৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নারীর চুল ঢেকে পর্দা নাকি দাবিয়ে রাখার কৌশল!

আপডেট : জুলাই ১০, ২০২০ ৩:৪৮ অপরাহ্ণ

284

মাসুদুল হাসান রনি

চলার পথে প্রায় প্রতিদিন অসংখ্য ইহুদী নারীর সাথে দেখা হয়। মাঝেমধ্যে লক্ষ্য করতাম বেটেখাটো এসব নারীর চুল সত্যিকারের নয়! পুর্নবয়স্ক এসব নারীর মাথায় ছোট কালো টুপির নীচে পরচুলা বা উইগ পড়া। আসলে এরা সবাই উইগ ব্যবহার করে কেন, জানার ভাবনাটা এলো গতকাল দু পার্ক এভিনিউ থেকে ফেরার পথে। ফেসবুকে গতকাল ইহুদীদের মোবাইল সেট ব্যবহার নিয়ে কৌতুহলি একটা পোস্ট দেয়ার পর ফেবুবন্ধু সামির জানিয়েছিল তাদের সম্পর্কে অনেক কিছুই। তখনই ভেবেছি একটু খোজ খবর নেই, শুধু ইহুদী নারী নয় সব ধর্মের নারীর চুল নিয়ে বিধি নিষেধ কি আছে। আসমানী কিতাব তৌরাত আর যবুরে উল্লেখ করা আছে ইহুদীরা নিজেদের তারা অভিশপ্ত মনে করে । অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে দুই হাজার বছর পরে তারা সেই রেড হেইফার বা লাল গরু পেয়েছে যেটা জেরুজালেমে দাজ্জালের থার্ড টেম্পল বানিয়ে সেখানে বলি দিয়ে তার রক্তে নিজেরা পবিত্র জাতি হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করেন । ( এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইউটিউবে সার্চ করুন রেড হেইফার আর থার্ড টেম্পল লিখে তাহলেই ভিডিও ফুটেজ সহ সব দেখতে পাবেন।) পুর্নবয়স্ক নারীর চুল স্বামী বা পরিবারের বাহিরে কেউ দেখুক তারা এটা চায় না। এটা নিশ্চিত করার জন্যই ১৮ বছর হবার পর ইহুদীনারীদের চুল ফেলে ন্যাড়া করে দেয়া হয়। ন্যাড়ামাথায় ইহুদী নারীরাও এটাকে ধর্মীয় অনুশাসনের অংশ হিসেবেই দেখেন। তাই এরা উইগ বা পরচুলা ব্যবহার করেন। আশ্চর্য লেগেছে প্রতিটি নারীর উইগ একই রকম ববকাট ছাটের। রংও একই ব্রাউন।
এবার আসি বিভিন্ন ধর্মের নারীদের চুল সম্পর্কিত কি বিধিনিষেধ রয়েছে। খৃস্টান, মুসলিম,হিন্দু, বৌদ্ধ নারীরাও তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মাথার চুল কাপড়ে ঢেকে রাখেন৷ বহু বছর ধরেই এই প্রথা চলে আসছে৷ বহু সংস্কৃতিতে নারীদের মাথার চুল দেখানোতে বিধি-নিষেধ রয়েছে৷ তবে যখন সামাজিক রীতিনীতি এবং ধর্মীয় ভাবধারা একসাথে হয়, তখন কিছুক্ষেত্রে সংঘাতও তৈরী হয়। সব ধর্মের নারীদের এ চুল দেখানো, না দেখানো নিয়ে যে বিধি নিষেধ আছে তার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পর্দা, শালীনতাই কি প্রধান কারন, নাকি ধর্মের নামে পর্দাপ্রথার নামে নারীকে ঘেরাটোপে আটকে ফেলা?
চুল এমন একটা বিষয়, যা নারীর সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তোলে তার চেহারার গঠন অনুযায়ী রাখা লম্বা বা ছোট চুলের কারনে।কিন্তু চুলকে অনেক ধর্মে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নারীদের চুল শুধুমাত্র স্বামী বা পরিবারের মানুষ দেখতে পারবে। যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করে তা হচ্ছে, যে নারীরা হিজাব করেন, তারা কি সত্যিই এ কথা বিশ্বাস করেন চুল দেখানোর মধ্যে পাপ আছে?
