২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ওমানের কুমজার দ্বীপ ভ্রমণ

আপডেট : অক্টোবর ১৪, ২০২০ ২:৩১ অপরাহ্ণ

18

ক্রিং ক্রিং রিংটনে ঘুম ভেঙে গেল l ঘড়িতে দেখলাম ভোর ০৪ টা ৫০ l হামজা বলেছে , তুমি যদি হরমুজ প্রণালীতে সূর্য ওঠা না দেখতে পারো , তাহলে এই প্রদেশের তো তুমি কিছুই দেখনি ! তার মানে কি ? গত সাত বছর আমি কিছুই দেখিনি ? ও মোর খোদা ! আমারে কেউ মারো !!!

আসসালামু আলাইকুম গোলাম ( আমাকে গোলাম নামে চেনে )
–ওয়ালাইকুম আসসালাম, হামজা ( ওমানি, স্পিড বোর্ড ড্রাইভার )
সাবাহ আল খায়ের
— সাবাহ আল নূর
কেইফা হাল?
–জেন l কেইফা হাল, ইনতে?
জেন, তাল মিনা l
— ইন্তেজার, খামছা-দিগীকা
এ আল্লাহ! গোলাম তাল ছারা l

উপরের কথাগুলো শানে নুযুল এই, হামজা আমাকে সালাম দিয়েছে , আমি সালামের উত্তর নিয়েছি l তারপরও আমাকে শুভ সকাল বলেছে , সঙ্গে আমিও ওকে শুভ সকাল বলেছি l আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, আমি কেমন আছি , ভালো আছি বলে ওকে আমি জিজ্ঞেস করেছি , তুমি কেমন আছো ? ভালো আছি l আরবিতে তাল মানে আসা আর মিনা মানে সামুদ্রিক বন্দর l ও আমাকে বলেছিল তাড়াতাড়ি মিনাতে আসো l আর আমি ওকে বলেছিলাম পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো l

কুমজার গ্রাম কোথায়?
কুমজার উত্তর ওমানের, মুসান্দামে প্রদেশে অবস্থিত হরমুজ প্রণালীর জলস্রোতে অবস্থিত একটি গ্রাম l মোট আয়তন: 3.61 বর্গ কিলোমিটার l বলা হয়ে থাকে কুমজারের প্রায় ৫00 বছর ধরে জনবসতি রয়েছে, যদিও সঠিক রেকর্ডগুলি কঠিন। এইই অঞ্চলের প্রাথমিক পর্তুগিজ মানচিত্রগুলি অঞ্চলের একটি বসতি হাইলাইট করে। গ্রামটি বিচ্ছিন্ন এবং কেবল স্পিডবোট এবং নৌকায়ই অ্যাক্সেসযোগ্য। স্পিডবোট হয়ে খাসাব থেকে কুমজার গ্রামে পৌঁছতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লাগে l

রোড লাইট গুলো এখনো জালানো আছে l স্পীড বোটে উঠে বসলাম, ডবল ইঞ্জিন লাগানো l বোট মনে হচ্ছে খুব জোরে চলবে l এর আগে ডবল ইঞ্জিন ওয়ালা স্পিডবোটে আমি কখনো উঠি নাই l আস্তে আস্তে বোর্ডের স্প্রিট বাড়তে লাগল একটি পর্যায়ে এসে দেখি আমি চোখ খুলতে পারি না l হামজাকে বললাম আস্তে চলো, এটাও জানি আরবরা কোন যানবাহন আস্তে চালাতে জানেনা এরা দুইটা জিনিস জোরে জোরে চালায় , যে কোন রকমের যানবহন আর বংশ বৃদ্ধি করা l

হরমুজ প্রণালী আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে লাগলো পাশের পাহাড় গুলো নজরে আসতে লাগলো l আমরা পূর্ব দিকে যাচ্ছি l অনেক দূরে একটি লাল আগুনের দলা দেখতে পেলাম ক্রমশই ওটা লাল দ্রুতি ছড়াতে লাগলো , আস্তে আস্তে লাল হয়ে গেল পুরোটা এরিয়া l সূর্য উদয় যে এত সুন্দর হয় জীবনের এই প্রথম দেখলাম অনেকগুলো ছবি তুললাম l আমাদের প্রায় ৪৫ মিনিট হয়ে গেছে বড় বড় পাহাড়ের মাঝে একটি ছোট্ট গ্রাম দেখে বলল হামজা, ওটাই আমাদের গ্রাম l স্পিড বোর্ড এর মধ্যে থেকে আমি গ্রামের কিছু ছবি তুললাম l

সাগরের পাড়ে অনেকগুলো স্পিডবোট বাধা আছে l এখানে কোন রাস্তা নাই l কোন গাড়ি নাই l সরকারি কিছু পিকআপ আর একটি অ্যাম্বুলেন্স আছে l এখানকার ৮০ ভাগ লোক মাছ ধরার কাজ করে l এখানে অনেক মাছ পাওয়া যায় l সাগরের পাশ দিয়ে দেখলাম অনেক মাছের ঝাঁক , এজন্য বুঝতে পারলাম কেন এরা এখানে বাস করে, এখান থেকে তারা স্পিডবোট বোঝাই করে মাছ নিয়ে খাসাব শহরে এনে বিক্রি করে l এই ছোট্ট দ্বীপে বাস করেও , ওমান সরকারের প্রায় সব রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে l

এলাকার অন্যান্য জনবসতি থেকে এদের সংস্কৃতি আলাদা। গ্রামের প্রায় সমস্ত বাসিন্দারই ইন্টারনেট এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশনের অ্যাক্সেস রয়েছে, তবে এটির প্রশস্ত রাস্তা নেই এবং বেশিরভাগ কুমজারি মনে করেন যে , তারা পানির বাইরে বা বাড়ির বাইরে বিশ্রাম নিতে এবং তাদের প্রতিবেশীদের সাথে সামাজিকীকরণ করতে পছন্দ করে। প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ছোট ছোট ওমানি লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছিল l সাগরের পাড় দিয়ে অনেক গুলো সোফা সেট রাখা আছে , এগুলোতে ওরা বসে গল্প করে , সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকেl

আমাকে সোফাতে বসতে দেওয়া হল l ওদের জিজ্ঞেস করলাম , এখানে বাঙ্গালী কতজন থাকে ? বলতেই দুজন বাঙালি এসে হাজির l তারা জানালো সর্ব মোট ১৫ জন বাংলাদেশি এই দ্বীপে কাজ করে l একজন দোকানদারি করে , দুইজন হাসপাতালে কাজ করে , দুইজন স্কুলে কাজ করে , আর অন্যগুলো কনস্ট্রাকশন কাজে জড়িত l

আমি আরবী যতটুক বলতে পারি কিন্তু বুঝতে পারি তারও অধিক l যখন হেঁটে বেড়াতে শুরু করলাম তখন আমি আমার চারপাশে এমন একটি ভাষা শুনেছিলাম যা আরবী ছিল না। কুমজারীরা কুমজারি ভাষায় কথা বলেন, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানি ভাষার অনুরূপ। কুমজারি হ’ল আরবি, ফারসি ও হিন্দি মিশ্রিত, কিছু ধার করা ইংরেজি এবং পর্তুগিজ শব্দ রয়েছে, যা ইউরোপীয় নাবিকদের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছিল l

এটি আরবীয় উপদ্বীপে একচেটিয়া ভাবে কথিত কেবল অ-সেমিটিক ভাষা। ৪,000 থেকে ৫,000 এর মধ্যে স্পিকার নিয়ে আজ বেঁচে আছে। কুমজারের ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা সম্ভবত এমন ভাষায় বাঁচতে সাহায্য করেছে l যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী আরবী ভাষায় কথা বলে। ইউনেস্কো ভাষাতত্ত্ববিদদের এই ভাষাকে “মারাত্মক বিপন্ন” হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে lবলে যে এটি আগামী ৫০ বছরে মারা যেতে পারে।

আরেকটি মজার ব্যাপার হল এই গ্রামে যদি কেউ বেড়াতে যায় l তাকে তাজা মাছ দিয়ে সম্মানিত করা হয় l আমাকে ও মাছ দেওয়া হবে l দুইটা টুনা মাছ l বড় না , ছোট ছোট দুইটা 4 কেজি হবে l গ্রামটিতে সর্বমোট আমি চার ঘন্টা ঘুরে দেখেছি l অনেক ছবি তুলেছি l

যখন ফিরে আসি স্পিডবোট থেকে পিছনে তাকিয়ে গ্রামটিতে দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিল সেই ওয়াটারওয়াল্ডের সিনেমার গল্পটি l পোলার আইস-ক্যাপ গলে পানিতে ডুবে গেছে পৃথিবী। একজন নাবিক ছোট্ট একটি জাহাজে জীবন যাপন করেন। খাদ্যসংকটের এই জলমগ্ন পৃথিবীতে কিছু মানুষকে দাস করে রেখেছে একটি দস্যুদল। শুরু হয় তাদের রক্ষার যুদ্ধ। কিন্তু জানিনা কেন এই গল্পটি আমার মনে হচ্ছিল।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *