২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এলজিবিটি ডে প্যারেড ও ফেস্ট

আপডেট : আগস্ট ১৬, ২০২০ ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ

46

বার্লিনের আলেকজান্ডার প্লাটজে ঘুরতে গিয়ে বন্ধু ডা. আশরাফুজ্জামান মোহন আমাকে একজোড়া গে দম্পতি দেখিয়েছিল। সেদিনই প্রথম আমি কোন গে বা সমকামী পুরুষ দেখেছিলাম। রাতে যখন ওর সাথে বাসায় ফিরছি তখন আমাদের আলোচনা জুড়ে ছিল গে’দের নিয়ে।

বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হল সমকামীতা। আলোচনায় বারবার খোঁজার চেস্টা করেছি কেন একই লিঙ্গের ছেলেমেয়ে সমকামীতার দিকে ঝুঁকছে। একই লিঙ্গের অন্য কোন সদস্যের প্রতি যৌন আবেগ ও সম্পর্ক থাকা সমাজ, ধর্মের চোখে দোষনীয়। অগ্রসর কিংবা অনগ্রসর প্রায় প্রতিটি সমাজেই সমকামীদের খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। এমনকি তাদের সভ্য সমাজের অংশ হিসেবেও অস্বীকার করা হয়। কিন্তু এতকিছুর পরেও সমকামীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। সমাজ, পরিবার কিংবা ধর্ম তাদের অস্বীকার করলেও রাস্ট্র বাধ্য তাদের অধিকার,নিরাপত্তা দিতে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালায় জেন্ডার ইকুয়ালিটি সেকশনের আন্ডারে তারাও সম্মান ও সকল সুযোগ সুবিধা পাওয়ার দাবিদার। বহু দেশ ইতোমধ্যে সমলিঙ্গ বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করেছে। জার্মানীতেও সমলিঙ্গ বিবাহকে বৈধ।

সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আবেগ থাকাটা প্রচলিত স্বাভাবিক আবেগের ব্যাতিক্রম। তবে কেনো মানুষের মাঝে এই আবেগের জন্ম নিচ্ছে? আর সমাজের এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও এর অনুসারী কেনো এতো বৃদ্ধি পাচ্ছে?

মোহন জানায়, দোস্ত এখানে এলজিবিটি প্যারেড হয়।সারাদিন ফেস্টিভ্যাল হয়। একজাক্টলি মনে নেই, সম্ভবত জুন কিংবা জুলাই মাসে এই প্যারেড ও উৎসব হয়ে থাকে।এলজিবিটি মানে ‘লেসবিয়ান গে বাইসেক্সুয়াল ট্রান্সজেন্ডার।

২০১৩ সালে বার্লিনে নান্নুভাইয়ের বাসার একব্লক পরে প্রথম এলজিবিটি প্যারেড ও ফেস্ট দেখি। এরপরে মন্ট্রিয়েলে আমার আরো দু’বার এলজিবিটি প্যারেড দেখার সুযোগ হয়েছিল। প্যারেডে ছেলে মেয়ে যুবক যুবতী থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্কসহ বিভিন্ন বয়সের এলজিবিটির অংশগ্রহনে আনন্দমুখর র‍্যালি শহর প্রদক্ষিন করে ।

আমার আগ্রহের কারনে নান্নুভাই রাতের বেলা এলজিবিটি ফেস্টে নিয়ে যান। চারিদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। গান বাজনা, হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে আমরা ফেস্ট ঘুরে ঘুরে দেখি। এলজিবিটিদের গায়ে নানারকম ট্যাটু,রঙ্গিন চুলে অদ্ভুত হেয়ারকাটিং, বেশীরভাগের নাকে নথ, কানে দুল, হাতে চুড়ি এবং রঙবেরঙের পোষাক আশাক সহজে দৃস্টি কেড়ে নেয়।

মধ্যরাতে যখন বাসায় ফিরছি তখনও তাদের হৈহুল্লোড়ের কমতি নেই।
বাসায় ফিরে এলজিবিটির ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে দেখি, লেসবিয়ান, স্ট্রেইট, বাইসেক্সুয়াল, অ্যাসেক্সুয়াল, প্যানসেক্সুয়াল প্রভৃতির বিকল্প হিসেবে এখন আবির্ভূত হয়েছে স্যাপিওসেক্সুয়াল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারের কল্যাণে মানুষজন এ বিষয়ে জানতে শুরু করেছে। এমন কি সামাজিক ট্যাটু ভেঙ্গে অনেকেই অনলাইনে নিজেদের যৌনতা নিয়ে কথা বলছে। বিপরীতকামিতার পাশাপাশি নিজেদেরকে সমকামী, উভকামী বা যৌনলক্ষণহীন শীতল হিসেবেও পরিচয় দিচ্ছে।

তবে কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে এই বিষয়গুলো গুরুত্বহীন এবং নাক সিটকানোর বিষয়।আমি অন্তত তাদের মতন চিন্তা করি না। মানুষ হিসেবে তাদের স্বাধীনতাকে সর্মথন করি। এ নিয়ে কে কি ভাবলো আমার কিছু যায় আসে না।
স্যাপিওদের প্রথম কথাই হচ্ছে শরীর নয় মস্তিষ্কেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসা। ফলে ভালবাসা এখন আর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি হতে হবে এমনটি আর নেই।বর্তমানে আমেরিকাতে ৯ মিলিয়নের বেশি আইডেন্টিফাইড লেসবিয়ান, গে ও বাইসেক্সুয়াল রয়েছে। সারাবিশ্বে এ সংখ্যাটি কম নয়, প্রায় ২০ মিলিয়ন হবে।

আরেকটি এক গবেষনায় দেখা গেছে, অনেক সময় ফ্যান্টাসির কারণেই নারী পুরুষ উভয়ে সমকামী হয়।গবেষকদের মতে হোমোসেক্সুয়ালিটি ব্যক্তিগত পছন্দ। এর পেছনে বায়োলজিকাল বা জেনেটিক্যাল কোন কারণ নেই। গে, লেসবো, বাইসেক্সুয়াল কিংবা হেটারোসেক্সুয়াল এটা প্রতিটি মানুষের টেস্ট, চয়েস বা প্রিফারেন্সের উপর নির্ভরশীল।
আজকের যুগে পশ্চিমা বিশ্বে কে কি ধর্ম, বর্নের বা এলজিবিটি কিনা তা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। যতোটা আছে সত্যিকারের শিক্ষা হতে পিছিয়ে থাকা সমাজ ও রাস্ট্রে।

জার্মান,হল্যান্ড কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশ না ঘুরলে হয়তো এলজিবিটদের সম্পর্কে আমার জানাশোনার পরিধিটি হতো না।

ছবিঃ প্যারেডের ৪টি ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া।