মনে হয় না। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালে আটকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সবধর্মের নারীরা তা মানতে বাধ্য হচ্ছেন। ইহুদি ধর্মে পর্দা সম্পর্কে ” এনসাইক্লোপিডিয়া বিবলিকার ” (৫২৪৭পৃষ্টা) বলা হয়েছে যে , হিব্রু নারীদের সাধারণ পোশাকের একটা অংশ ছিল ‘নেকাব ‘। এই নেকাব মাথা থেকে কাঁধ ঢেকে কোন কোন সময় পা পর্যন্ত চলে যেত। এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ‘তালমুদ ‘ থেকে।

গোঁড়া ইহুদি নারীরাও বর্তমানে অভিনব পদ্ধতিতে মাথা ঢাকেন। ইহুদি জাতি যারা শিক্ষায় , সম্পদে , জ্ঞানে , ধূর্ততায় বিশ্বসেরা , তাদের মধ্যেও গোঁড়ামি রয়েছে। বলা হয়, যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত গোঁড়ামিমুক্ত বা আলোকিত। কিন্তু তারা কি পেরেছে এ গোড়ামি থেকে বের হয়ে আসতে ? পারেনি । অথচ এ পর্যন্ত প্রাপ্ত নোবেল বিজয়ীদের শতকরা ২২ ভাগই ইহুদি। কিন্তু অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি নৃশংস হতে তারা কসুর করে না। সবাই নয় , সব ধর্মের কট্টরেরাই নিষ্ঠুর। সে ইহুদী হোক আর মুসলিমই হোক। আর এ নিষ্ঠুরতার শিকার ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে বেশির ভাগই নারী। সব ধর্মেই নারীকে সুপিরয়র ভাবা হয়নি, পুরুষের পরে তার স্থান দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ধর্ম ভিন্ন হলেও সবার উদ্দেশ্য কিন্ত অভিন্ন। নারীকে পদানত করা। গাজা যুদ্ধে যেমন ইসরায়েলের লক্ষ্য গর্ভবতী নারী। কারণ, ইসরায়েলের বিশ্বাস, এসব নারী আরও সন্ত্রাসী জন্ম দিতে যাচ্ছেন! অন্যদিকে মৌলবাদী ইহুদি পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রীর গর্ভে যত বেশি সন্তান নেওয়া যায় নিতে থাকেন। তাঁদের ধারণা, ইহুদিদের জনবল বাড়লে তারা পৃথিবী শাসনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে। অন্যদিকে আইএস যখন যুদ্ধ ময়দানে তাদের যোদ্ধাদের বিনোদিত ও চাংগা করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীদের এনে জড়ো করত। তারা ভাবত এতে তাদের যোদ্ধারা আরো বেশী চাংগা হয়ে যুদ্ধ ময়দানে ঝাপিয়ে পড়বে! আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজাকার, পাকিরা নারীদের গনিমতের মাল বলে গন্য করেছে। নারীরা যে শুধু যুদ্ধেরই বলি হচ্ছেন, তা-ই নয়, আপন ধর্মের বাতাবরণেও তাঁরা নিষ্পেষিত, শৃংখলিত।
প্রতিদিন কট্টর ইহুদিদের দেখা হয় খুব কাছ থেকে। হাটু পর্যন্ত কালো কোট চাপিয়ে যাওয়া পুরুষদের কানের দুই পাশে কাঁধ অবধি ঝোলানো পেঁচিয়ে রাখা জন্মচুল। জন্মের পর থেকে কলিটুকু রেখে রেখে বড় করা হয়। বেশির ভাগের মাথায় হ্যাট, কালো পোশাক। বাচ্চাদেরও মাথায় তালুতে ছোট টুপি ।

এরা স্বসম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলে না, খুব একটা মেশেও না। এমনভাবে পথ চলে, যেন তারা সবাউ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রজেশ্বর। যেন নোংরা পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারলেই বেচে যায়! তাদের পরিচালিত দোকানে পণ্য কিনে টাকা বাড়িয়ে দিলে তারা হাতে নেয় না, টেবিলের ওপর রাখতে বলে। যদি হাতে অস্পৃশ্য ছোঁয়া লেগে যায় ? তাদের নারীদের বিয়ের দিন পুরো মাথা ন্যাড়া করে ফেলতে হয়। বিবাহিত জীবনে ঘনকৃষ্ণ কেশদামের আর স্ফুরণ ঘটতে দেওয়া হয় না। চুল দেখানো মানে নারীর অবমাননা। তবে কি তাঁরা ন্যাড়াবেল হয়েই বাইরে যান? না।স্কার্ফ বা টুপির নীচে পরচুল বা উইগ পড়ে চলাফেরা করেন। সামনাসামনি দেখলে জানা না থাকলে কেউ টের পাবেন না যে তাঁরা উইগ পরে আছেন। এরা বিশ্বাস করেন খোলা চুলের মাঝে নারীকে আকর্ষণীয় দেখায়, আর তাতে পুরুষ প্রলুব্ধ হতে পারে । ওটা করা যাবে না। কিন্তু উইগকে চুল বলেই বিভ্রম হয়। তাতে তাঁদের মুখ কম আকর্ষণীয় লাগে না। কিন্তু আসল চুল যে বের করে রাখেননি, তাতেই সান্ত্বনা খুঁজে নিচ্ছেন তাঁরা।
রোমান ক্যাথলিক নারীরাও মাথা ঢেকে রাখেন। নানদের তো চুলের কণাটিও দেখা যায় না।বাইবেলের নতুন নিয়ম পাঠ করলে পর্দা সম্বন্ধে কিছু কিছু বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। “কিন্তু যে কোন স্ত্রী অনাবৃত মস্তকে প্রার্থনা করে, কিংবা ভাববাণী বলে, সে আপন মস্তকের অপমান করে, কারণ সে নির্বিশেষে মুন্ডিতার সমান হইয়া পড়ে। ভাল স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুলও কাটিয়ে ফেলুক, কিন্তু চুল কাটিয়ে ফেলা কি মুন্ডন করা যদি স্ত্রীর লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক আবৃত রাখুক। ” (১ করিন্থীয় ১১:৫,৬ পদ)
বাইবেলের পুরাতন অংশ পাঠে জানা যায় যে, ঐ সময়ও নাকি পর্দার প্রচলন ছিল। “আর বিবিকা চক্ষু তুলিয়া যখন ইসহাককে দেখিলেন, তখন উষ্ট হইতে নামিয়া সেই দাসকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে ক্ষেতের মধ্য দিয়া আসিতেছেন, ঐ পুরুষ কে? দাস কহিলেন, উনি আমার কর্তা। তখন বিবিকা আবরকে লইয়া আপনাকে আচ্ছাদন করিলেন। ” (আদি পুস্তক ২৪:৬৪, ৬৫ পদ)
তার মানে শুরু থেকে নারীকে আচ্ছাদনে ঢেকে ফেলা হয়েছে।কেড়ে নেয়া হয়েছে তার স্বাধীনতা।
মুসলিম দেশগুলোয় বিশেষ করে আরব দেশে হিজাব বাধ্যতামূলক। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও নারীরা মাথা ঢেকে রাখছেন। এমনকি স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য মুসলমান অভিবাসী নারীরা যে দেশেই বসবাস করছেন, সেখানেও অনেকে হিজাব ব্যবহার করছেন। আফগানিস্তানে তালেবানরা বলেই দিয়েছে
‘নারীর ভোটাধিকার ধর্মসম্মত নয়, নারীর শিক্ষার প্রয়োজন নেই, নারী গাড়ি চালাতে পারবেন না, নারী আপাদমস্তক আবরিত হয়ে থাকবেন।’
মনে পড়ে, নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বোকো হারাম’ নারীদের ইংরেজি শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য মেয়েদের স্কুল থেকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দী করে রেখেছিল। নারীকে শুধু পর্দাপ্রথায় আটকে ফেলা নয়, আধুনিক শিক্ষা দীক্ষা হতেও দূরে রাখতে চায় মোল্লাতন্ত্র।
মহিলাদের চুলের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালা হল : ১. মহিলারা চুল লম্বা রাখবে। হাদীস শরীফ থেকে জানা যায় যে, উম্মাহাতুল মুমিনীন রা. চুল লম্বা রাখতেন। ২. এ পরিমাণ খাটো করবে না যে, পুরুষের চুলের মতো হয়ে যায়। হাদীস শরীফে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিনী মহিলার প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে। ৩. চুল কাটার ক্ষেত্রে বিজাতীয়দের অনুকরণ করবে না। কারণ হাদীসে বিজাতীয়দের অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অতএব যে মহিলার চুল এত লম্বা যে, কিছু অংশ কাটলে পুরুষের চুলের সাথে সাদৃশ্য হবে না তার জন্য ঐ পরিমাণ কাটা জায়েয হবে। পক্ষান্তরে যার চুল তত লম্বা নয়; বরং অল্প কাটলেই কাঁধ সমান হয়ে যাবে এবং পুরুষের বাবরী চুলের মতো দেখা যাবে তার জন্য অল্প করেও কাটার অনুমতি নেই।
হায় শান্তির ধর্ম! সমাধিকারের ধর্ম, নারীকে তার নিজের চুল রাখা বা না রাখার স্বাধীনতাটুকুও দেয়নি। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে অনেক তথ্যই দেয়া যাবে, যেখানে নারীকে শুধুই পতিব্রতা হতে হবে , পরিবার পরিজনদের সামনে পর্দা ছাড়া কোথাও পায়ের নখ পর্যন্ত দেখানো নিষেধ করা হয়েছে। নারীর পোষাক কি রকম হবে সেটাও ধর্ম নির্ধারন করে দিয়েছে!
সূরা নূরে বলা হয়েছে,”প্রত্যেক বিশ্বাসী পুরুষদের বল, তাঁরা যেন তাঁদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে। এবং তাঁদের লজ্জাস্থান সমূহ হেফাজত করে। এটাই তাঁদের জন্য উত্তম পন্থা। আল্লাহ তায়ালা সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত। এবং বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তাঁরা যেন তাঁদের দৃষ্টি অবনত রাখে। এবং তাঁদের লজ্জাস্থান সমূহের সংযত সংরক্ষণ করে এবং তাঁদের দৈহিক সৌন্দর্য ও অলংকারের প্রদর্শনী না করে। তবে, অনিবার্য ভাবে যা উন্মুক্ত থাকে (তাতে কোনো দোষ নেই!)। তাঁরা যেন তাঁদের বক্ষের ওপরে চাদর ঝুলিয়ে দেয় এবং তাঁদের স্বামী, তাঁদের পিতা, শ্বশুর এবং সন্তানদের ছাড়া তাঁদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে।”(২৪:৩০-৩১)
ইসলামের গবেষকেরা এই আয়াত সমূহ এবং এ সংক্রান্ত হাদিসের ওপর ভিত্তি করে, নারী-পুরুষের পর্দার একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক হল, কমপক্ষে নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা। আর নারীর জন্য বাধ্যতামূলক হল, কমপক্ষে দুই হাতের কব্জী এবং মূখ মন্ডল ছাড়া পুরো শরীর ঢেকে রাখা। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন, তাও ঢেকে রাখতে হবে। ” পরিধেয় পোশাক ঢিলেঢালা হবে। যেন দেহের মূল কাঠামো প্রকাশ না পায়। পোশাক এত পাতলা ও স্বচ্ছ হবে না, যাতে ভেতরটা দেখা যায়। পোশাক বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার মত আকর্ষণীয় হবে না। পোশাকের ধরন বিপরীত লিঙ্গের মত হবে না। এবং পোশাকের ধরন অবিশ্বাসীদের মত হবে না। এই শর্তগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই রকম।”
একবিংশ শতাব্দীতে এসে কোন নারী – পুরুষ এখন এসব মানতে পারছে? আসলেই কি ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় থাকতে পারছে নাকি লোক দেখানো রীতিনীতিতে পরিনত হচ্ছে ও একদল মানুষকে পরকাল পাবার আশায় লোভাতুর করে তুলছে ?
কট্টর হিন্দুবাদীরাও নারীর চুল দেখানোর ঘোর বিরোধী। আমাদের দেশ ও পাশ্বর্বতী দেশে গোড়া হিন্দু নারীদের বড় ঘোমটা টেনে চলতে হয়। তারা মনে করে পরপুরুষ চুল দেখলে পাপ,পরজনমে বিধাতা সাপ দিয়ে তাদের কাটবে,দংশন করাবে!

