১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

জীবন, জীবিকা ও লকডাউন

আপডেট : এপ্রিল ২৯, ২০২১ ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

28

পথহারা পথিকের কথা

করোনা প্রতিরোধে সরকারের নেয়া সবচে’ দৃশ্যমাণ পদক্ষেপ ‘লকডাউন’ এর সাফল্য ষ্পষ্ট হচ্ছে। গত ১৫ দিনে করোনায় শনাক্তের হার অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে লকডাউন মেনে চলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি নানাভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সরকার এবং সমাজের অগ্রসর অংশ সবাইকে একটি সুন্দর কথা বলে থাকেন, আর তা হচ্ছে জীবন বাঁচাতেই জীবিকার ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। অর্থাৎ করোনার প্রকোপ থেকে নিজেকে আগে বাঁচান, তারপর জীবিকার বিষয়। কথাটি মোটেই অসত্য নয়, কেন না জীবন বাঁচলেই না জীবিকার প্রশ্ন আসবে। এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তবে জীবিকা ছাড়াও কিন্তু জীবন বাঁচানো দায়। অর্থাৎ জীবনের জন্যই জীবিকা অপরিহার্য। আর জীবিকার এই অপরিহার্যতা স্বীকার করেই সরকার হয়তো মার্কেট ও শপিং মল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২৫ এপ্রিল থেকে মার্কেট আর শপিং মল খোলা।
বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলায় লকডাউন শুরু হয়েছে ১৪ এপ্রিল থেকে, আর তা চলবে ৫ মে পর্যন্ত। এ সময় সব ধরণের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে, অফিস বন্ধ থাকবে। এবারের করোনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, একইসাথে লকডাউনের নামও বদলে হয়েছে কঠোর লকডাউন, কিন্তু এই কঠোর লকডাউন দিন দিন শিথিল থেকে শিথিলতর হয়ে গেছে। রাস্তায় গণপরিবহন বাদে সব ধরণের বাহনই চলছে। অবশ্য গণপরিবহন না চলায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়নি, তবে ভয়ংকরভাবে অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে গণপরিবহন সংশ্লিষ্টদের জীবন। দেশে গণপরিবহনের সঙ্গে জড়িত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। গাড়ি বন্ধতো এই সব মানুষের আয়ও বন্ধ। লাখ লাখ গাড়ি চালক, কন্ট্রাক্টর ও হেলপারের আয় নির্ভর করছে গাড়ির চাকা ঘোরার ওপর। তাদের সাথে রয়েছে টিকেট কাউন্টারে কর্মরত হাজার হাজার মানুষ। রয়েছে গাড়ির মেকানিকসহ আরও নানা শ্রেণির মানুষ, গাড়ির যন্ত্রপাতি বিক্রির সঙ্গে জড়িত হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী। বাস টার্মিনালে নানারকম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর আয় নেই। লঞ্চ বন্ধু, ট্রেন বন্ধ, এসব ক্ষেত্রেও কাজ করে কয়েক লাখ মানুষ। এই মানুষগুলোর কথা ভাবতে হবে। তাদের পরিবারগুলো কেমনে চলছে তা কি জানা সম্ভব? হয়তো পুরোপুরি জানা সম্ভব না, তবে দিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলো যখন এক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে কোন আয় করতে পারছে না তখন তাদের অবস্থা যে কতটা করুণ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

আমাদের সবারই একটা সহজ হিসাব ‘চাকরি’ মানে মাস শেষে বেতন। কিন্তু কত ধরণের চাকরিই যে আছে যেখানে দিনের হাজিরার ওপর নির্ভর করে তার আয়, লকডাউনে এমন প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় লাখ লাখ মানুষের আয় বন্ধ। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যাদের কর্মীদের আয়ের ওপরই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, আর সেই আয় থেকেই তারা মাস শেষে বেতন পান। অফিস ইকুইপমেন্ট সরবরাহকারী নানা প্রতিষ্ঠান, আইটি সাপোর্ট, টেকনিক্যাল নানা সাপোর্ট দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা কিন্তু জানেন না মাস শেষে তাদের বেতন হবে কি না? তবে তারা এটা বেশ বুঝতে পারেন অনেকটা আয় থেকে দায় শোধ করা প্রতিষ্ঠান তাদের, তাই হয়তো বেতনটা কিছুটা হলেও অনিশ্চিত।

সরকার জীবন আর জীবিকার সমন্বয় সাধনে মার্কেট আর শপিং মল খুলে দিয়েছে। এবার গণপরিবহন এবং সরকারি ও বেসরকারি অফিস খুলে দেয়ার বিষয়েও ভাবতে হবে। হুট করে সব একসাথে চালু না করে, ধীরে ধীরে ও ক্রমান্বয়ে চালুর কথা ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর গণপরিবহন রোস্টার ভিত্তিতে চালানো। অর্থাৎ একটি কোম্পানির যত গাড়িই থাকুক না কেন তার এক তৃতীয়াংশ আগামী ২ মে থেকে চলার অনুমতি দেয়া হোক।
আন্ত:জেলা ও আন্ত:নগর বাসগুলো (দূরপাল্লার বাস) ও অনুরূপভাবে চলার অনুমতি দেয়া। অর্থাৎ প্রতিটি কোম্পানির গাড়ি এক তৃতীয়াংশ করে চলাচলের অনুমতি দেয়া।
গাড়িতে প্রতি ২ আসনে এক যাত্রীর নিয়ম মানতে বাধ্য করা। এক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার করা।
মানুষকে করোনার হাত থেকে বাঁচাতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের সাথে দ্বিমত করার সুযোগ নেই, এইসব পদক্ষেপ বহাল রেখেই মানুষ যাতে জীবিকার সন্ধান করতে পারে সে জন্য সরকারকে অবশ্যই সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।