৬ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জার্মানির চিঠি-১১

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১ ২:৪৯ অপরাহ্ণ

28

বুলবুল ভাই ও এক রাতের অম্লান স্মৃতি

বার্লিনে ডিআইডির আমন্ত্রনে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে এসেছি। ঢাকার ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে এসে পড়েছি মাইনাস ৩ ডিগ্রীতে।প্রচন্ড ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি। গায়ে লম্বা এবং কম্বলের মতো মোটা একটা কোট, মাথায় টুপি, গলায় মাফলার পরা সত্ত্বেও রীতিমতন কাঁপিয়ে দিয়েছে। এখানে
শীতকালে দিন খুবই ছোট। সূর্যের আলো থাকে সকাল ন’টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। সেই বছর খুব বরফও পড়েছিল মনে আছে।

বার্লিনে বেশ ক’দিন খুব কর্মব্যস্ততায় কেটেছে। সকাল থেকে বিকেল অবধি এই সেমিনার, সেই ওয়ার্কশপে লেকচার শুনে শুনে ক্লান্ত। সারাদিন একটুও দম ফেলার ফুরসৎ পাইনি। টানা তিনদিন এই করে কাটলো। চতুর্থ দিন লাঞ্চের আগেই সমাপনী অনুষ্ঠান ও লাঞ্চপার্টিতেই বিদায় জানান ডিআইডির মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর হ্যাঞ্চ বাখ।

পার্টি শেষ না করে আমরুমার স্ট্রাসের বাসায় ফিরেই আবার দৌড়। আমাকে বাস ধরতে হবে। দুইটায় ফ্লেক্সি বাস ছেড়ে যাবে জার্মানীর বাণিজ্যিক নগরী ফ্রাংকফুর্টের উদ্দেশ্যে। দুইদিন আগেই অনলাইনে টিকেট কাটা, সিট কনফার্ম করে রেখেছিলাম। ফ্রাংকফুর্টের বাবুলভাইয়ের বাসায় রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে ঢাকার পথে বিমানে চড়বো। হাতে মাত্র কুড়ি মিনিট সময়। বাস মিস হলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার ঢাকায় ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত ট্যাক্সি ডেকে রওয়ানা দেই সেন্ট্রাল বানহাফের দিকে। ভাগ্য সহায় ছিল বলে পথে কোন ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হয়নি। এমনিতে বার্লিনে কোন জ্যাম হয় না। কিন্তু অফিস টাইমে মাঝে মাঝে ছোটখাটো জ্যাম হয়। তবে সেই সব জ্যাম ঢাকার মতন দীর্ঘ ও বিরক্তিকর নয়। ২/৪ মিনিটের মধ্যেই জ্যাম মুক্ত হয়ে যায়।

আগেই বলেছি এবার বার্লিনে দারুন ব্যস্ততায় কেটেছে। কোথাও তেমন ঘোরাফেরা হয়নি। অবশ্য বার্লিনে আমার নতুন করে দেখার কিছু নেই। গত কয়েক বছরে ৮/৯বার বার্লিন ট্রাভেলিং করায় মোটামুটি সবই দেখা ও ঘোরা হয়ে গেছে। এমন কি পরিচিত অনেকের সাথে দেখা করতে পারিনি। বেশ ক’টি দাওয়াত ফিরিয়ে দিতে হয়েছে। তাদের আন্তরিকতা ও উষ্ণ ভালবাসা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বেশ খারাপও লেগেছে।

ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলেছিলাম, যেভাবে পারো আমাকে দুইটার আগে স্টেশানে পৌছে দাও। ইরানীয়ান ড্রাইভার নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিল, ইনশাআল্লাহ।

জ্যামের সম্ভাবনা চিন্তা করে সে একটু ঘুরপথে সেন্ট্রাল বানহাফে ঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে হাফ ছেড়ে বাঁচি। বাস ছেড়ে যাবার তখনো ৭/৮ মিনিট বাকী। ল্যাগেজ বক্সে দিয়ে নীচে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে সিগারেট টেনে বাসে উঠে বসি। সাড়ে পাঁচ ঘন্টার জার্নি। ক’দিনের ব্যস্ততায় শরীর ভীষন ক্লান্ত। বাস ছাড়তে রাজ্যের ঘুম দু’চোখ জুড়ে নেমে আসে।

ফ্রাংকফুর্টে আমি প্রথম এসেছিলাম ২০০৮ সালে। এরপর প্রতি বছরই ১/২ বার করে মোট ৮/৯ বার আসা যাওয়া হয়েছে। এই শহর অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেইগুলো নিয়ে পরে হয়তো কখনো লিখবো। তার আগে শহরটি সম্পর্কে একটা ছোট ধারনা দিচ্ছি।

জার্মানীর ফেডারেল স্টেট হেসে’র অন্যতম শহর হচ্ছে ফ্রাংকফুর্ট। যা মধ্য জার্মানির হৃদয়ে অবস্থিত। এই শহরটিকে বলা হয় ইউরোপের আর্থনীতির কেন্দ্র।এখানে রয়েছে জার্মান স্টক এক্সচেঞ্জ, জার্মান ফেডারেল ব্যাংক,ফ্রাংকফুর্ট স্টক এক্সচেঞ্জ, ডয়েচ ব্যাংক, ডিজি ব্যাংক, কেএফডাব্লিউ, কমার্স ব্যাংক
এবং ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ও বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার DE-CIX এর প্রধান কার্যালয়। তাই বলে শহরটি কাঠখোট্টা বাণিজ্য নিয়েই পড়ে নেই। ছুটি কাটানোর গন্তব্য হিসেবে ভ্রমণকারীদের জন্য আরও অনেক কিছুর ডালি সাঁজিয়ে বসে আছে।
‘ Messe Frankfurt’ বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য মেলা ছাড়াও প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বের বৃহত্তম মোটর শো, মিউজিক ফেয়ার এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা ।

বার্লিন,মিউনিখ,হামবুর্গ,স্টুর্টগার্টের পরে ফ্রাংকফুর্ট হচ্ছে জার্মানির ৫ম বৃহত্তম শহর । ফ্রাংকফুর্ট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হল জার্মানির সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর। লন্ডনের হিথ্রো’র পরে ইউরোপে দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর।

সন্ধ্যা ৭ টায় ফ্রাংকফুর্ট বানহাফে বাস থামার কিছুক্ষন আগে আমার ঘুম ভাঙ্গে।
বাস থেকে নীচে নেমে আসতেই ভয়ংকর ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগলো। গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। মুহুর্তে ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি, তার ওপর আবার বরফ পরার কথা রাতের দিকে। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিন্দুমাত্র অনাবৃত স্থান নেই মুখমন্ডল ছাড়া। এদিকে বুলবুলভাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তীব্র ঠান্ডা উপেক্ষা করে। আমাকে দেখামাত্রই উষ্ণ আলিংগনে জড়িয়ে ধরেন। অথচ উনার সাথে আমার এই প্রথম দেখা। ফেসবুকে মাঝেমাঝে কথা হতো। তিনি ঠিকই আমাকে চিনে নেন। বুলবুলভাইয়ের ছোটভাই ইকবাল আমার বাল্যবন্ধু। ইকবালের সুত্রে চাষাড়ায় তাদের বাড়িতে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বড় আপা, মেঝো আপা, ছোট আপাসহ খালু-খালা সবার স্নেহ ভালোবাসাই পেয়েছি। বাকী ছিলেন বড়ভাই, বুলবুলভাইয়ের সাথে দেখা হওয়া। বুলবুলভাইর দীর্ঘ প্রবাস জীবন, দেশে না আসায় দেখা হচ্ছিল না।

বাসস্টেশনে আলিংগন থেকে মুক্ত করেই বুলবুলভাই আমাকে দাঁড় করিয়ে কফি নিয়ে আসেন।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে কত গল্প, কত জোকস,কত গানের অংশবিশেষ শুনিয়ে তিনি ২০ মিনিট মাতিয়ে রাখলেন। আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানো স্থানীয় এক বয়স্ক মহিলা, তাঁরও আপাদমস্তক ঢাকা। এদেশের বয়স্ক মানুষরা অনেকেই জার্মান ছাড়া আর কোন ভাষা জানেন না। তিনি আমাদের কথা ও উচ্চস্বরে হাসাহাসি শুনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেন। আসলে জার্মানরা অত্যন্ত শান্ত ও নীচুস্বরে কথা বলেন। তাদের কাছে আমাদের উচ্চকিত কন্ঠে কথাবার্তা বিস্মিত করে।

একসময় সিটিবাস এলে আমরা চেপে বসি বাবুল ভাইয়ের বাসার উদ্দ্যেশে। এরমাঝে বেশ ক’বার বাবুলভাইয়ের স্ত্রী, মাতৃতুল্য সোমাভাবী বুলবুলভাইকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন আমরা কতদুর।
বাবুলভাই, সোমাভাবীর কাছে শুনেছি ফ্রাংকফুর্টে বুলবুলভাই বাংলাদেশী কমিউনিটির পুরানোদের কাছে ‘নানা’ নামে সমাধিক পরিচিত ।

মিনিট দশেক পরে সিটিবাস বাবুলভাইয়ের বাসার সামনে নামিয়ে দেয়। ফ্রাংকফুর্ট শহরের সামান্য দূরত্বে বাবুলভাইয়ের বাসা। চারিদিক কেমন শান্ত নিরিবিলি।লোকবসতি খুবই কম।

ফ্রেশ হয়ে বাবুলভাইয়ের ড্রইংরুমে আমাদের তুমুল আড্ডা জমে। বুলবুলভাই জোকস, গান, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প সাহিত্য নিয়ে তর্ক, আড্ডায় মাতিয়ে রাখেন। ফাঁকে ফাঁকে চলে এটা সেটা কতকিছু খাওয়া। রাত ১০টায় সোমাভাবীর রান্নাকরা নানান পদের খাবার খেয়ে গভীর রাতে আড্ডায় রনেভংগ দিতে হয়। পরের দিন আমার ঢাকায় ফেরার ফ্লাইট। তাই রাত সোয়া দুইটায় বাবুলভাইয়ের গাড়িতে বুলবুলভাইকে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আসি ।

২.
জার্মানীতে বুলবুলভাইয়ের সাথে এটাই আমার শেষ দেখা। দেশে ফেরার ৫ কি ৬ মাস পর দ্বিতীয়বার দেখা হয় চাষাড়ায়। তখন রিক্সায় তিনি বড় আপার সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন। আমাকে সোনারগাঁ কনফেকশনারির সামনে দেখে চিৎকার করে ডাকলেন,হাই রনি।
কে জানতো সেই সন্ধ্যা হবে আমাদের শেষ দেখা ও শেষ কুশল বিনিময়?
আমি কানাডায় আসার পর কালেভদ্রে যোগাযোগটা হতো।কিন্তু ২০১৮ সালের জুলাই মাসের ( তারিখটা মনে পড়ছে না) একদিন দুপুরে ভাত ঘুম ভাংলো জার্মান থেকে বাবুলভাইয়ের ফোনে। বুলবুলভাই নেই এই দুঃসংবাদটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করতে কস্ট হচ্ছিল এমন তরতাজা মানুষটিকে আর কখনো দেখবো না!
বুলবুলভাই,খুব মনে পড়ে আপনার পাঠানো গানের লিংকগুলো। খুব মিস করি আপনার ছাদকাঁপানো অট্টহাসি।
ফ্রাংকফুর্টে বাবুলভাইয়ের বাসায় সেই রাত্রির দীর্ঘ আড্ডায় আপনার সানিধ্য আমৃত্যু আমার স্মরনে থাকবে। অনন্তলোকে ভাল থাকবেন বড়ভাই।