হিন্দুধর্মের ঋগ্বেদে আছে, “হে নারী! তুই নিচে দৃষ্টি রাখ, উর্ধ্বে দৃষ্টি করিস না। আপন পদযুগল একত্রে মিলিয়া রাখ। তোর নাক যেন কেউ দেখতে না পায়, যদি এমন লজ্জাবতী হতে পারিস, তাহলে নারী হয়েও তুই সম্মেলনের পাত্রী হতে পারবি। “
এছাড়াও বলা হইছে, “কি বালিকা, কি যুবতী, কি বৃদ্ধা, কোন স্ত্রীলোককেই নিজ গৃহেও স্বাধীনভাবে কোন কার্য করা উচিত নয়। “(স্ত্রী ধর্ম :১৪৭)
আহা নারীর চুল তো দুরের কথা তার চোখ পর্যন্ত দেখানো বারণ করা হয়েছে! ধর্মে নারীর স্বাধীনতাটা কই, বুঝলাম না আজো!
বৌদ্ধ ধর্মে কি নারীকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে? নারীকে তো অন্যধর্মের মতন এখানেও পুরুষের অধনস্তঃ করে রাখা হয়েছে।
“যাহাতে স্বামীর কোন প্রকার কষ্ট না হয় তদ্বিষয়ে সর্বদা লক্ষ রাখিবে। পর -পুরুষের প্রতি ভ্রমেও খারাপ মনোভাব নিয়া দৃষ্টিপাত করিবে না। পতিব্রতা ধর্ম উত্তম রূপে রক্ষা করিবে। স্বামী প্রমুখ বাড়িস্থ সুখ -অসুখ সর্বদা জিজ্ঞেসা করিবে।…”
“যাহাতে উদর, পেট ও স্তন দেখা না যায় সেইরূপভাবে বস্ত্র পরিধান করিবে ও গায়ে দিবে। সর্বদা পরিষ্কার বস্ত্র ব্যবহার করিবে। পুরুষ সম্মুখে চুল আঁচড়াইবে না, এবং উকুন ধরিবে না। …” (গৃহীনীতি পর্ব :নারীদের কর্তব্য :২৫২,২৫৩,২৫৪ পৃষ্ঠা)
নারীর চুল,পর্দা, পতিসেবা সব ধর্মেই দেখি একই রকম বিধি নিষেধে আটকে ফেলা হয়েছে।মুসলিম-খ্রিষ্টান-ইহুদি-হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে ধর্মের নামে তাদের সবার মাথা ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ধর্মের আলোচনার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু নারী, তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন। যেন নারীকে দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই সব ধর্মের সৃষ্টি। ধর্ম পৃথিবীতে এসেছে আপামর মানুষের শান্তির জন্য। অথচ এ কথা কে না বোঝে যে ধর্ম এখনো গণতন্ত্রের হাতিয়ার। ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে বিজেপির মতো কট্টর দল জয়ী হয়, ধর্মের কথা শুনিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বা দেশের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য যেসব নেতা-নেত্রী দুনিয়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ধর্মের জিগির তোলেন। পূর্ব থেকে পশ্চিম, সারা বিশ্বে এ প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রাচীনকালে ধর্মীয় নেতারা দেশ চালাতেন। এখন দেশনেতারা সবাই ধর্মান্ধ। মাঝে উত্তরাধিকার বা গোলমালে অনেক দেশে নারীপ্রধান সরকার এসে গেলেও অদূর ভবিষ্যতে এ সংখ্যা কমবে বৈ বাড়বে না। নারীর বাড়বাড়ন্ত মেনে নিতে মোল্লাতন্ত্র অপারগ। ওদিকে যে হারে মোল্লাতন্ত্রের ইচ্ছা প্রতিফলনে নারীরা মরিয়া হয়ে উঠছেন, তাতে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে আর বাকি নেই। এসব নারী বুঝতে পারছেন না তাঁদের পুরুষতন্ত্র পাকাপোক্ত করার কাজে ব্যবহার করে তাঁদের অভাবনীয় শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়াই পুরুষকুলের উদ্দেশ্য।
সব ধর্মের কট্টরেরা নিজেদের ধর্মকেই সেরা ধর্ম ভাবেন। আর এই সেরা ভাবনাটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। তাদের কাছে অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষই অস্পৃশ্য।আমরা উন্নয়ন চাই,নারীর ক্ষমতায়ন চাই । কি আশ্চর্য আবার সেই মানুষগুলো একবিংশ শতাব্দীতে এখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে দাবিয়ে রাখতেও চাই!

তথ্যসুত্রঃ ১.সামির ফিয়েস্তা ২. উম্মে মুসলিমা ৩. উইকিপিডিয়া ৪. প্রিয়ডটকম