২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পারিবারিক বৃত্ত ভাঙছে আওয়ামী লীগ!

আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

116

ব্দুর রহমান

পারিবারিক প্রভাব বা পরিবারতন্ত্র বাংলাদেশের রাজনীতির এক চরম বাস্তবতা। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ সর্বত্রই পরিবারতন্ত্রের জয়-জয়কার। স্বামীর/বাবার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার শ্লোগান নিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌঁড়ে শামিল হন মৃত জনপ্রতিনিধির স্ত্রী বা সন্তান। দেশে জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকটি আসনে উপনির্বাচন হয়েছে, আরও কয়েকটি আসনে হবে এ বছরের বিভিন্ন সময়ে, আর এসব আসনের প্রার্থী হয়ে এরইমধ্যে সংসদে গেছেন বেশ কয়েকজন উত্তরাধিকারী, আর মনোনয়নের টিকিট পাওয়ার দৌঁড়ে আছেন বেশ কয়েকজন। তাই এ লেখার মূল উপজীব্য সংসদ নির্বাচনে উত্তরাধিকার।
পারিবারিক বৃত্তের সুবিধা বলয়ে থেকে সংসদ সদস্য হয়ে সংখ্যা কিংবা শোভা বাড়িয়েছেন এমন এমপির সংখ্যা কম নয়। এটা শুধু চলতি সংসদের জন্য নয় বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো সংসদের ক্ষেত্রেই সত্য।
কোন এলাকার একজন সংসদ সদস্য মারা গেলে ওই এলাকার মানুষ ধরে নেয় তার স্ত্রী/সন্তানই মনোনয়ন পাবেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই। দেখা গেছে, প্রয়াত এমপির ছেলের বয়স ২৫ পার হয়েছে, তিনি মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন ২৫ বছর ধরে এলাকায় রাজনীতি করেন এমন অনেক নেতাকে টপকে।
পারিবারিক রাজনীতির প্রভাব বলয় দিন দিন বড় হচ্ছে। পরিবারতন্ত্র কিংবা ব্যক্তিতন্ত্র’র কাছে মার খাচ্ছেন অনেক পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। বাবার সাথে রাজনীতি করেছেন এমন অনেকেই শেষাবধি ‘ভাতিজা’কে নেতা মেনে রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। মৃত নেতার ছেলে/স্ত্রী/মেয়ে/বোন/ভাই এলাকার দায়িত্ব নেন, আর তার নির্বাচনী বৈতরণী পার করে নেয়ার দায়িত্ব নিতে হয় অন্যদের।

রাজনীতির এই সরল হিসাবটা মেনে নিয়েই রাজনীতি করেন স্থানীয় নেতারা। মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম যে হয় না তা নয়, কিন্তু ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই, তবে চলতি সংসদে এই ব্যতিক্রমটা একটু বেশিই চোখে পড়ছে। চলতি সংসদের প্রয়াত সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যরা যেমন সংসদে এসেছেন তেমনি মনোনয়ন চেয়েও পাননি সে সংখ্যাটাও একেবারে কম নয়। তাই অনেকেরই সকৌতুহল প্রশ্ন-রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের যে বৃত্ত তা কি ভাঙতে শুরু করেছে?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা-১০ আসনটি ছেড়ে দেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। তখন ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউই হয়তো এ আসনের প্রার্থী হবেন। সে সময় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম উচ্চারিত হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার তাপসের বড় ভাই যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, তাপসের সহধর্মিণী আফরিন তাপস। ছিল বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির নামও। কিন্তু শেষাবধি এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনকে। তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।

এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম

পারিবারিক প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন গাইবান্ধা-৩ আসনের উম্মে কুলসুম স্মৃতি। কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন গতবার। তার নিজের এলাকার সংসদ সদস্য ইউনুস আলী সরকার মারা গেলে আসনটি শূন্য হয়। জেলার সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক এমপি ইউনুস আলী সরকারের বড় ছেলে ড. ফয়সাল ইউনুসও। কিন্তু এ আসনে মনোনয়ন পান উম্মে কুলসুম স্মৃতি।

শাহিন চাকলাদার ও উম্মে কুলসুম স্মৃতি: পারিবারিক বলয়ের বাইরে গিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন তারা

বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোজাম্মেল হোসেন মারা যাওয়ায় এ আসনে উপ নির্বাচন হয়। এ আসনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ডা. মোজাম্মেল হোসেনের পুত্রবধূ ইসমত আরা শিরিন চৌধুরী, কিন্তু মনোনয়ন পান ও নির্বাচিত হন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন।

যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর এ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তার মেয়ে নওরীন সাদেক এবং ইসমাত আরা সাদেকের স্বামী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের চাচাতো ভাই ওয়াহিদ সাদিক। ওয়াহিদ সাদেক একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানার স্বামী। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তারা দেশে ফিরেছিলেন মনোনয়ন পাওয়ার আশায়, কিন্তু এ আসনে মনোনয়ন পান কেশবপুর উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার। তিনিও নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেছেন।

নূরুজ্জামান বিশ্বাস, কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও আনোয়ার হোসেন হেলাল: রবল পারিবারিক ও উত্তরাধিকারীর বিপক্ষে গিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন তারা

সম্প্রতি দেশে আরও কয়েকটি আসনের উপ নির্বাচনের আয়োজন চলছে। দলগুলো ব্যস্ত প্রার্থী বাছাইয়ে। এরইমধ্যে পাবনা-৪, ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ এর মনোনয়ন দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
পাবনা-৪ এ মনোনয়ন পেয়েছেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস । এ আসনে প্রার্থী হতে রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন এ আসনের প্রয়াত সাংসদ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর স্ত্রী কামরুন নাহার শরীফ, ছেলে গালিবুর রহমান শরীফ, মেয়ে মাহজেবিন শিরিন, জামাতা আবুল কালাম আজাদ, খালাতো ভাই বশির আহম্মেদ এবং ভগ্নিপতি হাবিবুর রহমান। কিন্তু শেষাবধি পারিবারিক বৃত্তের বাইরে থেকেই মনোনয়ন পেয়েছেন নূরুজ্জামান বিশ্বাস।

ঢাকা ৫ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। এ আসনে স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিকের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রয়াত সাংসদ হাবিবুর রহমান মোল্লার বড় ছেলে মশিউর রহমান মোল্লা সজল এবং বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামালের ভাইয়ের মেয়ে মেহরিন মোস্তাফা দিশী।

নওগাঁ-৬ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন রাণীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন হেলাল। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন প্রয়াত সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলমের স্ত্রী পারভীন সুলতানা বিউটি।
সাবেক দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজগঞ্জ-১ আসনের প্রয়াত সাংসদ মোহাম্মদ নাসিম এবং ঢাকা-১৮ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য সাহারা খাতুনের শূণ্য আসনে উপ নির্বাচনের প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করেনি আওয়ামী লীগ। এ দু’ আসনেই প্রার্থী হতে ইচ্ছুক প্রয়াত ওই দুই নেতার পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা।

সাহাদারা মান্নান এমপি হয়েছেন স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরসুরী হিসেবে

সাম্প্রতিক সময়ে উপনির্বাচনে পারিবারিক বা উত্তরাধিকারের সুবিধা নিয়ে নির্বাচন করেছেন এবং জয়ী হয়েছেন বগুড়া-১ আসনের সাহাদারা মান্নান শিল্পী। তিনি এই আসনে সাবেক এমপি আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মান্নানের স্ত্রী।
পারিবারিক রাজনীতি কিংবা রাজনীতিতে পরিবারের সুবিধা নেয়াটা নতুন কিছু নয়, অস্বাভাবিকও নয়, তবে কখনো কখনো তা ত্যাগী রাজনীতিবিদদেরকে পেছনে ঠেলে দেয়। চলতি সংসদে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পারিবারিক উত্তরাধিকার খুব একটা কাজে লাগছে না, আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের জন্য এটা একটা সুসংবাদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। পারিবারিক বৃত্ত ভাঙার চলমান এ ধারা আওয়ামী লীগ কতটা এগিয়ে নিতে পারে আর দলের নেতারা তা কতটা ধারণ করতে ও কাজে লাগাতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক