৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

‘গ্রেটেস্ট পলিটিক্যাল শো’ ও উদ্বেগাকূল বিশ্ববাসী

আপডেট : নভেম্বর ৪, ২০২০ ১১:২১ অপরাহ্ণ

84

আব্দুর রহমান

একটা নির্বাচন কীভাবে সারা বিশ্বকে উদগ্রীব করতে পারে, উৎকন্ঠায় রাখতে পারে তা বেশ অনুভব করছে বিশ্ববাসী। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হলো ৩ নভেম্বর। এবার নির্বাচন নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা ছিল করোনার কারণে। কিন্তু মার্কিন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সে নির্বাচন হলো, তবে নির্বাচন হলেও ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম নাটকীয়তা। এখন অনেকটা ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের যারা আজ সকালে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছেন তারা ধারণা করেছিলেন হয়তো খুব দ্রুতই নির্বাচনের ফলাফল হয়ে যাবে, যেভাবে ফলাফল হচ্ছিলো তাতে যে কারোরই ধারণা হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প শাসনের অবসান হতে চলেছে। প্রথম দিকে ট্রাম্পের চেয়ে জো বাইডেন বেশ এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু বেলা বাড়ার (বাংলাদেশে) সাথে সাথে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে রাত যত গভীর হতে থাকলো ততই কাটতে শুরু করলো ট্রাম্পের সামনের অনিশ্চয়তার আঁধার। শেষাবধি এমন এক পর্যায়ে চলে এলো যে, যে কেউ নির্বাচিত হতে পারেন, অর্থাৎ পূর্বাভাষ করার আর তেমন কোন সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে এদেশের মানুষের চোখ একটু বেশিই পড়ে যখন বাংলাদেশে বিবিসি ও সিএনএন এর সম্প্রচার শুরু হয় তখন থেকে। মানুষ ঘরে বসে বিশ্বের সব খবর পেতে শুরু করলো। বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার ঘটনাটাই বাংলাদেশের মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। এর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতার খবর আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যারা কাজ কিংবা পড়াশোনা করেন তাদের আগ্রহের বিষয়।
এই নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ শতগুণ বেড়ে যায় যখন নির্বাচনে আসলেন বারাক হোসেন ওবামা নামের একজন প্রার্থী। ২০০৮ সালে তিনি প্রথমবার নির্বাচন করলেন। বারাক হোসেন ওবামা মুসলমান এমন একটা আলোচনা, প্রচার ও অপপ্রচার তার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ অনেক বাড়িয়ে দেয়। তার ওপর বারাক ওবামার বাগ্মীতা অর্থাৎ জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার সম্মোহনী ক্ষমতা মানুষকে ওবামার প্রতি আরও বেশি মোহাবিষ্ট করে রাখে। কেনিয়ার এক কৃষ্ণাঙ্গ বাবার সন্তান ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন এই খবরটি আফ্রিকান আর এশিয়দের মধ্যে অন্যরকম চাঞ্চল্য তৈরি করে। সে সময় ‘প্রাইমারি’ (রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী বাছাই) এবং নির্বাচনের পর ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট’ মানুষ উপভোগ করেছেন। তাদের ইংরেজি ভাষার উচ্চারণ মানুষ যতটা বুঝতো তারচে’ বেশি উপভোগ করতো তাদের ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’। বারাক ওবামা জনসভায় যেভাবে ভাষণ দিয়ে ভোটার ও মানুষকে প্রাণবন্ত ও উদ্বুদ্ধ করে ফেলতেন তা সত্যিই বিস্ময় জাগানিয়া ছিল।

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচন করাটা আমাদের দেশের অনেকের কাছে ছিল ঘরের মেয়ে’র নির্বাচন করার মতো বিষয়। তার একাধিকবার বাংলাদেশ সফর, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ঢাকা সফর, সর্বোপরি গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে তাদের ঘণিষ্ঠতা হিলারীর পক্ষে বাংলাদেশের মানুষকে পক্ষপাতপূর্ণ করে তোলে। হিলারীর হারে যুক্তরাষ্ট্রে তার সমর্থকরা যতটা হতাশ হয়েছিলেন তারচে মোটেও কম কষ্ট পাননি বাংলাদেশে তার ভক্তরা।
যাইহোক এবারের নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। ভোটের পর এর ফলাফলের দিকেই সবার চোখ থাকে। প্রার্থীদের ঘুম থাকে না, উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে যান দলের নেতা ও সমর্থকরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে এবার যে নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে তার প্রভাব সারা পৃথিবীতেই পড়েছে। দুনিয়ার মানুষের চোখ এখন বৈশ্বিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর পর্দায়।
নির্বাচনের ফলাফল এখন আটকে আছে। অনেকক্ষণ ধরে ভোটগণনা হলেও ফলাফলে কোন পরিবর্তন আসছে না। আমাদের দেশে যেমন সংসদ নির্বাচনে দূরবর্তী কোন এলাকার ফলাফল পাওয়ার জন্য সারাদেশের মানুষ তাকিয়ে থাকেন একই অবস্থা এখন বিশ্ববাসীর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট পলিটিক্যাল শো অন আর্থ’। অর্থাৎ বিশ্বের সেরা রাজনৈতিক প্রদর্শণী। মানুষ শুধু একে একটা প্রদর্শনী হিসেবেই উপভোগ করছে তা নয়, বিশ্বব্যবস্থার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যও এ নির্বাচনের দিকে মানুষকে আগ্রহী করে তোলে আর দিন দিন সে আগ্রহ বাড়ছে। তাছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশের অনেক মানুষই যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন, অনেকে নাগরিকত্ব নেন তারাও নানাভাবে চিন্তা করেন কে প্রেসিডেন্ট হলে অভিবাবসন নীতি একটু উদার হবে সে ভাবনা থাকে প্রায় সব দেশের মানুষেরই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জয়ী হবেন সে প্রশ্ন মনে রেখেই হয়তো আজকের রাতে বাংলাদেশের অনেককে ঘুমাতে যেতে হবে। কালকের সকালটা কি এই উদ্বেগভরা প্রশ্নের জবাব নিয়ে হাজির হবে? নাকি আরও একটি উদ্বেগভরা দিনের সূচণা করবে? ‘সময়ই বলে দেবে’, বহুল প্রচলিত এই বাক্যটির ওপরই আপাতত ভরসা করতে হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক