১৭ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

গুটেন মগেন আউজ বার্লিন

আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১ ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ

35

খুব ভোরে বার্লিন শনিফিল্ড এয়ারপোর্টে এসে নামি। ইমিগ্রেশন শেষ করে ভীষন মন খারাপ হলো। ল্যাগেজ বেল্টে এক ঘন্টা অপেক্ষা করেও ল্যাগেজ পাইনি। সম্ভবত আবুধাবি হতে কানেক্টিং ফ্লাইটে আমার ল্যাগেজ মিসিং হয়েছে।

ল্যাগেজ হারিয়ে তীব্র ঠান্ডায় চরম বিপাকে পড়েছি। শীত নিবারনের সব কাপড় ভরা ছিল । এখন তীব্র ঠান্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছে। জ্যাকেট, পুলওভার কিছু একটা না কিনলে বাইরে বের হওয়াই বিপদজ্জনক হবে!

বিমানবন্দরে রিসিভ করতে আসা কাজিন, ছোটভাই বাবু আমার দুরাবস্থা দেখে বেচারি দুঃখ প্রকাশ করে।
ভাইয়া, আমার জ্যাকেট গায়ে দেন। আমার গায়ে সোয়েটার আছে। বাসায় ফিরে দেখা যাবে কি করা যায়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবুর জ্যাকেট পড়ে গেলাম ব্যাগেজ ক্লেইম করার জন্য লস্ট এন্ড ফাউন্ড বুথে। কমপ্লেইন পেপারে লোকাল ফোন, ইমেল,এড্রেসসহ বিস্তারিত লিখে সব ফর্মালিটিজ সারতেই লেগে গেল আরো দেড়ঘন্টা।

বেলা সাড়ে ন’টা বাঁজে। লম্বা জার্নির ক্লান্তিতে শরীর বিধ্বস্ত। ক্ষুধাও লেগেছে। পেটের ভিতর ইদূর দৌড়াচ্ছে! বাসায় যাবার আগে কোন একটি কফিবারে কিছু একটা খেয়ে নিতে হবে।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম। মজার বিষয় হচ্ছে ,শীত বা গ্রীস্ম যখনই বার্লিনে এসেছি তখনই আমি বৃস্টির দেখা পেয়েছি। গত ১১ বার বৃস্টি কখনোই তার ব্যতয় ঘটায়নি। আজই বা কেন তার ব্যতিক্রম হবে!

যাহোক, আমার সাথে বার্লিনের বৃস্টির একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে গেছে, আমি এখানে এলে তাকে যেন ঝরতেই হবে !

ফেরার পথে দু’ভাই ফ্রুসটুক বা ব্রেকফাস্ট সেরে নেই একটি কফিবারে। গরম কফি খেতে খেতে বাবুকে বলি, একটা ডে টিকেট কিনতে হবে। আশেপাশে কোন মেট্রো স্টেশন আছে?
হ্যাঁ। আমার বাসার পাশে মেট্রো স্টেশন আছে।
চলো আগে টিকেট কিনে বাসায় যাব।

কফিবার হতে বের হয়ে দেখি ছিচকাঁদুনে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিস্কার,ঝকঝক করছে। তাপমাত্রা মাইনাস ফোর। কিন্ত হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় শরীরের অনাবৃত অংশ বিশেষ করে নাক বরফ হয়ে গেছে! অাঙ্গুল ছোঁয়াতে মনে হলো, নাকে কোন বোধশক্তি বা রক্ত চলাচল নেই। বিমানবন্দরে বাবুর জ্যাকেটটি গায়ে না চাপালে এতোক্ষনে নিশ্চিত ঠান্ডায় জমে মারা পড়তে হতো!

পাঁচ সাত মিনিট হেঁটে আসার পর পেয়ে গেলাম মেট্রোস্টেশন। সারাদিনের জন্য কিনে ফেলি ট্যাগেসকার্ট। ট্যাগেসকার্ট হচ্ছে পুরো দিনের জন্য মেট্রো টিকেট। যার দাম মাত্র ছয় ইউরো সত্তুর সেন্ট। সারাদিন মেট্রো, বাসে চলাচলের জন্য খুবই সাশ্রয়ী ও লাভজনক। এটি সত্যিই সুবিধাজনক কারণ শহরে প্রচুর মেট্রোস্টেশন রয়েছে। বার্লিন ভ্রমনে এসে যদি কেউ প্রায় এক সপ্তাহ বার্লিনে থাকার পরিকল্পনা করেন, তবে তিনি এক সপ্তাহের জন্য টিকেট কিনতে পারবেন (সেভেন-টেজ-কার্টে )। এটি আরও লাভজনক।

বোয়েসেল স্ট্রাসের বাসায় ঢুকে লম্বা শাওয়ার নিয়ে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম ভাঙ্গলো বাবুর ডাকে। ঘড়ির কাঁটা দু’টোর ঘরে।পড়াশুনোর পাশাপাশি বিকেলের শিফটে বাবু কাজ করে। আমাকে রেখে তাকে কাজে ছুঁটতে হবে। তাই ফ্রেশ হয়ে দুইভাই খেতে বসে গেলাম। আমি আসবো বলে কত কিছু যে রান্না করে রেখেছে, তা টের পেলাম খেতে বসে। মুরগীর মাংস, বিফ কারি, পোলাও, সব্জী ও মাছ দিয়ে দুপুরের খাওয়া মন্দ হলো না ।

