১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কীভাবে হয় করোনাভাইরাসের মিউটেশন, আর কীভাবেই বা তা ধরা পড়লো

আপডেট : ডিসেম্বর ২৪, ২০২০ ১:২৭ পূর্বাহ্ণ

158

ভয়েস বাংলা ডেস্ক

মহামারির শুরুর সময়টা থেকেই বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের জেনেটিক গঠনে কোন পরিবর্তন আসে কিনা – তার ওপর নজর রাখছিলেন।

সব ভাইরাসেরই মিউটেশন হয়, অর্থাৎ এটা নিজেকে নিজে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করতে থাকে। সাধারণত দেখা যায় – প্রতি এক মাস সময়কালে একটি বা দুটি পরিবর্তন হয়ে থাকে।

অনেক সময়ই এই মিউটেশনগুলো ভাইরাসের আচরণের ওপর তেমন কোন প্রভাব ফেলে না, বা ফেললেও তা হয় খুবই নগণ্য।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ড. লুসি ভ্যান ডর্প হচ্ছেন মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবের বিবর্তনের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ।

“বেশির ভাগ সময়ই এগুলো গুরুত্বহীন, এবং খুব বিরল দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া এটা ক্ষতিকর কিছুও নয়। সার্স-কোভ-টু’র জেনোমে আমরা যে মিউটেশনগুলো দেখেছি তার বেশির ভাগই ভাইরাসটির আচরণে কোন পরিবর্তন আনে না।”

টিকে থাকার জন্যই সবসময় নিজেকে বদলাতে থাকে করোনাভাইরাস
গত বছর ডিসেম্বরে চীনে প্রথম যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়েছিল – সেটা এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ বার পরিবর্তিত হয়েছে।

অনেক পরিবর্তনই ভাইরাসের আচরণে কোন প্রভাব ফেলে না।

কিন্তু দু-একটি ক্ষেত্রে ভাইরাসটি এমন কিছু মিউটেশন ঘটিয়ে ফেলে – যা তাদের টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির ক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এরকম মিউটেশন বহনকারী ভাইরাস তখন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটাতে থাকে – যদি মহামারি ছড়ানোর পূর্বশর্তগুলো অনুকুল থাকে” – বলছিলেন ড. ভ্যান ডর্প।

যুক্তরাজ্য থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাসের যে মিউটেশনটি নিয়ে এখন সারা দুনিয়ায় হৈচৈ চলছে তার নাম B.1.1.7 অথবা VUI-202012/01 – এবং এটির সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা অন্য প্রজাতিগুলোর চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি।

ব্রিটেনে এটি এখন ছড়াচ্ছে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে।

করোনাভাইরাসের গায়ে যে কাঁটার মত স্পাইকগুলো থাকে – এ মিউটেশনের ফলে সেগুলোর প্রোটিনে এমন কিছু পরিবর্তন হচ্ছে যাতে এটা আরো সহজে মানুষের দেহকোষে ঢুকে পড়তে পারছে।

এটিই বিজ্ঞানীদের বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ। এই নতুন ধরনের করোনাভাইরাসে ১৪টি মিউটেশন চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভাইরাসের মধ্যে প্রোটিন তৈরির উপাদান হচ্ছে এ্যামিনো এসিড – এবং তাতে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসছে এই মিউটেশন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হয়তো এর কোন কোনোটি ভাইরাসটির দ্রুত ছড়াতে পারার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

এসব মিউটেশনের কথা বৈজ্ঞানিকদের আগেও জানা ছিল, কিন্তু এত বিশদভাবে জানা ছিল না।

. স্পাইক প্রোটিনে এনফাইভ জিরো ওয়ান নামে একটি মিউটেশনের কথা আগে জানা গিয়েছিল কিন্তু এখন এটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন হয়ে থাকতে পারে।

. বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পি সিক্সএইট ওয়ান এইচ নামে আরেকটি মিউটেশন জীববৈজ্ঞানিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

. কিছু জেনেটিক সংকেত এ মিউটেশনের সময় বাদ পড়েছে – যা এর আগে নেদারল্যান্ডে মিংক নামে এক ধরণের লোমশ প্রাণীর মধ্যে দেখা গিয়েছিল।

এই প্রাণীর লোমশ চামড়া দিয়ে দামী কোট তৈরি হয়, এবং এজন্য কিছু দেশে ফার্মে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা হয় এই মিংক।

কীভাবে চিহ্নিত হলো এই নতুন ধরণের ভাইরাস
করোনাভাইরাসের নতুন এই প্রকারটি চিহ্নিত হয়েছে যুক্তরাজ্যে – কিন্ত এমন হতেই পারে যে তার অনেক আগে থেকেই এটি যুক্তরাজ্যের বাইরে কোথাও ছড়াচ্ছিল।

হয়তো এটির উৎপত্তিও যুক্তরাজ্যের বাইরে – এমন সম্ভাবনাও আছে।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি চিহ্নিত হয়েছে যুক্তরাজ্যে কারণ সেখানে করোনাভাইরাসের ওপর নজরদারির যে বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো আছে তা অত্যন্ত শক্তিশালী।

এর নাম হচ্ছে কগ-ইউকে বা “কোভিড-১৯ জেনোমিক্স কনসোর্টিয়াম” – এতে দেড় লক্ষেরও বেশি সার্স-কোভ-টু ভাইরাসের নমুনার জেনেটিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা হচ্ছে ।

সারা পৃথিবীতে এ ভাইরাসের যে পরিমাণ জেনেটিক সিকোয়েন্স সংরক্ষিত আছে, তার অর্ধেকেরও বেশি আছে এখানে।

এ কারণেই করোনাভাইরাসের নতুন কোন মিউটেশন হলে এর মধ্যে যে ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো হয় – সেগুলো এই কগ-ইউকের বিজ্ঞানীদের চোখে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

তথ্য সূত্র – বিবিসি বাংলা




ছবি