২৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

কুকুরপ্রেম ও মানবপ্রেম

আপডেট : সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ ২:৪৫ অপরাহ্ণ

32

শরিফুল হাসান

কুকুর নিয়ে মানবজাতির দুই পক্ষের আলোচনা দেখে লিখতে বাধ্য হচ্ছি। বাধ্য হচ্ছি কারণ, কুকুর বিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে দুই পক্ষ যেভাবে জঘন্য ভাষায় একে অন্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে যাচ্ছে সেটা চরম হতাশার। দুই পক্ষেই আমার চেনাজানা অনেক ঘনিষ্ঠ মানুষ আছে। আপনারা কুকুর নিয়ে আলোচনা করেন আমার আপত্তি নেই, কিন্তু সেই আলোচনা করতে গিয়ে পরষ্পরকে যেভাবে আক্রমণ করছেন সেটা অনেকটা নোংরামির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দুই পক্ষকেই অনুরোধ করছি, একটু শান্ত হোন।

মনে রাখবেন, যে কোন বিষয় নিয়ে মত-ভিন্নমত থাকতেই পারে। প্রত্যেকেই তার ভাবনা বলতে পারেন। দেখেন, কুকুরকে ভালোবাসাটা অন্যায় নয়। এ নিয়ে তাচ্ছিল্যের কিছু নেই। প্রাণীপ্রেমে আমি কোন সমস্যা দেখি না। করোনার লকডাউনের সময় রোজ রাতে আমি কয়েকটা কুকুরকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। রোজ সময় করে ওই কুকুরগুলো রাতে আমার বাসায় সামনে আসতো। আমার কাছে মনে হয়েছে, কুকুরগুলো খেতে না পারলে মরে যাবে।

আরেকটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলে থাকি। পত্রিকা অফিস শেষে রাতে ফিরে আসলে হলের গেটে থাকা একটা কুকুর আমার পিছু পিছু আসবে। হলের দোকান থেকে আমি বনরুটি কিনে দেব। তারপর খাবে। রোজ এই অভিজ্ঞতা।

আমার বন্ধু অন্তু তখন কাজ করে আজকের কাগজে। ও অফিস থেকে আসতো গভীর রাতে। ও এসে আমার রূমে গল্প গুজব করতো। অনেক সময় নতুন আসা কোন সিনেমা দেখতো। এরপর ও যখন যেত আমার সেই কুকুরটা ওকে গভীর রাতে হল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতো।

মানুষের প্রতি কুকুরের এই ভালোবাসা আসলেই মুগ্ধ করার মতো। এ বছরের মার্চের ঘটনা বলি। জার্মানিতে আমি আর আমার বন্ধু সাংবাদিক জোবায়ের ঘুরছি। দারুণ দারুণ সব কুকুর দেখে জোবায়েরকে বলছি কী সুন্দর কুকুরগুলো। জোবায়ের তখন বললো, এদের কুকুরপ্রেম সাংঘাতিক রকমের। অনেক লোক তার শেষ জীবনে সব সম্পদ কুকুরকে লিখে দেয়।

আমি তখন বললাম, এই দুনিয়ায় কতো মানুষ আছে খেতে পায় না। এমনকি জার্মানিতেও নিশ্চয়ই গরিব আছে। সেখানে কুকুরকে সব সম্পদ না লিখে দিয়ে কুকুরের লালনপালনের জন্য কিছু রেখে বাকিটা কী মানুষের জন্য দেয়া যায় না? জোবায়ের আমাকে বললো, এই কথা বললে তোর প্রতি মানুষজন ক্ষেপবে। আমি কোনভাবেই বুঝতে পারলাম না মানুষ খেতে পারবে না, না খেয়ে মরবে, আরেকদল লোক কুকুরের প্রতি লাখ লাখ টাকা খরচ করবে। আপনারা কুকুরপ্রেমীরা মানুষকে কুকুরের চেয়ে বেশি না ভালোবাসেন অন্তত সমান ভালোবাসেন।

তারপরেও বলি, কুকুরপ্রেমকে আমি শ্রদ্ধা করি, কিন্তু মানবপ্রেম থাকাটাও তো জরুরী, তাই না। আবার মানবপ্রেম থাকা মানে তো এই নয় যে কুকুরকে মারতে হবে। আবার কুকুরপ্রেম থাকা মানে এই নয় যে বাস্তবতাকেও অস্বীকার করতে হবে।

দেখেন এই ঢাকা শহরে বেওয়ারিশ কুকুর যে মানুষকে কামড়ায় সেটা তো ভয়াবহ রকমের সত্য। আপনারা কিছু মানুষ কেন সেটাকে অস্বীকার করতে চান? মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যান। জানতে পারবেন, প্রতি বছর রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় গড়ে ৬০-৭০ হাজার মানুষ কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে আহত হয়।

এই হাসপাতালে পাঁচ বছরে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে তিন লাখ মানুষ। প্রতি বছর কুকুরের কামড়ে গড়ে ৮০-৯০ লোক জন লোক মারাও যায়। পাঁচ বছরে অন্তত ৫০০ লোক মরেছে। যারা কামড় খেয়েছে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা পাওয়া নিয়েও তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

আমি কুকুরকে ভালোবাসি বলে তো এই বাস্তবতাও অস্বীকার করতে পারবো না। দেখেন যে লোকটার সন্তান কুকুড়ের কামড়ে মরেছে সে কিন্তু কুকুরের নিয়ন্ত্রণ চাইবে। এটা তো অপরাধ নয়। সমস্যার সমাধানটা তাহলে কী?

কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে আগে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো তা নিধন করত। এটাকে আমি অমানবিক মনে করি। আদালতের নির্দেশে ২০১২ সাল থেকে সারা দেশে কুকুর নিধন বন্ধ আছে। অনেকেই তাই কুকুরের জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন।

জন্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন, কারণ প্রতিটি কুকুর বছরে গড়ে ১২টি করে বাচ্চা দেয়। ঢাকা শহরে বেওয়ারিশ অন্তত ৫০ হাজার কুকুর আছে। এর মধ্যে অন্তত অর্ধেক কুকুরকে জন্মনিয়ন্ত্রণে আমি তো সমস্যা দেখি না।কেউ এর চেয়ে ভালো আইডিয়া দিতে পারেন। এখন কেউ যদি এই কথা বলে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে হবে কেন?

এই যে ককুর নিয়ে আলোচনায় আপনারা সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত মানুষেরা পরষ্পরকে আক্রমণ করছেন, একজন আরেকজনের পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আক্রমণ করছেন দয়া করে বন্ধ করুন।

আপনাদের দুই পক্ষকেই হাতজোড় করে বলছি, পরশ্রীকাতরতা, গীবত এগুলো সুস্থ চিন্তার বাঁধা। আপনারা আলোচনা করুন, সমাধানে আসুন শুধু পরষ্পরকে আক্রমণ করবেন না। সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রানীদের ভালোবাসার বোধ দিন, পাশাপাশি মানুষকেও ভালোবাসার শক্তি দিন। ভালো থাকুক সব কুকুরেরা। তার চেয়েও বেশি ভালো থাকুক সব মানুষেরা। শুভ সকাল সবাইকে।

(লেখক- সাংবাদিক। লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে।)