২.
জার্মানে নানান সময় এসে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে তাদের আচার ব্যবহার ও পরোপকারি মনোভাব। নানান শহরে ঘুরে আরো একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে, জাতিগতভাবে এরা খুব স্বল্পভাষি এবং নীচুস্বরে কথা বলতে পছন্দ করে। শব্দের কারনে অন্য কেউ বিরক্ত হবেন, এটা তাদের কাছে চরম অভদ্রতা। এমন কি তাদের মোবাইলের রিং টোন তারা সাইলেন্ট করে রাখেন, কল এলে যাতে কারো বিরক্তির উদ্রেক না হয়।ট্রামে,বাসে,মেট্রোতে দেখেছি এরা খুব সচেতনভাবে শব্দদুষন করা থেকে বিরত থাকেন। এরা যখন একে অন্যের সাথে কথা বলেন, তখন তাদের কোন কথাই পাশে বসা বা দাঁড়ানো মানুষটিরও কর্নগোচর হয় না। অসম্ভব ভদ্র একটা জাতি।

অথচ সারা জার্মানজুড়ে যে সব আরব রয়েছে তারাই হৈ চৈ করে কথা বলে অন্যের বিরক্তির কারন হন। এক্ষেত্রে আমাদের এশিয়ানদের যথেস্ট সুনাম রয়েছে। তারা নিজ দেশে যেরকমই হোক না কেন পশ্চিমে এসে কিছুটা হলেও এখানকার সংস্কৃতি,আচার,ব্যবহার রপ্ত করতে শিখে।যা আরবদের মধ্যে বহুলাংশেই অনুপস্থিত।

সন্ধ্যাবেলা বাসায় একা একা বসে অনলাইনে কাজ করছি, এসময় নীচে প্রচন্ড চিৎকার, চেচাঁমেচি শুনে জানালা দিয়ে দেখি কয়েকজন আরবী মহিলা উচ্চস্বরে কথা বলছেন। তাদের শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল বড় ধরনের ঝগড়া হচ্ছে।
প্যারিসেও আরবীদের এধরনের অসভ্যতা, চিৎকার, ঝগড়াঝাটি দেখেছি। এদের প্রথম দেখায় কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবেন না যে, এরা কি ভয়ংকর হতে পারেন!
বার্লিনের এই দুই সুন্দরীকে দেখে কেউ কি অাঁচ করতে পারছেন, এরা কিছুক্ষন আগে কি ভয়ংকর উগ্রমুর্তি ধারন করে বোয়েসেল স্ট্রাসে কাঁপিয়ে দিয়েছেন?
এরা উপরে সুন্দর ভিতরে চরম কুৎসিত, হিংস্র হয়।

৩.
এবার বার্লিন এসেছি বাবুর কারনে। মাত্র দু’দিনের জন্য। আমার আসলে যাবার কথা প্যারিস। কিন্তু বাবু আগেই বলে রেখেছিল আমি যেন বার্লিন হয়ে তারপর প্যারিস যাই। ছোটভাইয়ের মনরক্ষার্থে বার্লিন আসা।

পরের দিন বাবুর ডে অফ থাকায় দুইভাই সারাদিন বার্লিনের আনাচে কানাচে টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়িয়েছি।বিশেষ করে বার্লিন ক্যাথেড্রাল চার্চ, সনি মার্কেট, আলেকজান্ডার প্লাটজ,টপোগ্রাফি অফ টেরর, বোটানিক্যাল মিউজিয়াম, জুলোজ্যিকাল গার্ডেন এবং পৃথিবী বিখ্যাত গেন্ডারমেনমার্ক স্কয়ারে। গিয়েছিলাম মেমোরিয়াল অফ মার্ডারড জুইশ অফ ইউরোপ দেখতে। এটা দেখতে গিয়ে ভীষন মন খারাপ হয়েছে। ধর্মের কারনে মানুষকে মানুষ এমন নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে, একটি জাতিকে নির্মুল করে দিতে পারে ভাবতেই গা শিউরে উঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ্বের সময় এই নির্মমতা, বর্বরতা দেখেছে ইহুদী সম্প্রদায়।

২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নৃশংস আচরণের কেন্দ্রে ছিল ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা। তাদের উপর ব্যাপক পরিমাণে নির্যাতন চালায় হিটলারের নাজি বাহিনী। হত্যাযজ্ঞে নিহত সেসব ইহুদীদের স্মরণেই নির্মিত হয়েছে এই মেমোরিয়ালটি। প্রায় ১৯ হাজার বর্গ মিটার জায়গায় ২৭১১ টি কনক্রিটের কবর রয়েছে।

প্রতিটি কবরের সাথেই নিহতদের চিঠি, ডায়েরি এবং ছবিসহ যাবতীয় তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাসের বর্বরতার নির্মম শিকার নিরীহ মানুষগুলোর জন্য কখন যেন আমার দু’চোখ ভিজে গেছে।

৪.
রাতের বাসে আমি প্যারিস যাবো। দুপুরের আগেই
অবশেষে তিনি এলেন! পাক্কা ৭২ ঘন্টা পর তার দেখা মিললো! তিনি অক্ষত অবস্থায় স্বসম্মানে ফেরত এলেন। ৭২ ঘন্টা আমাকে শীতের তীব্র ঠান্ডায় জমিয়ে দিয়ে, নার্ভ ব্রেক ডাউন করে, প্যারিস না হয়ে তিনি বার্লিনের এড্রেসে যোগাযোগ করে চলে এলেন।এই তিনি হচ্ছেন আমার মিসিং হয়ে যাওয়া ল্যাগেজ।
আহা কি শান্তি!

২৫.০২.২০১৬
বোয়েসেল স্ট্রাসে
বার্লিন