাশে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায় এবং এ অঞ্চল ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপদের হাতে ক্ষমতা চলে যায়।

মজার তথ্য হচ্ছে, নগরীর ভিতর আরেক দেশ। ইতালির রোম শহরের ভেতরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি। আয়তন মাত্র ৪৪ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা একহাজারের চেয়েও কম। ক্ষুদ্র হলেও পৃথিবীজুড়ে দেশটির নাম-ধাম ও ক্ষমতা অনেক পরাশক্তির চেয়েও বেশী। খৃস্টধর্মের প্রধান, সর্বচ্চো ক্ষমতার অধিকারী পোপ হচ্ছেন রাষ্ট্রনেতা। পৃথিবীর এই একটিমাত্র দেশ যেখানে যেতে কোন ভিসা, ইমিগ্রেশনের প্রয়োজন পড়ে না। এদেশে সারাবছরই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে ।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই পোপ যেখানে থাকেন অ্যাপোস্টলিক প্যালেসের সামনে। এর পাশে রয়েছে পাপাল প্রাসাদ। বিশাল পাথুরে চত্বরে দাঁড়িয়ে ক্ষানিকখন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি প্যালেসের দিকে। রোমান স্থাপত্যের অপূর্ব নির্দশন এই পাপাল প্যালেস। বড় বড় থামের পাশে খোলা জানালায় উঁকি মেরে ভেতরটা দেখা যায়। পুরো প্রাসাদটির মেঝে, দেয়াল মার্বেল পাথর,নীল সাদা কাঁচের নকশাঁয় দেব দেবীর চিত্র আঁকা ।

মধ্যযুগের একটা অন্ধকার সময়ে চার্চের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছিল। এই সংক্রান্ত আরো নানান কারণে পাপাল প্রাসাদ তখন ফ্রান্সের এভিগগনে সরে যায়। তাই রোমের সমস্ত কার্যক্রম প্রায় এক শতাব্দীর মতো বন্ধ ছিল। সময়টা ছিল ১৩০৭ থেকে ১৩৭৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যকার। পরবর্তীতে পোপ পঞ্চম নিকোলাস ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে অ্যাপোস্টলিক প্যালেসের কাজ শুরু করেন। এই প্রাসাদই পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকার হিসেবে আসা পোপদের স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে এখন অবধি পরিগণিত হয়ে আসছে। পোপ নিকোলাসের সংগ্রহে থাকা বইগুলো নিয়ে ভ্যাটিকান লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়।

১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে রেনেসাঁর মহাজাগরণের সময় পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস বিখ্যাত আর অমর শিল্পী মাইকেলেঞ্জোকে সিস্টিন চ্যাপেলসহ সমগ্র ভ্যাটিকানকে আধুনিকায়নের দায়িত্ব দেন। একইসাথে ১২০০ বছরের পুরাতন আর জরাজীর্ণ সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকাকে ভেঙে একই আদলে এবং নকশাঁয় কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হয় দোনাতে ব্রামান্তেকে। পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস মারা গেলে ব্রামান্তেকে এই কাজে সাহায্য করেন স্বয়ং মাইকেলেঞ্জোলো।

ভ্যাটিকানে আমার দেখার আকর্ষন বিখ্যাত ট্রেডমার্ক গোলাকার গম্বুজ। ১৫৯০ সালে গিয়াকার্মো দেল পোত্রের হাতে নির্মানকাজ শুরু হয়েছিল। তা শেষ হয় ১৬২৬ সালে। এই চার্চেই প্রতিদিন নিয়ম করে প্রার্থনা হয়। স্বয়ং পোপ প্রার্থনা পরিচালনা করেন। সকালের প্রার্থনা আমরা একটুর জন্য মিস করেছি। প্রার্থনা শেষে পোপ যখন ঝুলন্ত বারান্দায় এসে সেইন্ট পিটার্স স্কয়ারে সমবেত হাজার হাজার অনুসারীদের দেখা দেন। তখন পোপকে এক পলক দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। মাথায় ছোট সাদাটুপি আর পা অবধি সাদা সফেদ আলখাল্লা পড়নে শান্ত সৌম্য পোপ গলায় ঝোলানো যীশুখৃস্টের ক্রুশ বুকের ডান বামে ছুঁয়ে ভক্তদের শুভাশিস জানান।
সেই এক অপুর্ব দৃশ্য।

