১৪ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে পৌষ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

‘কুমারীত্ব পরীক্ষা’ বিচারে দমে যায় পাকিস্তানের সাহসী কিশোরীরা

আপডেট : জানুয়ারি ১৩, ২০২১ ৪:৫৫ অপরাহ্ণ

4

ভয়েস বাংলা ডেস্ক

ধর্ষণের শিকার ১৪ বছরের কিশোরীটির সাহস ছিল। পাকিস্তানে বেশির ভাগ নারীই সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের কাছে যায় না। ধর্ষণের শিকার কিশোরীটি কিন্তু পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল।

বাবার এক আত্মীয়ের কাছে কিশোরীটি ধর্ষণের শিকার হয়। পুলিশ তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে তার ‘কুমারীত্ব পরীক্ষা’ করা হয়।

এএফপিকে ১৪ বছরের ওই কিশোরী সাজিয়া (ছদ্মনাম) জানায়, ‘পরীক্ষা খুব কষ্টের ছিল। আমি জানতাম না কেন এমন পরীক্ষা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছিল সে সময় যদি মা পাশে থাকত।’

তিন বছর আগের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বলছিল সাজিয়া। সে বলে, ‘আমাকে বলা হয়নি কেন আমার শারীরিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। শুধু বলা হয়েছিল, পুলিশের কাজে সাহায্যের জন্য চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হবে।’ সাজিয়ার মা-বাবা মামলা করেন। এত সব জটিল পরিস্থিতির কারণে পরিবারের চাপে পড়ে মামলাটি তুলে নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে ধর্ষণের শিকার নারীদের কুমারীত্ব পরীক্ষা প্রচলিত রয়েছে। লাহোরের পাঞ্জাব প্রদেশের আদালত সম্প্রতি এটি বাতিল করেছেন। তবে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশে এখনো এটি চালু রয়েছে।

পাকিস্তানে ধর্ষণের শিকার নারীদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ধর্ষণের ঘটনার তদন্তও সেভাবে হয় না। বরং পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে কুমারীত্ব পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

এ পরীক্ষায় অবিবাহিত কোনো নারী যদি যৌনভাবে সক্রিয় বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে ফৌজদারি মামলায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। ওই নারীকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়।

কুমারীত্ব পরীক্ষায় সামাজিকভাবে ধর্ষণের শিকার নারী হেয় হওয়ায় পাকিস্তানে ধর্ষণের ঘটনায় শাস্তির হার খুব কম। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, এই হার ০.৩ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, ব্রাজিল, জিম্বাবুয়েসহ বিশ্বের কমপক্ষে ২০টি দেশে কুমারীত্ব পরীক্ষা চালু আছে। এ ধরনের পরীক্ষা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এই পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু পাকিস্তানের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ধর্ষণের অভিযোগ করতে আসা কিশোরী ও নারীদের এ ধরনের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করে।

কুমারীত্ব পরীক্ষা মানে আরেকবার ধর্ষণ বললেন সিদরা হুমায়ূন ।
কুমারীত্ব পরীক্ষা মানে আরেকবার ধর্ষণ বললেন সিদরা হুমায়ূন ।

যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন কর্মী সিদরা হুমায়ূন এএফপিকে বলেন, ‘আমি মনে করি কুমারীত্ব পরীক্ষা মানে আরেকবার ধর্ষণ। ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগ নারী এ ধরনের পরীক্ষা নিয়ে তাঁদের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন।’
আদালতের নথি বলছে, টু ফিঙ্গার টেস্টের মাধ্যমে কুমারীত্ব পরীক্ষায় ধর্ষণের শিকার নারীরা যৌনভাবে সক্রিয় প্রমাণ হলে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এ রকম অনেক ঘটনা রয়েছে।

ফয়সালাবাদ এলাকার একটি গ্রামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এক ব্যক্তি। কুমারীত্ব পরীক্ষায় মেয়েটির যৌন সক্রিয়তার ভিত্তিতে ওই ব্যক্তিকে মুক্তি দেন আদালত। ঘটনাটি ২০১৪ সালের।

