২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

তিতাস গ্যাসের আইনি লড়াই বনাম মানবিক রাষ্ট্র

আপডেট : ডিসেম্বর ৩, ২০২০ ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ

72

আব্দুর রহমান

নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লায় জামে মসজিদে বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩৭ জনের পরিবারকে জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় ৫ লাখ টাকা করে দিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। আদালতের আদেশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে ভুক্তভোগীদের মাঝে এ টাকা বিতরণ করতে বলা হয়েছিল। সেই সঙ্গে দগ্ধ ও নিহত ৩৭ জনের পরিবার প্রতি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকারের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই নির্দেশ এবং রুল জারি করে হাইকোর্ট।
ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে তিতাস ও সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি স্থগিতাদেশ দিয়ে আবেদন ১ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠানোর আদেশ দেন। এ আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ টাকা দেয়ার নির্দেশ স্থগিত করে রিট দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেয়।
মূলত: নিহতদের পরিবারকে হাইকোর্ট টাকা দেয়ার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছিল তার বিরুদ্ধে আপিল করাটাকেই এক ধরণের অমানবিক ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ মনে হয়। আদালতের এমন একটা নির্দেশ অবনত মস্তকে মেনে নেয়া উচিত ছিল তিতাস গ্যাসের। কিন্তু তারা তা করেনি, তারা হাইকোর্টের আদেশের চার দিনের মাথায় তার বিরুদ্ধে আবেদন করেন আপিল বিভাগে। হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছিলেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ। এবার পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চও টাকা দেয়ার বিষয়টি স্থগিত করলো।
আইনের প্রক্রিয়া অনুযায়ী এ সবই ঠিক আছে, তিতাস গ্যাসের অধিকার আছে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের যাওয়ার, আপিল বিভাগের এখতিয়ার বা ক্ষমতা আছে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেয়ার। সুতরাং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে কোন মন্তব্য নেই, কারণ এসবই আইনানুযায়ী হয়েছে, কিন্তু মানবিকতার জায়গা থেকে? আইনের শাসন কিংবা প্রক্রিয়া অব্যাহত বা গতি যথাযথ রাখার ফলে মানবিকতা কি মুখ থুবরে পড়লো না? কি এমন ক্ষতি হতো যদি হাইকোর্টের রায় মেনে নিয়ে পরিবার প্রতি ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতো তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। অনেকে বলতে পারেন মামলা তো শেষ হয়নি, শেষ হয়নি তা কি হাইকোর্ট জানে না? এটা একটা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ। এই আদেশ মেনেই যদি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আপিল করতো, পুরো বিচার কার্য শেষ হতো তাতে কি দেশের কোষাগার শূণ্য হয়ে যেত? ৩৪জন মানুষ মারা গেল, নিশ্চয়ই কারো না কারো গাফিলতি আছে। এখন সেই পরিবারগুলোকে আইনি প্যাচে ফেলে দেয়া হলো। তারা এখন অপেক্ষা করবে কবে হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি হবে, এরপর তো আপিল বিভাগের দীর্ঘ যাত্রা রয়েছেই।
হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী যদি পরিবার প্রতি ৫ লাখ টাকা করে দেয়া হতো তাহলে তা পরিবারগুলোর যা উপকার হওয়ার হতো কিন্তু দেশের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান যারা মানুষের সেবা নিয়ে ঢিলেঢালা আচরণ করে তারা একটি শক্ত বার্তা পেত একইসঙ্গে তা মানবিকতার জন্যও একটি বড় উদাহরণ হতো। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট যেটুকু অগ্রসর হয়েছে তা পরবর্তী প্রক্রিয়ায় থমকে গেছে। এই প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুরু করা যায় কি না জানি না, তবে ধারণা ও বিশ্বাস করি নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ আদালতের হাতে ও সামনে তেমন সুযোগ নিশ্চয়ই রয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক