৩১শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ধৃত সাহেদ, আর একটি শিশুসুলভ আকাঙ্ক্ষা

আপডেট : জুলাই ১৫, ২০২০ ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

33

মাসুদ কামাল

সবার মাঝে যেন একটা উল্লাস টের পাচ্ছি। খুব সকালে ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গেছিল। এক সহকর্মী, একটি টেলিভিশনের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকের ফোন। উনিও হয়তো বুঝতে পারছিলেন, খবরটি তখনো আমি পাইনি। বললেন- সাহেদ তো ধরা পড়েছে, সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকায়! তারপর আরও কিছু কথা হলো। সেসব কথা হয়তো প্রাসঙ্গিক, তবে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তার উচ্চারিত প্রথম বাক্যটিতেই বেশ উল্লাসের মেজাজ ছিল। সেই স্বস্তিটা আমাকেও স্পর্শ করলো।
যা কখনো করি না, সেটাই করলাম। সকাল সকাল টেলিভিশন খুলে বসলাম। অনেকেই দেখি লাইভ সম্প্রচার করছে প্রতারক সাহেদের ধরা পড়ার ডিটেইল ঘটনাবলী। হাতকড়া পরা সাহেদকে দেখলাম। নীল রঙের একটা সার্ট পরে আছে, উপরে কালো বোরকা। বোরকায় আবার কাদা মাটির ছোপ ছোপ ছাপ। ফেসবুকে যেয়ে আরও কিছু ছবি পেলাম। এগুলো আরো ডিটেইল। একটা ছবিতে দেখি- সে দাঁড়িয়ে আছে, তার দুপাশে র্যা বের কয়েকজন সদস্য। তার কোমরে মোটা একটা বেল্টের মতো বাধা, তার ভেতরে একটা পিস্তল গোঁজা! বিষয়টা আমার কাছে রীতিমত বিস্ময়কর ঠেকলো। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তাকে ধরার পরও কিভাবে তার কাছে দৃশ্যমান একটি অস্ত্র থাকতে পারে? তাকে অস্ত্রসহ ধরা হয়েছে- এটা প্রমাণ করতে অস্ত্রটি তার কোমরে দৃশ্যমান অবস্থায় রাখতে হবে? একটা ভিডিওতে দেখলাম- হেলিকপ্টারে তাকে তোলার আগে একজন র্্যাব কর্মকর্তার সঙ্গে অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কি যেন বলছে সাহেদ। তবে র্্যাব কর্মকর্তা তার কথায় ন্যূনতম পাত্তা দিচ্ছেন বলে মনে হল না।
তবে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লাগল যে ভিডিও ক্লিপটি, সেটি অনেকটাই আনাড়ি হাতে কোন মোবাইলে তোলা। এটা মনে হয় সাতক্ষীরাতে ধরা পড়ার পর একেবারে শুরুর দিকের কোন ছবি হবে। পটভূমিতে গ্রামের কিছু দৃশ্য। পেছনে গাছ-পালা, জলাধার, একটা বড় বিলবোর্ড, ছোট একতলা দলান। সাহেদের পিছনে আশপাশে র্্যাবের কিছু সদস্য। তাদের সঙ্গে এলাকাবাসীও রয়েছেন। এরা মূলত দর্শনার্থী। নানা বয়সের মানুষ, নানা মন্তব্য করছেন। সাদা পোশাকের এক ভদ্রলোকের হাতে একটা লাঠি। সেটা দিয়ে তিনি সাহেদের ডান কাধে মৃদু একটা বাড়ি মারলেন। কেউ একজন বললেন, সম্ভবত র্্যাবেরই কোন এক সদস্য, ও তো জাতীয় প্রতারক।
হঠাৎ ছোট একটি বাচ্চা ছেলে বলে ওঠলো-“সবাই মিলে একটু মাইল্লে হইতো!”
একজন র্্যাব সদস্য বললো- “তাহলে তো ওকে ছিড়ে খেয়ে ফেলবে। এইটুকু একটা ছেলে বলছে- সবাই মিলে একটু মাইল্লে হইতো!”

আসলে ছোট্ট ওই ছেলেটিও যেন বুঝে গেছে, এই সব প্রতারকের কি শাস্তি হওয়া উচিত। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই তারা হয়তো বুঝতে পেরেছে, এই সব প্রতারকদের আসলে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয় না। পুলিশ আদালত হবে, একসময় জামিন পেয়ে আবার সেই আগের কাজে ফিরে যাবে এরা। এদের হাত অনেক লম্বা, এদের শেকড় অনেক ছড়ানো। এদের কখনো নির্মূল করা যায় না। শেকড় ধরে উপড়ে ফেলতে গেলে অনেক সময় নিজের গায়ে এসে লাগে। সে কারণেই সবাই মিলে ‘মাইল্লে’ হাতের সুখটুকু মেটে। নগদ ওই প্রাপ্তিটুকুই লাভ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুটির সেই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি। চারদিকে তাকে প্রহরা দিয়ে র্্যাব দাঁড়িয়ে ছিল। এর মধ্যে এধরনের আকাঙ্ক্ষা- তা সেটা যত তীব্রই হোক না কেন, যত প্রয়োজনীয়ই হোক না কেন, মেটানো যায় না।

অনেকেই বলছেন- সাহেদ তো একা ছিল না। তার পিছনে আরও অনেকে ছিল মদতদাতা। তাদেরও একটু ‘সবাই মিলে মাইল্লে হইতো!’
জানি, সেটাও সম্ভব নয়। তাদের চারপাশেও রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যেমনটি আগে থাকত সাহেদের সঙ্গে।