২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

গ্ল্যাডিয়েটরের যুগে ফেরা!

আপডেট : নভেম্বর ৩০, ২০২০ ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

54

আব্দুর রহমান

গ্ল্যাডিয়েটর! শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুঠামদেহী শক্তিধর পুরুষ কিংবা নারীর প্রতিচ্ছবি যারা একে অন্যরে সাথে মুখোমুখি হতো ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের জন্য। গ্ল্যাডিয়েটররা একে অন্যের সাথে লড়াই করতো তবে তা শুধু একটি লড়াইয়ে জেতার লড়াই ছিল না, ছিল জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াইও। কেন না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরাস্ত গ্ল্যাডিয়েটরের ভাগ্যে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। লড়াই করতে করতে মারা যাওয়ার বিষয়টি তো ছিলই তবে সবচে’ ভয়ংকর যেটা ছিল তা হচ্ছে আহত গ্ল্যাডিয়েটরকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি না তা নির্ভর করতো করতো রাজার ওপর। ক্ষ্যাপাটে গ্ল্যাডিয়েটর তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতো নির্মমভাবে। একজন গ্ল্যাডিয়েটর যতই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত ততই বাড়তো দর্শকদের বুনো আর উগ্র উল্লাস। মানুষের হাতে মানুষ মারা যাওয়ার কিংবা পশুর সাথে লড়াইয়ে মানুষের জান হারানোটাই খেলার সবচে উত্তেজনাকর মূহুর্ত ছিল।
আজ গ্ল্যাডিয়েটর নেই, নেই সেই মরনপণ লড়াইও, কিন্তু মানুষের ভেতরকার সেই বুনো স্বভাব! সম্ভবত: তা রয়ে গেছে পুরোপুরিই। এখনকার মানুষের হিংস্রতা আর বর্বরতা কখনো কখনো গ্ল্যাডিয়েটরের সময়ের হিংস্রতাকেও ছাড়িয়ে যায়। মানুষ এখন শুধু মানুষকে মেরে বা হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় না। লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলে। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী শামসুল আলম ও তার ছেলেকে হত্যা করে তাদের লাশ টুকরো টুকরো করে ছিটিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল বিমান বন্দর সড়কের রাস্তার পাশে। গেন্ডারিয়ার মুরগীটোলায় মহসিন ও সায়েম নামে দুই যুবককে হত্যা করে তাদের লাশ টুকরো করে বস্তায় ভরে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এমন হত্যাকান্ডের অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।

চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রাসু খাঁ ১১জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এরশাদ শিকদার মানুষ মারতো বুকে পা দিয়ে চাপ দিয়ে, মানুষ মারার সময় নাকি সে গান গাইতো ‘আমি তো মরেই যাবো’। এরপর লাশ পানিতে ফেলে দিতো সিমেন্টের বস্তার সাথে বেধে।
২০১২ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে হিমাদ্রী মজুমদার নামে এক কিশোরকে হত্যা করা হয়। তাকে একটি চারতলা ভবনের ছাদে আটকে, তার দিকে ছেড়ে দেয়া হয় জার্মানির কুকুর। কুকুরের ভয়ে সে জীবন বাঁচাতে রেলিং এর ওপর বসে, সেখান থেকে তাকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়া হয়।
রাজধানীর অদূরে সাভারে একবার শবেবরাতের রাতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ৬ কিশোরকে। স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয় এলাকায় ডাকাত পড়েছে, এরপর গ্রামের মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পিটিয়ে হত্যা করে ওই কিশোরদের। তারা রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতো, শবেবরাতের রাতে ঘুরতেই ঢাকার পাশের ওই এলাকায় গিয়েছিল তারা।

গত বছর দেশে ছেলেধরার গুজব উঠিয়ে বেশ কয়েকজন মানুষকে হত্যা করা হয়। রাজধানীর বাড্ডায় নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় গৃহবধূ রেনুকে। পরে জানা যায়, সে সেখানকার একটি স্কুলে গিয়েছিল সন্তানকে ভর্তির ব্যাপারে তথ্য জানতে। গত ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় লালমনিরজাটের বুড়িমারীর পাটগ্রামে মসজিদে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে রংপুরের শালবন এলাকার বাসিন্দা আবু ইউনুছ মোহাম্মদ সহীদুন্নবীকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
যখন একদল মানুষ আরেকজন কিংবা কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করে কিংবা আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন কি সবার ভেতরেই পশুত্ব ভর করে! হয়তো তাই, না হলে না মারা যাওযা পর্যন্ত কিভাবে একজন কিংবা একাধিক মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে আরেক দল মানুষ?
সিলেটের রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল মানুষরূপী শয়তান। পেটানোর সময় মরণাপন্ন রাজন যখন পানি খাওয়ার কথা বলে তখন তার দিকে শরীরের ঘাম মুছে তা ছুড়ে দিয়ে বলেছিল ‘নে ঘাম খা’। এরপর এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে যায় রাজন। খুলনায় শিশু রাকিবকে হত্যা করা হয়েছিল পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে। এমন হত্যাকাণ্ড আরও হয়েছে। পরে হত্যাকারীদের কেউ কেউ বলেছে তারা মজা করার জন্য এমনটা করেছে, কেউ কেউ অবশ্য বলেছে, শয়তান তাদের দিয়ে এমন কাজ করিয়েছে!
পাশবিকতার ক্ষেত্রে সন্তানের হাতে নিরাপদ নয় মা-বাবা, বাবার কাছে নিরাপদ নয় সন্তান, এমনকি মাও কখনো কখনো হয়ে ওঠে সন্তানের হত্যাকারী। কন্যা সন্তান পছন্দ নয় তাই শিশু কন্যাকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলা। আবার প্রেমের পথের কাটা তাই সন্তানকে মেরে ফেলার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়। আদালত বিচার করে এদের কৃৎকর্মের জন্য সাজা দেয় কিন্তু তারা যে অপরাধ করে সম্ভবত: মৃত্যুদণ্ডও তার বিপরীতে শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট নয়।

প্রেমের জন্য আরেকজনের জীবন কেড়ে নেয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বরগুনার রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সবাই দেখলো রিফাতকে বাঁচাতে কত চেষ্টাই না করছে মিন্নি নামের এক তরুণী, কিন্তু পরে জানা গেল, মিন্নির পরামর্শেই রিফাতকে হত্যা করে নয়ন বন্ডের দল। পুরো পরিকল্পনা মিন্নির, রিফাতকে বাঁচানোর যে চেষ্টা সে করে তা ছিল ‘অভিনয়’। আদালতের রায়ে মিন্নির ফাঁসির রায় হয়েছে। একলা কনডেম সেলে বসে মিন্নি এখন কি ভাবছে কে জানে?
নেশার টাকা না পেয়ে মা-বাবা, স্ত্রীকে মারধর করা যেন প্রতিদিনের ঘটনা। ১শ’ টাকার জন্যও একজন আরেকজনকে হত্যা করে ফেলছে। এক টুকরো জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের লাঠালাঠিতে প্রাণ যাচ্ছে এক ভাইয়ের, আরেক ভাই পরে জেলের ঘানি টানে বছরের পর বছর। জমি পড়ে থাকে, ধীরে ধীরে তা হয়তো বেহাতই হয়ে যায়।
সত্যিই মানুষ কেমন যেন হয়ে গেছে, ‘ক্ষমা মহৎ গুণ’ এটি এখন শুধু কথার কথা। চোখের বদলে চোখ নয় এখন বাস্তবতা হচ্ছে চোখের বদলে জান কেড়ে নেয়া। সবারই এক চিন্তা ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’। কোথায় হারিয়ে গেলো ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। এই সুন্দর বাক্যগুচ্ছ। মানুষ কেন এমন হয়ে গেল? পৈশাচিকতার এসব ঘটনা কি আমাদের সেই গ্ল্যাডিয়েটরের যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না? আমরা কি সেই গ্ল্যাডিয়েটরের যুগেই ফিরে যাচ্ছি নাকি আমরা গ্ল্যাডিয়েটরের যুগেই আছি?

লেখক: সাংবাদিক