২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পারলেনা সু চি

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ ২:০৮ অপরাহ্ণ

27

পথহারা পথিকের কথা

১ ফেব্রুয়ারি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তার আগে তারা মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) শীর্ষ নেতাদের আটক করে। আটক করা হয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্টকেও। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সু চির সরকার উৎখাতের পর মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং সব ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সামরিক বাহিনী দেশটিতে এক বছরের জরুরি অবস্থা জারি করে। এরইমধ্যে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে সু চিকে, আর ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উ মিন্টকে।

সু চি ও প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তবে তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। এরই মধ্যে মিয়ানমারে রাজনীতিকদের আটক ও সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সেনা শাসনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তবে যথারীতি মিয়ানমারের পাশে আছে চীন। সেনা শাসনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদ নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি চীনের বিরোধিতায়।

মিয়ানমার আর সেনা শাসন একই সূত্রে গাঁথা। ৬ লাখ ৭৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তন আর ৫ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন শুরু হয়। তা একনাগাড়ে চলে ২০১১ সালে। ওই বছর হঠাৎ করে সামরিক বাহিনীর শুভ বুদ্ধির উদয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে গণতন্ত্রের হাওয়া বইতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে নিষিদ্ধ ও কার্যত: অবরুদ্ধ মিয়ানমার বিশ্ববাসীর অভিনন্দন আর আশির্বাদে সিক্ত হতে থাকে।

১৯৮৯ সালের জুলাই থেকে ইয়াঙ্গুনে তাঁর বাড়িতেই বন্দি অবস্থায় থাকা সু চি মুক্তি পান ২০১০ সালের নভেম্বরে।  তার মুক্তি ছিল কার্যত: মিয়ানমারের অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের মুক্তি। গণতন্ত্রের প্রতি তার আপোষহীন ভূমিকা সারা বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছিল আবার তার মুক্তির বিষয়টিও সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত।

অং সান সু চি কারাগারে থেকে সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হতে থাকেন। অং সান সু চি যত দিন কারাবন্দি ছিলেন দুনিয়ার নানা প্রান্তে উচ্চারিত হয়েছে তার মুক্তির দাবি। তিনি নিজেও ভূষিত হয়েছেন নানা স্বীকৃতিতে, পেয়েছেন সম্মানসূচক নাগরিকত্ব, ডক্টরেট ডিগ্রি আর নোবেল শান্তি পুরষ্কার। ১৯৯০ সালে শান্তির জন্য নোবেল পান সু চি। তাঁর হয়ে তাঁর ছেলেরা সেই পুরস্কার নেন। তিনি সেই পুরস্কারের পুরো অর্থ (১৩ লাখ ডলার) মিয়ানমারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য দান করেন। 

সু চি-র নোবেল পাওয়ার ফলে তাঁর ও মিয়ানমারের দিকে আন্তর্জাতিক নজর গেল। সু চি হয়ে উঠলেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতীক। তিনি হয়ে গেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আইকন। 

অং সান সু চি, মিয়ানমার নামক দেশটিকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুনভাবে চেনাবেন এমন আশাই ছিল সবার। নানা কারণে, বিশেষত: সামরিক শাসনের জন্য দেশটি দীর্ঘ দিন ধরে বিশ্ব থেকে কার্যত: বিচ্ছিন্ন ছিল মিয়ানমার। মিয়ানমারের গণতন্ত্র আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আরেক নামে পরিণত হন সু চি।

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন রাজনীতিবিদের ক্ষমতার বাইরে থাকা আর ক্ষতায় থাকা আসলেই এক চরম বিপরীত একটি বিষয়। তারা ক্ষমতায় থাকতে যতটা জনগণঅন্তপ্রাণ, মানুষের অধিকার, গণতন্ত্রসহ নানা বিষয়ে যতটা সোচ্চার ও দৃশ্যমাণ থাকেন ক্ষমতায় গেলে যেন একেবারে বিপরীত চরিত্র ধারণ করেন অনেক রাজনীতিবিদ। আর এই ঘরানার রাজনীতিবিদদের মধ্যে তালিকার শীর্ষেই থাকবেন অং সান সু চি।

অং সান সু চি রোহিঙ্গা সংকটে, মানুষ ও মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আন্দোলনের চ্যাম্পিয়ন অং সান সু চির এই সত্ত্বার মৃত্যু হয়েছে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ ভূমি ছাড়া করার মাধ্যমে। তার প্রতি বিশ্বের মানুষের আস্থা আর ভালবাসাকে তিনি ঘৃণায় রূপান্তরিত করেছেন্ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ঘোর বিরোধী অবস্থান নেয়ায়।

বিশ্বের মানুষ ভাল করেই জানে যে রোহিঙ্গা সংকটের সবশেষ অধ্যায়টি মূলত: মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি পরিকল্পিত কাজ। তাই মানুষ আশা করেছিল সেনা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করা সু চি হয়তো এই ইস্যুতে মানুষ ও মানবাধিকারের পক্ষেই দাঁড়াবেন। সু চি তা করেননি, তিনি লটবহর নিয়ে নেদারল্যাডন্সের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে হাজির হয়েছেন। মানুষ ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে যে নৈরাজ্য চালিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকার তার পক্ষে তিনি সাফাই গেয়েছেন।  

২০১৫ সালে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অং সান সু চির ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু দুই বছর পর রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর সামরিক বাহিনীর নির্মম অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায় এবং এ বিষয়টি সু চি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরায়। অনেক দেশ ও সংস্থাই তাকে দেয়া সম্মানসূচক নানা পদ ও পদবী ফিরিয়ে নেয়।

তবে নিজের দেশে জনপ্রিয়ই ছিলেন সু চি।২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনেও তার দল বিপুল জয় পায়। সু চির দল এনএলডি ফের বড় জয় পায়। নির্বাচনে সু চির দল ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩৯৬টি আসন পায়। আর পার্লামেন্টের ৪৭৬টি আসনের মধ্যে সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি পায় মাত্র ৩৩টি আসন। এই নির্বাচনের ফল ঘিরে সংকট ঘনীভূত হয়। সেনাবাহিনী ও ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নির্বাচনের পর থেকেই ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দেশটির নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ নাকচ করে। মিয়ানমারের নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল ১ ফেব্রুয়ারি। তার কয়েক ঘণ্টা আগে দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

অং সান সু চি আবার কারাবন্দি হলেন, পোশাকি গণতন্ত্র আর কার্যত: সামরিক শাসনের যে আলো আধারি খেলা চলছিল দেশটিতে তা এখন আর নেই, দেশটি পুরোপুরি চলে গেলো সেনা শাসনের অন্ধকার যুগে।

সু চি আপনার কাছে মানুষের (বিশ্ববাসীর) যে আশা ছিল, যে প্রত্যাশা ছিল তা আপনি পূরণ করতে পারেননি। ক্ষমতা আপনাকে অন্ধ করে দিয়েছিল কি না জানি না, তবে আপনি মানুষের প্রত্যাশা, স্বপ্ন আর আকাঙ্খা পূরণ করতে পারেননি।

অং সান সু চি’র জন্য বিশ্ব জুড়ে মানুষের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা আছে কিন্তু তা এখন অনেকটাই করার জন্য করা ধরনের, সেই আবেগমথিত সমর্থন সু চির প্রতি নেই মোটেও। সুচি মানুষের নেতা ছিলেন, তিনি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে পথ ধরেছিলেন তাতে তিনি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই ছিলেন, এবার সেই সামরিক বাহিনী তাকে ছুড়ে ফেললো। অং সান সু চি হয়তো মানুষের সহানুভূতি পাবেন, সমর্থনও পাবেন কিন্তু আবেগভরা সেই ভালবাসা? সম্ভবত: এবার তা থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন।