৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

গোঁফ উধাও লুক্সেমবার্গে

আপডেট : নভেম্বর ৬, ২০২০ ৯:৫৪ অপরাহ্ণ

66

২০১৩ সালে প্যারিস থেকে তুলুজ হয়ে গিয়েছিলাম লুক্সেমবার্গ। বেনেলাক্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেনঝেন ভিসায় লুক্সেমবার্গ প্রবেশ করতে কোন অসুবিধা হয়নি। দুর্গ আর ব্যাংকের শহর বলে খ্যাত দেশটির রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য্য।
ইপিবা’র সেক্রেটারি জেনারেল মনিরভাইয়ের আমন্ত্রনে তুলুজ যাওয়া । পরিকল্পনায় ছিল পিংকসিটি খ্যাত তুলুজে ৩/৪ দিন থাকবো। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠেনি। তুলুজ আসার দ্বিতীয় দিন সকালে সোহা’র ফোন সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়।

-শোন সন্ধ্যার মধ্যে আমি তুলুজ আসবো তোমাকে নিতে। রেডি থেকো।

মানে কি!

মানে টানে কিছু না। আমরা লুক্সেমবার্গ যাব দুইদিনের জন্য।
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সোহা ফোন কেটে দেয়। মেজাজ ভীষন খারাপ। মাত্রই তুলুজ এলাম। মনিরভাই , বিপুভাই ছাড়া অন্য কারো সাথে এখনো দেখা হলো না। প্যারিস থেকে আসার আগে কত প্ল্যান করে এসেছি। আমার নারায়নগঞ্জের বন্ধু মঈনের সাথে দীর্ঘকাল পর দেখা হবে, রাতভর আড্ডা হবে, কত কথা জমে আছে, সব উজাড় করে বলবো। না, তার আগেই আমাকে কিনা সন্ধ্যায় তুলুজ ছেড়ে যেতে হবে!
মন খারাপ নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে ফেলি। মঈনকে ফোন করে বলি, বিপুভাইয়ের বৈশাখি সুপারশপে চলে আয়। দশ মিনিটের মধ্যেই মঈন হাজির। হাঁটতে হাঁটতে
দুইবন্ধু চলে আসি তুলুজ স্কোয়ারে। কফি খেতে খেতে আড্ডা দেই। সন্ধ্যায় চলে যাব শুনে মঈন প্রচন্ড ক্ষেপে যায়।
-এইডা কোন কথা হইলো ! মাত্রই আইলি, আইজই আবার যাইতে হইবো ক্যান?

না রে ফাইস্যা গেছি।

ধুর, এইসব ভক্কর চক্কর কথাবার্তা আমারে হুনাইছ না।রাইতে আমার বাসায় যাবি। ডাল-ভাত খাবি। এইডা আমার লাস্ট কথা।
উপায়ন্তর না দেখে মঈনকে সোহার কথা জানাই। সে এখন ড্রাইভ করছে। বিকেলের মধ্যে তুলুজ আসবে। জানি না কেন লুক্সেমবার্গ নিয়ে যাবে। সোহার কথা শুনে মঈন তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে।
-ওরে চান্দু, কস কি তুই! এইডা আবার কেডা?
-আমার বন্ধু। খুব ভাল মেয়ে। ওয়ারশতে আমার ক্লাসমেট ছিল।
আমার কথা শেষ হয় না, থামিয়ে দেয়। ভীষন উত্তেজিত কন্ঠে বলে, বন্ধু নাকি গার্লফ্রেন্ড? হাছা কইরা ক’ বন্ধু।
কতদিন হইছে তোগো সম্পর্ক। প্যারিসে নাইট স্টে করছোসনি?

মঈনকে এখন যা বলবো তা সে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। মনে হলো সোহার কথা বলে সাংঘাতিক ঝামেলায় পড়ে গেছি। কোনরকমে এটাসেটা বুঝিয়ে কথা দিতে হলো লুক্সেমবার্গ থেকে ফেরার পথে তুলুজে দুইদিন থাকব। এই শর্তে মঈনের হাত থেকে রেহাই মেলে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সোহা তুলুজ এসে পৌঁছায়। প্যারিস থেকে টানা পাঁচঘন্টায় নয়শ কিলোমিটার
ড্রাইভ করে এসেছে। ওর চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই লংড্রাইভ করেছে। ঘন্টাখানেক বিশ্রাম শেষে সোহা তাড়া দেয়।

ওখানে গিয়ে আমাদের রাতের খাবার খেতে হবে। এখন বের না হলে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

২.
তুলুজ থেকে লুক্সেমবার্গ খুব বেশী দূরে নয়। দুইঘন্টার ড্রাইভ। রাত ন’টায় আমরা পৌঁছে যাই লুক্সেমবার্গ সিটি।
হোটেলের সামনে গাড়ি পার্ক করে নীচে নেমেই আমি মুগ্ধ। রাতের লুক্সেমবার্গ যে এতো অপুর্ব সুন্দর জানা ছিল না। চোখ ধাঁধানো ঝলমলে আলোয় নানান ভাষার পর্যটকদের পদভারে মুখরিত। পথের পাশের ক্যাফে, বার, পাব, রেস্টুরেন্টে নানান বয়সী মানুষের উপচেপড়া ভীড়। তরুন তরুনীদের হাসির ফোয়ারায় চারিদিকে প্রানের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

লুক্সেমবার্গ ইউরোপের অন্যতম একটি ক্ষুদ্র দেশ। রাজধানীর নামও লুক্সেমবার্গ। এ দেশের নাম অনেকে শুনেছেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। লুক্সেমবার্গের নাম শুনলেই আমার মনে পড়ে যায়, জার্মানীর মার্কসবাদী বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের কথা। যদিও রোজা এদেশের মানুষ নয় , শুধু দেশটির সাথে নামের মিলের কারনে মনে হয় রোজার দেশ লুক্সেমবার্গ ।
১৯১৯ সালের ১৫ই জানুয়ারি বার্লিনে ডানপন্থী মিলিশিয়া বাহিনী ফ্রেইকর্পসের আততায়ীরা তার মাথায় গুলি করে হত্যা করার পর একটি খালে লাশ ফেলে দিয়েছিল। লেখক, দার্শনিক এবং যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক কর্মী রোজা লুক্সেমবার্গের তখন ৪৭ বছর বয়স। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জার্মানিতে ফ্রেইকর্পসের উত্থানের কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং জার্মান কাইজারকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, সামাজিক বৈষম্য, লিঙ্গ অসমতা, প্রতিবন্ধীদের সাথে অন্যায্য আচরণ এবং প্রথাগত রাজনৈতিক মতবাদের বিরোধিতা করে গেছেন। সেসব প্রসঙ্গ আজো একই রকম প্রাসঙ্গিকই রয়ে গেছে।

যাহোক লুক্সেমবার্গ কিন্ত মাথাপিছু জাতীয় আয়ের হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ। গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের তথ্য মতে, বিশ্বের তিন নম্বর ধনী দেশ হচ্ছে লুক্সেমবার্গ। বেকারের হার তেমন উল্লেখযোগ্য না। সামাজিক সুরক্ষা অভাবনীয়। বিশ্বাস করুন আর নাইবা করুন, এই ছোট দেশে ১৪০টির বেশি ব্যাংক রয়েছে। তাই বলা হয়,এটি ইউরোপের অর্থনৈতিক রাজধানী। মাথাপিছু বাৎসরিক আয় প্রায় ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার। ইউরো তাদের প্রচলিত মুদ্রা। ভাবা যায়, দুই হাজার ৫৮৬ বর্গ কিলোমিটারের ছোট দেশটি কেন ধনী দেশ!
লুক্সেমবার্গের চারপাশে ঘিরে আছে জার্মানি , ফ্রান্স ও বেলজিয়াম। তিনদেশের মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং বসতি থাকায় এখানকার মানুষ মূলত জার্মান , ফ্রেঞ্চ আর লুক্সেমবুর্গিশ এই তিন ভাষায় কথা বলে । এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এখানে কাজের জন্য আসে। তাই এটি বহুমুখী সংস্কৃতির দেশ।
রাতে হোটেলের পাশে একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে স্বল্প সময়ের জন্য হাঁটতে বের হই। সকালে সোহার ইন্টারভিউ আছে মিলিনিয়াম ব্যাংকে। আসলে এই ইন্টারভিউর জন্য সোহার লুক্সেমবার্গ আসা। ফাঁক তালে নতুন একটি দেশ দেখার সুযোগ ঘটলো ।
রুমে ফিরে সোহার পীড়াপীড়ি ‘ তোমাকে গোঁফ ছাড়া কেমন লাগে দেখতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ গোঁফ ফেলো দাও।’

অসম্ভব। এখন হবে না। প্যারিস যাবার পর দেখা যাবে।
সোহা নাছোড়বান্দা। আমার ব্যাগ থেকে হ্যাঁচকা টানে শেভিংকীট বের করে।

গোঁফবিহীন তোমাকে ভাল লাগবে। যদি এখন না ফেলো, আমি কিন্ত ঘুমের মধ্যে কেটে দিবো।

বলে কি!
একথায় সত্যি ভয় পেয়ে যাই। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ নিয়ে গোঁফ উধাও করতে বাধ্য হই। আয়নায় নিজেকে দেখে রীতিমতন ভয়ংকর লাগে। কি বিশ্রী, ওয়াক থু!

৩.
পরের দিন সোহা ইন্টারভিউ দিতে গেলে সারাটি সকাল আমার রুমে কেটে যায়। দুপুরে সোহা ফিরে আসার পর প্ল্যান করি স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য কি কি দেখা যেতে পারে। কাল সকালে আমাদের প্যারিস ফিরতে হবে। তাই গুগুল ঘেঁটে জেনে নেই, খুটিনাটি অনেক কিছু। লুক্সেমবার্গ দুর্গের জন্য বিখ্যাত। প্রায় শতাধিকের ওপর ছোটবড় দুর্গ, রাজপ্রাসাদ রয়েছে। আর কি দেখবো তার একটা ছোটখাটো লিস্ট মনে মনে তৈরি করে ফেলি।
আমরা প্রথমে যাই গ্রান্ড ঢুকাল প্যালেস। পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় একটি স্থান। দুইশত বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদ। রোমান ও গোথিক স্থাপত্যের অপূর্ব সমন্বয়ে নির্মিত।

আমার মতন সোহাও ঘুরতে খুব পছন্দ করে। ওয়ারশ, প্যারিস থাকাবস্থায় আমরা উইকএন্ডে এদিক সেদিক হাওয়া হয়ে যেতাম। গতকাল বেচারি প্রায় তেরশত কিলোমিটার ড্রাইভ করে বিধ্বস্ত। ইন্টারভিউর টেনশানে রাতে যে তার ভাল ঘুম হয়নি, সে তো দুপুরে দেখেছি কেমন ঢুলু ঢুলু করছে।
সামান্য পথ ড্রাইভ করে আমরা চলে আসি শহরের সবচেয়ে পুরানো ব্রিজ দেখতে। শত বছরের পুরোনো পাথরের তৈরি অ্যাডলফ ব্রিজ। যার উপর দাঁড়িয়ে লুক্সেমবার্গের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। আমাদের মতন অসংখ্য যুগলের দেখা মেলে যারা এসেছে প্রিয়জনকে নিয়ে।
মধ্যযুগে নির্মিত শহরের কেন্দ্রটি ছোট, পুরনো বিল্ডিং এবং মধ্যযুগীয় অতীতের অবশিষ্টাংশে পরিপূর্ণ। শহরের মাঝামাঝিতে রয়েছে সবুজ রঙে ঘেরা উপত্যকা এবং একেবেকে বয়ে চলা নদী। শহরের অন্যান্য অংশে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, কিচবার্গে রয়েছে কাঁচঘেরা আকাশচুম্বী সব বড় বড় দালানকোঠা, ব্যাংক ও বহুজাতিক সংস্থার দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। রাজধানী হচ্ছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু এবং অনেকগুলি যাদুঘর, আর্ট গ্যালারী,ক্লাব, বার এবং বিশ্বসেরা রেস্তোঁরা রয়েছে।

হোটেলে ফেরার পথে মেজাজ খারাপ হয় দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে। ঢাকার মতন বিরক্তিকর যানজট। ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা অত্যাধিক হওয়ায় এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে মাত্র ৩০℅ শতাংশ মানুষ। যদিও বাস,ট্রেন যাতায়াতে সারাদিন চার ইউরো খরচ হয়। তবুও মানুষ ব্যক্তিগত বাহন ব্যবহার করেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ডিজেল ও পেট্রোলের বাজারমূল্য লুক্সেমবার্গে অপেক্ষাকৃত কম। এ কারনে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে মানুষ যে কেবল অফিস ধরতেই ছুঁটে আসে তা কিন্তু নয়। বরং অপেক্ষাকৃত কম দামে পেট্রোল-ডিজেল কিনতেও আসে অনেক ‘ফুয়েল ট্যুরিস্ট’!
দিনের আলো ফুরিয়ে যাবার আগে যানজট পেরিয়ে আমরা চলে আসি দ্য বক কাসেমেন্টস ট্যানেলে। পাথরের তৈরি এই আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত হয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার হাত থেকে প্রায় ৩৫ হাজার লোকের জীবন বাঁচাতে ট্যানেলটি দুর্গ হিসেবে

ব্যবহার করা হয়েছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যানেলটি অন্য দশটি ট্যানেলের মতন হলেও বিশেষত্ব হচ্ছে এর প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পথ। সহজে বোঝার উপায় নেই মাটির নীচে এতো বড় একটি ট্যানেল রয়েছে।
ট্যানেল থেকে বের হয়ে সোহার দিকে তাকানোই যাচ্ছিল না। বেচারি একদম ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। খুব মায়া লাগছিল।
চলো ফিরে যাই। কাল সকালে যেতে যেতে যতটুকু দেখা যায় দেখবো।
কিছু না বলে কোন রকম ড্রাইভিংসিটে বসে।
সরি, আমার জন্য তোমার কিছু দেখা হচ্ছে না। নেক্সট টাইম আমরা সময় নিয়ে আসবো।
হুম।

রাত বাড়ায় রাস্তায় যানজট কিছুটা কম। আমি চারিদিকে যতটুকু পারি দেখে নিচ্ছি। আবার কবে আসা হবে কে জানে। একটি আশ্চর্যের বিষয় লক্ষ্য করি, লুক্সেমবার্গের রাস্তা বিশ্বের নামীদামী খাবারের দোকান যেমন- কেএফসি, বার্গার কিং, স্টারবাকস, ক্রিস্পি ক্রিমি, ট্যাকো বেল হতে মুক্ত। তার জায়গায় সব ফরাসী, স্পেনিশ, জার্মান, তুর্কি রেস্টুরেন্ট।
মাত্র দুইদিনে রাজা শাসিত লুক্সেমবার্গ যতটুকু দেখেছি, জেনেছি তাতে ছিমছাম, শান্তিপ্রিয় এদেশটি অসম্ভব ভাল লেগেছে।

৫.১১.২০২০
মন্ট্রিয়েল