১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন জরুরী

আপডেট : ডিসেম্বর ৩, ২০২০ ১১:৩৩ অপরাহ্ণ

317

গুলশান ঝুমুর

তামাকজাত দ্রব্য প্রতি বছর লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। বিশ্বে জুড়ে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান ৮টি কারণের মধ্যে ৬টির সাথেই তামাক জড়িত। ২০০৩ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরিত হয়। এই ভয়ানক ক্ষতি প্রতিরোধে এফসিটিসি একটি অনন্য দলিল। এর আলোকে বাংলাদেশে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) আইন-২০০৫ প্রনয়ণ করা হয়। ২০১৩ সালে এই আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। ২০১৫ সালে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) বিধিমালা প্রনয়ণ করা হয়। এই আইনে পাবলিক প্লেস ও গনপরিবহনে ধুমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু বিদ্যমান আইনে বেশ কিছু দুর্বলতা তামাক নিয়ন্ত্রনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) আইনে গনপরিবহন ও রেস্তোরাসমূহে ক্ষেত্র বিশেষ ধুমপানের সুযোগ রয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ৪(১) অনুসারে, কোন ব্যক্তি কোন পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক পরিবহনে ধুমপান করতে পারবে না। আবার নিম্নোক্ত বেশকিছু ক্ষেত্রে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধুমপানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন- চার দেওয়ালে আবদ্ধ নয় এমন রেস্তোরা, কোন কোন পাবলিক প্লেসে নির্ধারিত এলাকায় ধুমপান, একাধিক কক্ষবিশিষ্ট গনপরিবহন, সবধরনের অযান্ত্রিক পাবলিক পরিবহন। আইনের এই নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে।
বর্তমানে অনেক হোটেল, রেস্তোরা, কফিশপ ইত্যাদি রয়েছে যেগুলোর চারপাশ দেওয়াল দ্বারা আবদ্ধ নয়। এসব জায়গাকে খুব সহজেই ধুমপানমুক্ত করা যায়। এসব জায়গাসহ সকল পাবলিক প্লেস ও গনপরিবহণে ধুমপানসহ যেকোন ধরনের তামাক ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। বিভিন্ন ভবনকে ধুমপানমুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কোন ভবন ধুমপানমুক্ত বলতে আমরা সেই ভবনের বারান্দা ও সকল আচ্ছাদিত স্থানকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলবো। পাবলিক প্লেসকে শতভাগ ধুমপানমুক্ত করতে পারলে অধুমপায়ীদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৮৫% পর্যন্ত কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর ১১ ও ১৩ ধারায় প্লেইন প্যাকেজিং প্রথা বাস্তবায়নের কথা বলা হয় এবং ২০১২ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়াতে এই পদ্ধতি চালু হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স প্লেইন প্যাকেজিং বাস্তবায়ন শুরু করে। এছাড়াও আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, হাঙ্গেরী, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও দক্ষিন আফ্রিকা প্লেইন প্যাকেজিং প্রবর্তন করেছে। তামাক পণ্যে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন প্লেইন প্যাকেজিং প্রবর্তনের অন্যতম প্রধান ধাপ।
২০১৫ সালের এই বিধিমালায় উল্ল্যেখযোগ্য আরেকটি দিক হল, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতা বার্তা মুদ্রণ নিশ্চিত করা। ধারা ১০-এর (১) অনুসারে, তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টুন বা কৌটার উভয় পার্শ্বে বা মূল প্রদর্শনী তলের উপরিভাগে ৫০% জুড়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচিত্র সতর্কতা বাণী বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাংলায় মুদ্রণ করতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান আইনের কিছু দুর্বলতার কারনে এখানেও নিয়ন্ত্রন বাঁধা পাচ্ছে।

বাংলাদেশে সকল তামাক পণ্যের মোড়কের উপরের ৫০ শতাংশ যায়গা জুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হলেও তামাক বিরোধী সংগঠনসমূহের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ তামাক পণ্যই সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ছাড়াই বাজারজাত করা হচ্ছে। কাজেই প্লেইন প্যাকেজিং প্রথা প্রবর্তনে বাংলাদেশকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমান আইনে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টুনের আকার/আয়তন কেমন হবে এবং এরমধ্যে নূন্যতম কী পরিমান তামাকজাত দ্রব্য থাকবে সেটা বলা আছে। কিন্তু সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতা বার্তার আকার ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৯০% করে দিলে সাধারন ধুমপায়ীদের জন্য ভালো হবে। উরুগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত গবেষনায় দেখা গেছে, সচিত্র সতর্কতা বার্তার আকার বাড়ানো হলে ব্যবহারকারীরা স্বাস্থ্যক্ষতির বিষয় ভাবতে বাধ্য হয়।

তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হবার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদ্যমান আইনে ই-সিগারেট ও হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টের মতো নতুন ধরনের তামাকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। তাছাড়া ই-সিগারেটের মতো এমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টেসমুহ আমদানী ও বিক্রয় বা নিষিদ্ধের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়াটা জনস্বাস্থ্যে অনেক বড় ঝুঁকি মধ্যে পড়ছে। এই আইনের আরো একটি দিক হলো, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারনা নিষিদ্ধ এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রন। ধারা ৫-এর ব্যাখ্যায় এর উপধারা (১) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে “তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার” বিক্রয় কেন্দ্রে প্রোডাক্ট ডিসপ্লে বা পণ্য প্রদর্শনী নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এই সীমাবদ্ধতা কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাখায় সংযোজন করতে হবে, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের কোনরূপ প্রদর্শনও বানিজ্যিক কার্যক্রম বলে বিবেচিত হবে।

৭৭টি দেশে তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার ফলে দৈনিক ধুমপানের প্রবণতা প্রায় ৭% হ্রাস পায়। তামাক নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রন আইনটি এফসিটিসির সাথে অনেকাংশে মিল থাকলেও কিছু জায়গাতে দুর্বলতা রয়েছে।

২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারী ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিন এশীয় স্পিকার্স সম্মেলনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেল থেকে তামাক ব্যবহার নির্মুল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এজন্য তামাক নিয়ন্ত্রন আইন এফসিটিসির সাথে মিল রেখে সংশোধন করারও ঘোষনা দেন। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতাসমুহ নিরসনের লক্ষ্যে এফসিটিসির সাথে মিল রেখে আইন সংশোধন করা হলে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ সম্ভব হবে। যা জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাসে ভুমিকা রাখার পাশাপাশি ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবে।

লেখক: মনিটরিং এন্ড ডকুমেন্টেশন কর্মকর্তা, ভয়েস। ঢাকা।




ছবি