৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চলে গেলেন, বলে গেলেন না

আপডেট : জুলাই ২২, ২০২০ ৬:১৩ অপরাহ্ণ

44

মাসুদ কামাল

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করার খবরটি প্রচারিত হওয়ার ঘন্টা কয়েক পর এক ফেসবুক ফ্রেন্ডের মেসেজ পেলাম। তিনি লিখেছেন- কি, এবার খুশি তো? বলেছিলাম না, এই সরকারের আমলে দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।
আমি বুঝতে পারলাম না, ওনার কেন মনে হলো যে- মহাপরিচালক পদত্যাগ করলে আমি খুশি হবো? আমি কি কখনো ওনার পদত্যাগ চেয়েছিলাম? কেউ কি চেয়েছিল? আমরা আসলে সাজা চেয়েছিলাম। তাও কোন একজন মাত্র ব্যক্তির নয়। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকলের কঠোরতম শাস্তি কামনা করেছিলাম।
আচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক কোন দুর্নীতি কি একা একা করা সম্ভব? একটা ঘটনার কথা বরং উল্লেখ করা যাক। সেই যে এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে দুর্নীতি সেটা আসলে কে করেছিল? জেএমআই নামের একটা প্রতিষ্ঠান সাপ্লাই দিয়েছিল। জেএমআই কিন্তু নতুন কোন প্রতিষ্ঠান নয়, এরা অনেকদিন ধরে নিয়মিতভাবে সরকারকে স্বাস্থ্য বিষয়ক সামগ্রী সরবরাহ করে। তারা ভালোভাবেই জানে কিভাবে কি দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে থাকে। সেভাবেই দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তা গ্রহণও করেছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল। তাতে কাজ না হলে, ওই এলাকার সংসদ সদস্য। তাতেও কিন্তু কাজ হচ্ছিল না। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি হতে থাকে। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক হুমকি দেন সকলের বিরুদ্ধে মামলা করার। পরে পুরো বিষয়টিই পাল্টে যায় খোদ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে। এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গটি তোলেন। তখনও দেখা যায়- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে নানা অজুহাত দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্তকমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয়। সেই রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পুরো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পড়ে দেখার সময় পাননি। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালককে বদলি করা হয়। বদলি করা হয় সংশ্লিষ্ট সচিবকে। এই বদলিগুলো কি সাজা? সাজা যে মোটেই নয়, তা পরিষ্কার হয়ে যায় যখন দেখা যায় বদলি হওয়া সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র সচিব করা হলো। ওই একই সময়ে স্বাস্থ্য সামগ্রী সরবরাহকারী ১৪ টি প্রতিষ্ঠানকে সরকার কালো তালিকাভূক্ত করে, কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে এর মধ্যে জেএমআই নেই!
এন-৯৫ মাস্ক দুর্নীতিতে সাজা যে কারও হয়নি তা নয়, উল্টো সাজা হয়েছে। ওই যে মুগদা হাসপাতাল, মাস্ক নিয়ে অভিযোগ করেছিল, তার সে সময়ের পরিচালক মোঃ সাদিকুল ইসলামকে ওএসডি করা হয়েছে। মাস্ক নিয়ে সচিব ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সত্য যে বলেননি, সেটা বিটিভির কল্যাণে পুরো জাতি দেখেছে। সেই কথাটিই নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেসবুকে লিখেছিলেন নোয়াখালী জেলা হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা ডাঃ আবু তাহের। এজন্য তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। কেবল তাই নয়, এরপর যাতে কোন সরকারি চাকরিজীবী সোশ্যাল মিডিয়াতে এরকম কিছু লিখতে না পারেন, তার জন্য নতুন নির্দেশনা জারী করা হয়েছে।
যে দেশে অন্যায়- অনিয়মের প্রতিবাদ করলে সাজা হয়, সেখানে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি হবে, অথবা অপরাধটি সঙ্গে কারা কারা জড়িত ছিল তা খুঁজে বের করা হবে- এমন আশা করাটাই অন্যায়। রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি আর অনিয়ম এখন সারা দুনিয়ার মানুষ জানে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এটা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। দেশের মান সম্মান তো গেছেই, সেই সঙ্গে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যারা জড়িত, তারাও বিপদে পড়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালের মোঃ সাহেদ যে সব দুর্নীতি করেছে, সেটা কি সে একা একাই করেছে? দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের ভাগ কি কেউ পায়নি? তার কাছ থেকে কামিনী বা কাঞ্চন, ক্যাশ বা কাইন্ড অনেকেই পেয়েছে- এমন সন্দেহ সাধারণ মানুষ করতেই পারে। সে সন্দেহ নিরসনের জন্য কি কাজ করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়?
মানুষ আশা করেছিল- রিজেন্ট হাসপাতাল বা জিকেজি কেলেংকারীর পর সরকার দেশে এবং বিদেশে নিজের মুখ রক্ষার চেষ্টা করবে, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কঠোরতম সাজা দেবে। তা কি হলো? বরং দেখা গেল উল্টা চিত্র। একটা হাসপাতালের কোন লাইসেন্স নাই, অর্থাৎ যার কোন ধরনের চিকিৎসা করারই অনুমতি নেই, তার সঙ্গে সরকার করোনা চিকিৎসা করানোর জন্য চুক্তি করে কিভাবে? অধিদফতর দায় চাপালো মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। বললো- তাদের নির্দেশেই তারা চুক্তি করেছে। আর বিপরীত দিকে মন্ত্রণালয় দায় চাপালো অধিদফতরের উপর। বললো- অধিদফতরের অনুরোধের চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সেখানে মন্ত্রী ও সচিব উপস্থিত ছিলেন! অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বললেন- আগের সচিবের মৌখিক নির্দেশে তারা চুক্তি করে। এভাবে দিন কয়েক দেখা গেল, একে অপরের প্রতি দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা। যেন এক টম অ্যান্ড জেরির কার্টুন!
কার্টুন ভালোই চলছিল, এর মধ্যেই হঠাৎ ছন্দপতন- মহাপরিচালকের পদত্যাগ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই লোকের পদত্যাগের ফলে আমাদের কি লাভ হলো? দুনিয়াজোড়া আমাদের যে বদনাম হয়েছে, সেটা এখন উদ্ধার হবে? কিংবা সাহেদ-সাবরিনা গংদের কারণে যত মানুষের ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হবে? তাছাড়া, এই পদত্যাগে প্রমাণই বা কি হলো? প্রমাণ কি হলো- পুরো কেলেংকারীর জন্য এই এক মহাপরিচালকই দায়ী? তিনি একাই সব ঝামেলা করেছেন? মোঃ সাহেদ বা ডাঃ সাবরিনার প্রতি কোন ভালোবাসা মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় বা আমলাদের ছিল না?
হাসপাতালের লাইসেন্স আছে কি নেই, সেটা দেখার দায়িত্ব পরিচালক (হাসপাতাল) এর। তাহলে কি অধস্তন পরিচালকের ব্যর্থতার দায় মহাপরিচালক নিজের কাঁধে নিয়েছেন? এটা কিন্তু হতে পারে। সেন্সেবল ব্যক্তিরা এরকম আচরণ করে থাকেন। তাহলে এতদিন যে তিনি মন্ত্রণালয়কে দায়ী করে এসেছেন- তার কি হবে? পরিচালকের ব্যর্থতার দায় যদি মহাপরিচালক নিতে পারেন, তাহলে সে দায় আরও উপরে থাকা সচিব বা মন্ত্রীকেই বা স্বস্তি দেয় কিভাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর আদৌ কখনো পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই যে এতদিন মহাপরিচালক বিপ্লবী সব বক্তব্য দিলেন, উপরের নির্দেশের কথা বললেন, তার এই পদত্যাগের পর সেসব নিশ্চয়ই এখন ধামাচাপা পড়ে যাবে। মহাপরিচালককে বলির পাঠা বানিয়ে এখন হয়তো অন্য রাঘব বোয়ালরা রেহাই পেতে চেষ্টা করবেন। মহাপরিচালক নিজে কি মনে করেন যে, এক পদত্যাগই তাকে সকল দায় থেকে মুক্তি দেবে? যদি তেমন কিছু মনে করে থাকেন, ভাবতে হবে- তিনি তাহলে মূর্খের স্বর্গে বাস করেন। অথচ পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত যখন নিতেই পেরেছিলেন, তখন তিনি ডিটেইলে প্রকৃত সত্যগুলো প্রকাশ করে দিয়ে গেলে পারতেন। সেক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা হলেও পাপমোচন হতো।
তবে এরও চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- পদত্যাগ কি কোন শাস্তি? পদত্যাগ মানে কি- মহাপরিচালক এখন থেকে আর সরকারি চাকরিতে থাকবেন না? নিশ্চয়ই তিনি কোন না কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানেই এখন যাবেন। কে জানে, মন্ত্রী বা সচিবকে আরও বড় কোন বিব্রতকর প্রশ্ন থেকে রেহাই দেওয়ার লক্ষ্যে এই যে তার ‘মহান আত্মত্যাগ’ এর জন্য তিনি পুরস্কৃতও হবেন। সবই সম্ভব এই দেশে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *