২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ওল্ডপোর্ট পাথরে চাপা স্মৃতি

আপডেট : সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০ ১১:০০ অপরাহ্ণ

51

মন্ট্রিয়েলে থাকি প্রায় আড়াই বছর।এখনো পুরো মন্ট্রিয়েল ঘুরে দেখা হয়নি। শহরের এতো বিশাল ব্যাপ্তি যে, সহজে তা দেখে শেষ করা যাবে না। আমার মতন অনেক কুয়োব্যাঙ আছেন, যারা নিজের বাস করা এলাকা দিয়ে মন্ট্রিয়েলের ভাল মন্দ বিচার করেন!
ক’দিন যাবত বিশেষ প্রয়োজনে ওল্ডপোর্ট এবং ওল্ডটাউনে যাচ্ছি। যতোই দেখছি ততোই অবাক আর মুগ্ধ হচ্ছি। থেকে থেকে আফসোস হচ্ছে গত আড়াইবছর কেন আমি এদিকটায় একবারের বেশী এলাম না! অথচ ওল্ডপোর্ট কিংবা ওল্ডটাউন আমার বাসায় থেকে খুব একটা দুরেও নয়।

গতকাল বিকেলে ওল্ডপোর্ট যখন যাই তখন আকাশ মেঘলা। কিছুটা ঠান্ডা হাওয়ায় শীত শীত করছে। যে কাজটির জন্য গিয়েছি তার জন্য পরিস্কার আকাশ, আলো ঝলমলে রোদ প্রয়োজন।তাই প্রার্থণায় ছিলো একটা রোদ ঝলমলে বিকেল।
প্লাস দ্যা আর্মস মেট্রো স্টেশন থেকে বের হয়ে ডাউন টাউন পিছনে ফেলে এগিয়ে যাই ওল্ডটাউনের দিকে। আঁকাবাঁকা উঁচু নীচু পথ পেরিয়ে পুরাতন শহরের পাথুরে পথে হাটতে থাকি ।

৪০০ বছরের অধিক পুরানো শহর ওল্ডটাউন ও ওল্ডপোর্ট । দু’টোই পাশাপাশি। পাহাড় কেটে বানানো ওল্ডটাউন শেষ হলেই সমতলে নদী বন্দর। পুরো এলাকাটির পথঘাট শত বছরের পুরানো। পাথর দিয়ে মোড়ানো হাঁটারপথও। যতোই হাঁটছি চোখে পড়ছে পাথরের ইমারত। অবাক বিস্ময়ে দেখছি শতশত বছর আগের ইউরোপীয় গোথিক স্থাপত্যকলার অপুর্ব সব বাড়ি ঘর।

প্লেস রয়েলের দিকে যাবার আগে থামি সেইন্ট জঁকস এভিনিউর সামনে খোলা চত্বরে।যেখানটায় আমার সমস্ত মনযোগ কেড়ে নেয় দারুন এক ভাস্কর্য।মুলবেদীর চারপাশে কুইবেকের চারজন জাতীয় বীরের ভাস্কর্য।যাদের প্রত্যেকের নাম প্রাতস্মরনীয় করে রেখেছে বড় বড় এভিনিউ নামকরন করে।

কিছু ছবি তুলে হাটতে থাকি ওল্ডপোর্টের দিকে। বেশ ঠান্ডা লাগছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সাপ্তাহ পেরিয়ে দ্বিতীয় সাপ্তাহে প্রকৃতিতে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।হাল্কা শীত শীত ভাবের সাথে চারিদিকে পাতাঝরা বিষন্ন সময়। আমার বিষন্নতাও ভালো লাগে না। আমি যখন ডাউনটাউনের জর্জ ভেনিয়ার থাকতাম তখন আমার কুইবেকোয়া বান্ধবী শওলোমি প্রায় বলতো, চলো রাতের ওল্ডপোর্টে দেখব। সী-সল্ট একটা রেস্টুরেন্ট কাম বার আছে নদী লাগোয়া।সেখানে বাডওয়াইজার বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে নদীর জলে চাঁদের বিকিরন দেখবে।

সম্ভবত একবার শওলোমি আর সুব্রতর সাথে আসা হয়েছিল। এখানে সুব্রত তখন কাজ করতো একটি ফাইভ স্টার হোটেলে। আমার ঘোরাঘুরি নিয়ে
সুব্রতর সাথে ছিল যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্ক। সে খুব একটা আড্ডাবাজী, ঘোরাঘুরি পছন্দ করতো না। নির্দিস্ট সার্কেলের বাহিরে কারো সাথে তেমন মিশতো না।যাহোক শওলোমির জন্য আমাকে তার নিয়ে আসা হয়েছিল। এর কারন তার দায়মুক্তি।অনেক বিকেল থেকে সন্ধ্যা কেটেছে আমাদের এই বান্ধবীর এপার্টমেন্টে। থ্রি এন্ড হাফের ছোট বাসার লিভিংরুমে শুয়ে বসে তুলে এনেছি জীবনের কত শত উথালপাথাল গল্প! কত চোখের জলে ভেসে গেছে বিকেল!

অনেক সন্ধ্যায় সুব্রত চলে গেছে আমাকে ফেলে।ও চলে যেতেই সেই আড্ডায় যোগ হয়েছে আরো অনেক বন্ধু। বিকেল থেকে যে আড্ডা শুরু হয়েছে তা শেষ পর্যন্ত পরিনত হয়েছে চরম পার্টিতে। মাঝেমাঝে এরকম হয়েছে সেই রাতে বাসায় ফেরা হয়নি। কেউ হয়ত সোফায়, কেউ কার্পেটে, কেউ কিচেনে পরে ঘুম দিতাম! ওল্ডটাউনে এসে খুব মনে পড়ছে অকাল প্রয়াত বাল্যবন্ধু সুব্রতকে। ঝাপসা চোখ মুছে বিষন্ন ভারী মন নিয়ে একাএকা ঘুরি। ওল্ডপোর্ট যেন আমার হ্রদয়ে পাথরে চাপা স্মৃতি।

১০.০৯.২০২০
মন্ট্রিয়েল