২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা

আপডেট : আগস্ট ২৪, ২০২০ ১০:৩৪ অপরাহ্ণ

85

বার্লিনে আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ থাকেন।নাজমুন নেসা পিয়ারি। আমাদের প্রিয় পিয়ারি আপা।
কবি শহীদ কাদরীর প্রথম ভালোবাসা, সাবেক সহধর্মিণী। যাকে নিয়ে কবি লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা “তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা।” এই কবিতাটি তখন তরুন তরুনীদের মাঝে তুমুল আলোড়ন তুলে।
অনেকেই জানেন না এই বইয়ের প্রথম এডিশনের কভার করেছিলেন নাজমুন নেসা পিয়ারি। কবি বইটি উৎসর্গ করেছিলেনও তাকে।
এই কবিতাটি পরবর্তীতে কবি দম্পতির কমনফ্রেন্ড কবীর সুমনের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান হিসেবে শ্রোতাদের মন জয় করে নেয়।

পিয়ারি আপা দীর্ঘকাল ডয়েচ ভেলে ও জার্মান মুলধারায় সাংবাদিকতা করেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি লেখক, অনুবাদক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে বেশ পরিচিত। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ভাষা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২০ সালে একুশে পদক প্রদান করে।২০১৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছেন।
পিয়ারি আপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর বেশ কিছুদিন সিদ্ধেশ্বরী কলেজে শিক্ষিকতা করেছেন। ইডেন মহিলা কলেজে চাকুরি হবার পরও জয়েন করেননি চিত্রকলায় মনোনিবেশ করার জন্য।এসময় তিনি মর্নিং শিফটে সিদ্ধেশ্বরী কলেজে শিক্ষিকতা শেষে বিকেলে চলে যেতেন ধানমন্ডির একটি আর্ট গ্যালারিতে। সেখানে তিনি ছবি আঁকা শিখতেন। তাঁর দুটি বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি এঁকেছেন। পাশাপাশি ঢাকায় আঁলিয়স ফ্রঁসেজে ফরাসি ভাষা শিখতেন কিন্তু সাবেক পশ্চিম জার্মানিতে রেডিও ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের এক প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে ১৯৭৬ সালে জার্মানি চলে যান।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঐ বেতার কেন্দ্রে তখন বাংলা ভাষায় প্রোগামের সংযোজন ঘটে। বেতার শ্রোতাদের কাছে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, পরিবেশনা ও তাঁর কন্ঠস্বরের জন্য পিয়ারি আপা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

শুধু বাংলা বিভাগই নয়, তিন বছর বাংলা বিভাগে কাজ করার পর তিনি বাংলা, ইংরেজী, জার্মান বিভাগেও কাজ করেন। জার্মান বিভাগের একটি জনপ্রিয় তথ্য ও বিনোদনমূলক “স্টাট বুমেল” অর্থাৎ “নগর পরিক্রমা” নামক একটি মঞ্চ অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেন।
এটি প্রতি মাসে জার্মানির বিভিন্ন শহরের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হতো এবং তা সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী জার্মান শ্রোতাদের জন্য বেতারে প্রচারিত হতো। এই অনুষ্ঠানটি তাকে জার্মান শ্রোতাদের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে এবং এভাবেই তিনি জার্মান মূলস্রোতে মিশে যান।
১৯৯০ সালে তিনি ডয়েচে ভেলের কেন্দ্রীয় মার্কেটিং এবং গণসংযোগ বিভাগের সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি প্রথম বিদেশী যিনি এই পদে যোগ দেন।

১৯৮৯ সালে পশ্চিম ও পূর্ব দুই জার্মানি একত্রিত হওয়ার পর বন থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় বার্লিনে। তিনি ডয়েচে ভেলের একটি বিশেষ অফার গ্রহন করে ২০০৩ সালে ডয়েচে ভেলে ছেড়ে বার্লিনে চলে যান খন্ডকালীন স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখায় মনোনিবেশ করার জন্য।

ডয়েচে ভেলের কাজের বাইরেও দেশের ইত্তেফাক, ইনডিপেনডেনট, অবজারভার, ডেইলি স্টার ইত্যাদি পত্রিকায় জার্মান ও ইওরোপ বিষয়ে প্রচুর আর্টিকেল লিখেছেন। বনের ইন্টারনোৎসিওন ম্যাগাজিন ও কলোন মেসে (মেলা)’র জন্যও নিয়মিত লিখতেন।
২০০৫ সালে নোবেল বিজয়ী জার্মান লেখিকা এলফ্রিডে ইয়েলিনেকের বিখ্যাত উপন্যাস “পিয়ানো টিচার” সরাসরি জার্মান ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন।বইটি ব্যাপক সাড়া ফেলে ও পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।

এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি অনুদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও আছে তার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ও কবিতার বই।
অামার ইউরোপ ভ্রমনের প্রথমদিকে অর্থাৎ ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে যতোবার বার্লিন যাওয়া হয়েছে দুর্ভাগ্য পিয়ারী আপার সাথে একবারও দেখা হয়নি। আমি বার্লিন যখনই যেতাম তিনি তখন হয় ঢাকায়। নয়তো তিনি উড়ে বেড়াচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন নিউইয়র্ক, কোলকাতায়। কিংবা ইউরোপের অন্যকোন শহরে।

ব্যাটেবলে হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে পিয়ারি আপার সাথে বার্লিনে দেখা হয়। বার্লিন প্রবাসী আমাদের রাজপথের সহযোদ্ধা নজরুল রাসেলকে নিয়ে একদিন গেলাম পিয়ারি আপার বাসায়। পুর্ব থেকে নির্ধারণ করা ছিল দুপুরে আপার বাসায় খাবো।
দুপুরের কিছু আগে আপার বাসায় পৌঁছে দেখি এলাহীকান্ড। আপা কতকিছু রান্নাবান্না করে রেখেছেন। অথচ আমার খাবার তো চড়ুইপাখির আহার। এতো কিছু কে খাবে! মনরক্ষার্থে আপার বেড়ে দেয়া সব খাবারই একটু একটু করে চেখে দেখতে হয়েছে।
খাবারের আগে পরে আমাদের তিনজনের আড্ডায় শুধু শিল্প সাহিত্য ছিল না, ছিল বিশ্ব রাজনীতি অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন,সংস্কৃতি, বইমেলা, চলচ্চিত্র থেকে প্রবাস জীবনের নানান প্রসঙ্গ।

গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে কত কিছু জানতে চাই। তাঁর বর্নাঢ্য জীবনের কত গল্প! সব গল্প হয়তো একদিনে শুনতে পারবো না।
বার্লিন জীবনের শুরুটা কেমন ছিল আপা ?
অনেকেই জানে না বার্লিনে বসবাসের শুরুতেই আমি “ডাস কোর” নামে একটি সংস্থায় কাজ করেছি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের মাঝে মেলবন্ধন তৈরি করা। পটসডামার প্লাজার নতুন গড়ে উঠা রিৎজ কার্লটন হোটেলের হলরুমে অসংখ্য সেমিনার করেছি।

এখনকার সময় কিভাবে কাটছে?
দেখো আমি কখনো অবসর থাকি না। সারাদিন কিছু না কিছু কাজ আমাকে করতে হয়।জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে কূটনীতিবিদ এবং যারা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাকুরি করতে যান তাদের বাংলা শেখানোর জন্য খন্ডকালীন কাজটি খুব যত্ন নিয়ে করছি।
সেদিন অবশ্য বিকেলে আপার অন্যত্র একটি পুর্ব নির্ধারিত এপয়েন্টমেন্ট থাকায় আমাদের আড্ডার সমাপ্তি টানতে হয়েছিল তাঁর কন্ঠে কবিতা আবৃত্তি শুনে।

ঢাকা, বার্লিন ও টরন্টোর ড্যানফোর্থ , বইমেলায় এবং একসময়ের জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপক আসমা আহমেদ আপার বাসায় পিয়ারি আপার সাথে আড্ডা নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। কত কথা, কত গল্প! সেই সব নিয়ে লিখতে গেলে পুরো একটা ঢাউশ বই লেখা হয়ে যাবে।
এরপর ২০১৭ সালে আবার বার্লিনে তাঁর বাসায় সারাদিন গল্প আড্ডায় মেতেছিলাম। এবার আপাই খুব সকালে আমাকে আমরুমার স্ট্রাসের মেট্রোস্টেশন থেকে পিক করেন।

পটসডামার প্লাজার যেখানে বিখ্যাত “বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব”-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও সমাপনী উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং মূল প্রতিযোগিতার ছবিগুলো যেখানে দেখানো হয়, সেই বিশাল বের্লিনার থিয়েটার হলের পাশেই পিয়ারি আপার বাসা।
সকালবেলা দু’জনে একসাথে ব্রেকফাস্ট সেরে নেই ফেস্টিভ্যাল কমপ্লেক্সের পাশের মলের ফুডকোটে। কফি খেতে খেতে কথা হয় আপার লেখালেখি, বার্লিনের জীবন যাপন, কোলকাতা – বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফ্রাংকফ্রুট -নিউইয়র্ক-কোলকাতা বইমেলা নিয়ে। একসময় তিনি ঢাকায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের সাথে যুক্ত ছিলেন।
সিনেমা নিয়ে তাঁর আকাশচুম্বি আগ্রহ। ভাল সিনেমা দেখার জন্য এখনো তিনি বিশ্বের নানান প্রান্তে অনুষ্ঠিত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে আমন্ত্রিত হয়ে যান। তাঁর ছোট এপার্টমেন্টের লাইব্রেরিতে শিল্প সাহিত্যের বইয়ের পাশাপাশি সিনেমা বিষয়ক প্রচুর বই আছে। রীতিমতন ঈর্ষনীয় সংগ্রহ।

ড্রইংরুমের ডিভানে গা এলিয়ে কফির মগ নিয়ে মুখোমুখি বসি। অনেকে হয়তো জানেন না জার্মানের নামকরা পন্যের মডেল হয়েছিলেন এই সুন্দরী কবি। তাঁর বসার ঘর ও লাইব্রেরীর দেয়ালজুড়ে আছে একদা লাস্যময়ী সুন্দরী মডেল পিয়ারির অনেক ছবি।
কবি শহীদ কাদরীর সাথে পরিচয়, প্রনয় ও বিয়ে নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে।
বার্লিনের আড্ডায় অবধারিতভাবে এসেছে ঢাকার ক্যাফে বারিস্তার আড্ডার কথাও। এসেছে রেহেনা আপার কথা। এসেছে আমার সহকর্মী, কন্ঠশিল্পী মারিয়াম মারিয়ার কথাও। দু’জনেই আড্ডায় তাদের অনুপস্থিতি প্রকটভাবে অনুভব করেছি।
দুপুরে নানান পদের শাক,ভর্তা, ডাল, মাছ,মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে আবার লম্বা আড্ডা জমে। সেই আড্ডায় দেশ বিদেশের কোন সীমা ছিল না। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে আটলান্টা মহাসাগর পাড়ের মানুষের গল্প উঠে এসেছে। এসেছে নিউইয়র্কের অনেক প্রিয়জনের কথাও।

কবি দম্পতির একমাত্র পুত্র সন্তান আমেরিকা বসবাস করছেন। বার্লিনের এই ছোট ফ্ল্যাটে আপা থাকেন। বলা যায় বছরের মাত্র ছয় মাস থাকেন। বাকী সময় ঢাকা, নিউইয়র্ক, কোলকাতা কিংবা ইউরোপের নানান শহরে সভা,সমাবেশ,সেমিনারে কেটে যায়। জিগেস করেছিলাম, এই জীবন কেমন লাগে?
তিনি বরাবরের মতন মিষ্টি হেসে বলেন, “খারাপ তো কাটছে না। স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছি।এটা কজন পারে? এই যুগেওতো অনেককেই অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়।”

আসলেই আমরা অনেক কিছু পারি না। তাই প্রবাস জীবনের একাকীত্ব নিয়ে তাঁর মধ্যে কোন হা হুতাশ নেই।

সকাল থেকে কথা, গান, কবিতা আর স্মৃতিচারনে আমাদের সময়গুলো কিভাবে যেন ফুৎকারে মিলিয়ে গেল। বিকেলে যখন আপার বাসা থেকে বের হয়ে আসি তখন সুর্য একটু একটু করে পশ্চিমে হেলে পড়ছে।