পোপের প্রাসাদের পাশেই রয়েছে ভ্যাটিকান যাদুঘর।গ্যালারিগুলো জনসাধারণের জন্য একদমই উন্মুক্ত।
জনশ্রুতি আছে পোপের গির্জার গোপন কুঠুরিতে আছে হাজার বছরের পুরোনো ইলেকট্রোমেগনেটিক রেডিয়েশন যন্ত্র বা টাইম ভিউয়ার। যা দিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখে থাকেন ফাদাররা। আবার কারো মতে এ গোপন কুঠুরিতে ৮৪,০০০ দলিল ও বইপত্র আছে। আছে মূল বাইবেলের কপি ও যিশুর আমলের চিঠিপত্র। এগুলোর মধ্যে গ্রিসের পতন থেকে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সব তথ্য নাকি সংরক্ষিত আছে। তাই এগুলো দেখার কারো অনুমতি নেই। পোপই এসবকিছুর একমাত্র রক্ষক।

ছোট বা ক্ষুদ্র দেশের তকমা থাকলেও ভ্যাটিকান সিটিকে সমৃদ্ধ একটি দেশ বলা যায়। কেননা, ভ্যাটিকান সিটির আছে নিজস্ব সংবিধান, সীলমোহর, পতাকা, রাষ্ট্রীয় প্রতীক, ডাকব্যবস্থা, টেলিফোন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রেডিও এবং নিজস্ব সংবাদপত্র ও অনলাইন ওয়েবসাইট। ইউরোর পাশাপাশি নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থাও আছে। অবশ্য ভ্যাটিকানের মুদ্রায় তাদের পোপের ছবি খোদাই করা থাকে। এছাড়াও আছে একটি মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র।

পোপ এবং দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য আছে সুইস গার্ড বা পটেনশিয়াল সুইস আর্মি নামে খ্যাত একদল সেনাবাহিনী। ৫ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চি লম্বা এবং ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী ক্যাথলিকরাই কেবল এই পদে যোগদান করতে পারেন। তবে এদের জন্য সবচেয়ে কঠোর নিয়মটা হচ্ছে তাদের বিয়ে করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিগত ৫০০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে এই সেনাবাহিনী পোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে। এখানেই আছে পৃথিবীর সবচাইতে ক্ষুদ্র রেলওয়ে ব্যবস্থা, যার নাম সিটা ডেল ভ্যাটিকানোই। মাত্র ৩০০ মিটারের এই রেলওয়েটি কেবল মালামাল পরিবহনের কাজেই ব্যবহৃত হয়।

মঞ্জুভাই আমাদের একটা অবাক করা তথ্য জানায়, দেখেন এখানে যারা এসেছেন সবাই প্যান্ট শার্ট,গেঞ্জি, লং স্কার্ট পরিহিত। হাফ প্যান্ট বা শর্ট স্কার্ট পরিধান করা কাউকে পবিত্র নগরীতে ঢুকতে দেয়া হয় না। ‘
আসলেই তো। ভ্যাটিকান দুইঘন্টার অবস্থানে ছোট পোষাকে কাউকে দেখিনি।

সিস্টিন চ্যাপেল, সেইন্ট পিটার্স স্কয়ার, সেইন্ট পিটার ব্যাসিলিকা এবং ভ্যাটিকান মিউজিয়াম ঘুরে আমরা সবাই ক্লান্ত। আমি মিউজিয়ামের কাছে পাথরের ওপর বসে পড়ি। আমার দেখাদেখি অন্যরাও। অনেক পর্যটককে দেখি ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত। তাদের কেউ কেউ দেয়ালে লাগানো পানির কল থেকে অজলাভরে পানি পান করেন। আমাদের কেউ একজন খালি বোতলে পানি ভরে নিয়ে আসে। আমি সেখান হতে পানি খেয়ে প্রান জুড়াই।আহা কি ঠান্ডা শীতল!

সিস্টিন চ্যাপেলে আছে রেনেসাঁ যুগের অমর শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত শিল্পকর্ম দ্য ক্রিয়েশন অফ অ্যাডাম। এছাড়াও পুরো ভ্যাটিকানজুড়েই মাইকেলেঞ্জোলো, রাফায়েল, ভিঞ্চি, বত্তিচেল্লি কিংবা দোনোতেল্লোর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের ফ্রেসকো, ওবেলিস্ক কিংবা ভাষ্কর্য অথবা স্থাপত্যশিল্প চোখে পড়বে।সহস্র বছরের প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের কারুকাজ দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়।

১৩.১১.২০২০
মন্ট্রিয়েল