আইনজীবীরা বলছেন, কুমারীত্ব পরীক্ষা প্রায়ই ধর্ষণের শিকার নারীদের সম্মতি ছাড়াই করা হয়। যাঁরা পরীক্ষা করেন, তাঁদের মধ্যে সংবেদনশীলতারও অভাব থাকে।
লাহোরের সরকারি হাসপাতালের নারী চিকিৎসক এএফপিকে বলেন, তিনি ধর্ষণের শিকার তরুণীদের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি অভিযোগ করেন, অবিবাহিত নারী কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে অনেক সময় পরিবার ধর্ষণের অভিযোগ আনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী চিকিৎসক বলেন, ‘কুমারীত্ব পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি নারীর সঙ্গে আগে কারও যৌন সম্পর্ক হয়েছে না হয়নি। আমরা জানি, কোন অভিযোগ ভুল আর কোন অভিযোগ ঠিক।’

ইতিহাসবিদেরা বলছেন, কুমারীত্ব পরীক্ষা ঔপনিবেশিক আমলের। ব্রিটিশরা স্থানীয় ধর্ষণের ঘটনা চাপা দিতে এ ধরনের নিয়ম চালু করে। স্বাধীনতার পরও ভারত ও পাকিস্তানে এই পরীক্ষা চালানো হয়।

কুমারীত্ব পরীক্ষার বিরুদ্ধে সাদাফ আজিজ নামে এক আন্দোলনকারী বলেন, ধর্ষণ নিয়ে স্থানীয় নারীরা মিথ্যা কথা বলে এমন ঢালাও ধারণা থেকে এ ধরনের পরীক্ষা ঔপনিবেশিক আমলে চালু করা হয়েছিল।

পরীক্ষা খুব কষ্টের ছিল। আমি জানতাম না কেন এমন পরীক্ষা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছিল সে সময় যদি মা পাশে থাকত।

-ধর্ষণের শিকার কিশোরী সাজিয়া (ছদ্মনাম)।

সম্প্রতি তিন সন্তানের সামনে গাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হন মা। এ ঘটনায় পাকিস্তানের পুলিশপ্রধান একজন নারীর রাতে একা গাড়ি চালানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর দেশটিতে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট গত মাসে ধর্ষণবিরোধী নতুন আইন অনুমোদন করেন। এই আইনে টু ফিঙ্গার টেস্ট বাতিল করা হয়। তবে পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনটি বাতিলের অনুমোদন হয়নি।
তবে লাহোর হাইকোর্ট পাঞ্জাব প্রদেশে এ মাসে কুমারীত্ব পরীক্ষা বাতিল করেছেন। পাঞ্জাবের আইনজীবী সমীর খোসা সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল শুরু হয়েছে।

ভারতে ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কুমারীত্ব পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিন্তু এরপরও ভারতে এ ধরনের পরীক্ষা চালু আছে। ১৪ বছরের কমলের (ছদ্মনাম) গত বছর জোর করে কুমারীত্ব পরীক্ষা করা হয়। ভারতের স্থানীয় একটি মন্দিরের পুরোহিতের কাছে সে ধর্ষণের শিকার হয়। এএফপিকে কমল জানায়, পরীক্ষার আগে চিকিৎসকেরা তাকে কিছুই জানাননি। এ ধরনের পরীক্ষা খুবই লজ্জার।

ভারতের যৌন সহিংসতাবিরোধী বেসরকারি সংস্থা জনসাহসের প্রধান আসিফ শেখ এএফপিকে বলেন, প্রতিবছর ধর্ষণের শতাধিক ঘটনায় টু ফিঙ্গার পরীক্ষা হয়।
পাকিস্তানের ভাওয়ালপুরের আইনজীবী আবদুল গাফফার খান চৌঘাতি বলেন, ধর্ষণের শিকার নারীরা ধর্ষণকারীকে ঘুরে বেড়াতে দেখেন। উল্টো তাঁদেরই সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়। আইনজীবী আবদুল গাফফার আরও বলেন, মামলার বাদী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর আর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে এগোতে চাননি। কারণ, সুবিচার পাবেন না বলে তাঁর ভয় ছিল।

সূত্র: প্রথম আলো




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *