১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

টিকা দেয়াকে উৎসব বানাবেন না

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২১ ৫:২২ অপরাহ্ণ

144

পথহারা পথিকের কথা

টিকা দেয়া নিয়ে নানান মজার অভিজ্ঞতার কথা কম-বেশি সবারিই জানা। টিকা দেয়ার ভয়ে স্কুল পালানো, টিকা দেয়ার লোক এসেছে শুনলে ঘর খালি রেখে চলে যাওয়া এমন অনেক কথাই পূর্ণবয়ষ্ক মানুষেরা স্মরণ করেন, সেসব ঘটনা এখন অনেকের শৈশবকালের রসালো স্মৃতি। গল্পে আড্ডায় শৈশবের নানা কথা যখন উঠে আসে অবধারিতভাবে চলে আসে টিকা নেয়ার সেই সব স্মৃতিকথা।
২০২০ সালটা বিশ্বকে দমন করেছে করোনা নামের একটি ভাইরাস। মৃত্যুভয় নিয়ে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েছে, সবার ভাবনায়ই ছিল, সে হয়তো করোনার ভাইরাস নিয়ে ঘরে ফিরছে। এক পর্যায়ে তো প্রায় সারা বিশ্ব অবরুদ্ধ হয়ে গেল, ঘর থেকে বের হওয়াই বারণ। মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়া আর মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগলো। এ তালিকা যত বড় হতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে মানুষের মনের ভয় আর আতংক। পাশাপাশি চলতে থাকে, প্রতিরোধ আর প্রতিকারের উপায় বের করার নানা উদ্যোগ ও চেষ্টা। প্রথম দিকে প্রতিকারের কিছু ছিল না, ছিল শুধু প্রতিরোধের কিছু ফর্মূলা। যেমন ঘর থেকে বের না হওয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, মাস্ক পড়া, কিছুক্ষণ পর পর ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। পাশাপাশি সারাবিশ্বের ওষুধ বিজ্ঞানীরা নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালাতে লাগলেন এর প্রতিকার খুঁজে বের করতে। অবশেষে সাফল্য ধরা পড়লো, টিকা আবিষ্কার হলো।

করোনার টিকা দেয়া শুরু হয়েছে দেশে। অনেক আলোচনা-সমালোচনা, ভয়, আতংক আর ভাবনা ছিল এই টিকা নিয়ে। তবে সবার মনে ছিল একটি আশা, এই টিকা দেয়ার কাজটি যেন ভাল ভালয় হয়। শেষাবধি ভয় আর ভাবনাকে পিছু হটিয়ে জয় হলো আশার। টিকা নিরাপদেই দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।
২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম করোনা টিকা দেয়া হয়। তা ছিল পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগ। সাধারণ মানুষ পর্যায়ে টিকা দেয়া শুরু হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি, সেদিন সারাদেশে টিকা দেয়া শুরু হয়। টিকা দেয়া নিয়ে মানুষের ভয় উবে গেছে, শংকার মেঘও কেটে গেছে। কয়েকজন মন্ত্রী টিকা নিয়েছেন, সচিব, এমপি, বিশিষ্টজনরা টিকা নিচ্ছেন। তারা টিকা নিয়ে মানুষকে একটা বার্তা দিয়েছেন, টিকা দেয়া নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটা পরিষ্কার যে, টিকা নিয়ে মানুষের ভয় অনেকটাই কেটে গেছে, মানুষ এখন হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করেছে টিকা নিয়ে। রাতারাতি বেড়ে গেছে টিকা দেয়ার জন্য নিবন্ধন করতে আগ্রহী মানুষের সারি।
করোনার টিকা নিয়ে ভয়টা কেটে যাওয়া সত্যিই খুব প্রয়োজন ছিল। করোনা মানুষের মনে একটা বড় ধরণের ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে-মৃত্যুভয়। করোনায় অনেক নামকরা মানুষের মৃত্যুতে এই ভয় আরো বেশি মানুষের মনে গেঁথে গেছে। দেশের সেরা হাসপাতাল, সেরা চিকিৎসক, সেরা সেবা নিয়েও যখন একজনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে তখন মানুষ আতংকিত না হয়ে পারে কিভাবে? মৃত্যু বিষয়টা স্বাভাবিক, কিন্তু করোনা কোন মৃত্যুকে আর স্বাভাবিক থাকতে দেয়নি, পরিণত বয়সের কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, কিন্তু তার মৃত্যু ভয়ংকর ছাপ ফেলে গেছে তার স্বজন, নিকটজন, প্রতিবেশী এমনকি চেনা-অচেনা মানুষের মধ্যেও।
যাইহোক, করোনার টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। সারা দেশে করোনাভাইরাসের টিকা প্রয়োগ শুরুর প্রথম দিনে টিকা নিয়েছেন ৩১ হাজার ১৬০ জন। দ্বিতীয় দিন টিকা নেন ৪৬ হাজার ৫০৯ জন। আর তৃতীয় দিন অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি টিকা নেন ১ লাখ ১ হাজার ৮২ জন। সবমিলিয়ে তিন দিনে টিকা নিয়েছেন মোট ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩১৮ জন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে প্রথম দিনের তুলনায় তৃতীয় দিনটিতে টিকা নেয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। টিকা নিয়ে মানুষের ভয় কেটে যাওয়া অবশ্যই বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আস্থার বহি:প্রকাশ।

এখন সরকারের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর তা হচ্ছে টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষা করা। টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধনের একটি বিষয় ছিল। তবে কারিগরি ত্রুটি বা শ্লথগতির কারণে নিবন্ধনে প্রথম দিকে বেশ সময় লেগেছে। করোনার টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকার যে অগ্রাধিকারের তালিকা করেছে তাতে টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে হৈচৈ হাঙ্গামা কম হতো। তবে যেহেতু এখন আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে তাই এর ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ওে ভাবতে হবে।
বিশেষ করে ঢাকা নগরীতে টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে টিকাদান কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেই টিকা দেয়া হবে এ ধরনের চিন্তাও বাস্তবসম্মত হবে না। হাসপাতালগুলোতে ম্যানুয়াল রেজিস্ট্রেশন করার পর তিন/সাত দিনের মধ্যে একজন যাতে টিকা পায় তা নিশ্চিত করতে পারলেই যথেষ্ট, এর পাশাপাশি অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের বিষয় তো থাকবেই। ম্যানুয়েল রেজিস্ট্রেশেনের কাজটি নগরীর মহল্লাভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করা যায়। মহল্লাভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেজিস্ট্রেশন হওয়া ব্যক্তিরা কে কবে এবং কোন হাসপাতালে টিকা নেবেন তা যদি প্রতিদিন বিকেলে টাঙিয়ে দেয়া হয় তাহলে এ নিয়ে হুড়াহুড়ি আর উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কমবে।
বাংলাদেশের মানুষের একটা বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে মেতে ওঠা। মানুষ এখন টিকা নিয়ে মেতে উঠবে তা নিশ্চিত কিন্তু টিকা নেয়া কোনভাবেই একটা উৎসব হতে পারে না, টিকা নিতে গিয়ে ফটোসেশন করা, দলবেধে কেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। কেননা, এসব সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে প্রাথমিক শর্ত তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। টিকা দিতে বা নিতে এসে নিজের অজান্তে কেউ যেন করোনাভাইরাস নিয়ে ঘরে না ফেরে তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ৪০ বছর ঊর্ধে্বর মানুষ টিকা নিতে পারবে, এরপরও গুরুতর নানা অসুখে ভোগা মানুষজন টিকা নিতে পারবেন না, সুতরাং দেখা যাচ্ছে অনেক ঘরই পাওয়া যাবে যেখানে শুধু একজনই টিকা নিতে পেরেছেন, পরিবারের অন্য সদস্যরা কিন্তু টিকা পায়নি, আপনি নিজেকে নিরাপদ জগতে নিতে পেরেছেন এটা স্বস্তির, কিন্তু আপনার পুরো পরিবারের জন্য এখনো প্রতিকার নয় প্রতিরোধই একমাত্র ব্যবস্থা, তাই নিজেকে নিরাপদ মনে করে উৎসবে মেতে ওঠা নয়, অন্য সবার কথা ভেবে অধিকতর সতর্কতাই কাম্য।