২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জার্মানির চিঠি-১০

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১ ১:৩২ অপরাহ্ণ

36

আক্কেল সেলামী!

২০১৩ সালের জুন মাসের ঘটনা। আমি জার্মানীর বার্লিনে গিয়েছি ইউরোশিয়া ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রনে।সাধারনত বার্লিনে গেলে আমরুমারস্ট্রাসে জসিমভাইয়ের বাসায় উঠি। সেখানে মোর্শেদ,সানিও থাকে। ওদের সাথে দেখা হলে গল্পে, আড্ডায় ক’টা দিন ভাল কেটে যায়। ওদের সংস্পর্শে হোমসিকনেসটা টের পাই না।।সেবার গিয়ে দেখি সানি মাত্র ক’দিন আগে দেশে গিয়েছে। মোর্শেদ গিয়েছে পোল্যান্ডে মনিরভাইয়ের কাছে। জসিমভাই সামারে কাজ নিয়ে তখন খুবই ব্যস্ত। এতো ব্যস্ততার মাঝেও ভোরবেলায় আমাকে বার্লিনের শনিফিল্ড এয়ারপোর্টে রিসিভ করেন। বাসায় এসে গোসল করে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে লম্বা ঘুম দেই।

সকালে জসিম ভাই কাজে যাবার আগে বাসার ডুপ্লিকেট চাবি দেন। বিকেলে একজন এসে আমাকে মাসুদভাইয়ের রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবেন।

আমার ঘুম ভাংগে ছেলেটির কলিংবেলে। লম্বা একহারা শ্যামলা রংগের ছেলেটির বাড়ি বিক্রমপুর। স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে কয়েক মাস আগে। এ মুহুর্তে ছেলেটির নাম মনে পড়ছে না। তাকে বসিয়ে আমি ফ্রেশ হই ।বাসার ৩০ গজের মধ্যে আমরুমারস্ট্রাসে এসবান ( মেট্রো স্টেশন)। ধীরেসুস্থে রেডি হয়ে নীচে নামতে ছেলেটির তাড়াহুড়ো বেড়ে যায়।

  • ভাইয়া দ্রুত এস্কেলেটরে নামেন। ১ মিনিট আছে মেট্রো আসতে।

ছেলেটি দ্রুতগতিতে এস্কেলেটরের সিড়ি ভেংগে প্লাটফর্মে দাঁড়াতে মেট্রো চলে এলো। আমি কিছু বলার আগেই মেট্রোর ভেতর ঢুকতে হল। ৩০/৪০ সেকেন্ড পর মেট্রোর গেট বন্ধ হয়ে চলতে শুরু করে।
এক স্টপেজ পেরিয়ে যাবার পরই বিপদ নেমে এলো। অফিস ফেরত মানুষের ভীড় থাকায় দাঁড়ানোর যাচ্ছিলো না। সেখানে ভাগ্যক্রমে আমি বসার জায়গা পেয়ে যাই।
এসময় হঠাৎ দু’জন সিভিল পোষাকের টিকেট কন্ট্রোলার বা চেকার আমার সামনে এসে দাঁড়ায়।টিকেট দেখতে চাইলো।আমি আমার সাথের ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিগেস করি,তুমি কি আমার টিকেট কাটোনি?

  • না ভাইয়া। আমার কাছে তো মান্থলি পাস।
    সাধারনত আমি বার্লিন এলে জসিমভাই,মোর্শেদ, সানির সাথে কোথাও গেলে ওরাই সবসময় টিকেট কেটে নিত। কখনো আমাকে কাটতে দিত না। ছেলেটির তাড়াহুড়োয় আমি তাকে জিগেস পর্যন্ত করতে পারিনি, টিকেট কেটেছে কিনা। অন্য সময় প্লাটফর্মে ঢোকার আগে আমি সবাইকে জিগেস করে নিতাম টিকেটের কথা। এ ছেলেটার এত তাড়াহুড়ো ও ব্যস্ততার জন্য আমাকে সাংঘাতিক বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখিন হতে হল। চেকারদ্বয় অন্যদের টিকেট চেক করে আবার আমাকে জিগেস করে, ডু হ্যাভ টিকেট?
  • সরি। আই হ্যাভ নো টিকেট।বাট আই ওয়ান্ট টু পে ফর টিকেট।প্লিজ গিভ মি এ চান্স।
  • ওকে। ডু হ্যাভ পাস?
    -ইয়েস।
    বলেই আমি জ্যাকেটের ইনার পকেট হতে পাসপোর্ট বের করে দেই। চেকারদ্বয় পাসপোর্ট হাতে নিয়ে পরের স্টপেজে নামার জন্য অনুরোধ করল। নামতে আমার কোন অসুবিধে নেই। কিন্তু ছেলেটার বোকামি ও ব্যস্ততার কারনে কি ভুলের ফাঁদে পড়ে গেলাম! আমার তখন রাগে অপমানে গা কাঁপছে।

পরের স্টপেজে চেকারদের পিছু পিছু নেমে আসি। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ভাল করে পাসপোর্টের পাতা উলটে বলল, তুমি তো আজই এসেছো।
মাথা নাড়তে আবার বলল, ঠিক আছে। তোমার ফাইন লিখে দিচ্ছি। ১ মাসের মধ্যে ৪০ ইউরো পরিশোধ করতে হবে ডয়েচ পোস্টের যে কোন ব্রাঞ্চে।
আমি সাথে সাথে বললাম, দেখো আমি ৩ দিন পর চলে যাব।আমার ব্যস্ততাও আছে। ক্যান আই পে রাইট নাও?
চেকার মৃদূ হেসে বলল, নো ম্যান, ইউ কান্ট। ইউ হ্যাভ টু গো ডয়েচ পোস্ট টুমোরো। ইট উইল বি ফাইন।
ওরা কথা না বাড়িয়ে ফাইনের রিসিট ও পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিল।

ভীষন মন খারাপ নিয়ে এসবানের টিকেট কাউন্টারে গিয়ে ৩ ইউরোতে টিকেট কিনে আবার মেট্রোতে চেপে বসি। মাসুদভাইয়ের রেস্টুরেন্টে যাবার সারাটা পথ ছেলেটি ভয়ে আমার সাথে কথা বলার সাহস পায়নি।আমার থেকে একটু দুরের সীটে বসেছিল।

বাসায় ফিরে রাতে ভাল ঘুম হলো না। দীর্ঘ দিন ইউরোপ,এশিয়া, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে যাই। কখনো আইন অমান্য বা এমন বিব্রতকর ঘটনার মুখোমুখি হইনি। ছেলেটার সামান্য তাড়াহুড়োয় আমাকে এ অনাকাংখিত ঘটনায় পড়তে হলো।

পরের দিন খুব সকালে ঘুম ভাংগতে জসিম ভাই বাসার নীচে ক্যাফেতে নিয়ে গেলেন নাস্তা করার জন্য। দু’জনেই দ্রুত নাস্তা সেরে ডয়েচ পোস্ট অফিসে যাই। জরিমানার ৪০ ইউরো পরিশোধ করে দেয়ার পর মানসিক শান্তি পেলাম। সেদিনই কানে ধরেছি কারো সাথে কোথাও গেলে আর তাড়াহুড়োর ফাঁদে পা দিব না।