৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

‘এতিমের হক’ যেন রাস্তায় গড়াগড়ি না খায়

আপডেট : জুলাই ৩০, ২০২০ ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

13

আব্দুর রহমান

আবার এসে পড়েছে পবিত্র ঈদুল আযহা বা কোরবানীর ঈদ। করোনার জন্য এবার ঈদুল ফিৎর খুব একটা উৎসবের সঙ্গে করতে পারেনি মানুষ, কোরবানীর ঈদটা আরও ম্রিয়মান হতে পারে, কেন না এখন শুধু করোনাই নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে বন্যা। তারপরও দেশের গরুর হাটগুলোতে যথেষ্ট গবাদি পশু বিক্রি হচ্ছে। গবাদীপশুর ব্যাপারে একটা সুখবর গত দু’তিন বছর ধরে শোনা যাচ্ছে, আর তা হচ্ছে এ খাতে বাংলাদেশ মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ।, আগে কোরবানীর গরুর একটা বড় অংশ আসতো ভারত থেকে। লম্বা লম্বা পাঅলা সাদা রঙের গরু দেখা যেত ঢাকার প্রায় বাড়ির সামনেই। কিন্তু এখন সে গরু খুব একটা চোখে পড়ছে না। দেশের নানা জাতের আর আকারের গরুতে বাজার পূর্ণ। এক সময় আমাদের দেশের গরুগুলো ছিল হাড় জিরজিরে। খুব একটা বাণিজ্যিক ভাবনা থেকে তখন মানুষ গরু পালতোনা, গরু মূলত: হালচাষে ব্যবহার করা হতো, আর সে কাজের অচল হলে সে গরুর স্থান হতো হাটে। এখন দেশি গরুগুলোও বেশ সবল ও শক্তিশালী একইসঙ্গে মাংসলও। গরুকেন্দ্রিক এইসব সুখবর আমাদের জন্য সত্যিই ভাল লাগার বিষয়। নানা ধরণের বিশাল আকৃতির গরু আর তার দাম নিয়ে প্রতিদিনই খবর প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশনে, প্রকাশিত হচ্ছে পত্রিকায় আর অন লাইনে। এগুলোর কোন কোনটি দেশি তবে, শংকর জাতের এবং অষ্ট্রেলিয়সহ বিদেশি জাতের গরুর সংখ্যাই বেশি। গবাদিপশু পালনে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা আমাদের জন্য স্বস্তির।

এমন হাজার হাজার এতিম আছেন যাদের ভরণপোষনের একটা বড় অংশ আসে কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রির টাকা থেকে

এবার একটি অস্বস্তিকর খবরের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কোরবানীর পশুর চামড়া নিয়ে গত বছর দেশে কী হয়েছিল নিশ্চয়ই সবার তা মনে আছে। কোরবানীর পশুর চামড়া বেচা আর কেনায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। সাধারণভাবে গরুর যে চামড়াটি ২ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা তা বিক্রি হয় ২ থেকে আড়াইশ’ টাকায়। বাড়ি ঘুরে ঘুরে অনেকে ৫শ’ টাকা দিয়ে চামড়া কিনেছেন, কিন্তু সে চামড়া তাকে বিক্রি করতে হয়েছে ২শ’ টাকায়। অনেক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী যারা ২/৩শ’ চামড়া কিনেছেন তারা সর্বশ্বান্ত হয়ে গেছেন। এক পর্যায়ে আসলে কেউ চামড়া কিনছিলই না, ফলে যেসব এতিম খানা নানা জায়গা থেকে চামড়া পেয়েছে কিংবা কিনে এনেছে তারা পড়ে যায় চরম বিপাকে। অনেক স্থানে চামড়া মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়, কোথাও কোথাও চামড়া রাস্তার ওপর ফেলে চলে যান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফরিয়ারা।

বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুতে ফেলা হয়েছিল চামড়া

আমাদের দেশে ঐতিহ্যগতভাবে কোরবানী চামড়া দেয়া হয় এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং এ। অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া নেয়, আবার অনেকে আছেন চামড়া বিক্রি করে সেই টাকা আশপাশের এতিমখানায় ভাগ করে দেন। তাই যারা কোরবানী দেন, তারা সব সময়ই চান চামড়াটি যেন একটু ভাল দামে বিক্রি করতে পারেন। দেশের এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং এর বার্ষিক খরচের একটি বড় অংশ এই কেরবানীর চামড়ার টাকা থেকেই আসে। গতবার চামড়া নিয়ে দেশে যা হয়েছে, তাতে ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী ঠকেছেন, পাইকার ঠকেছেন, মৌসুমী ব্যবসায়ী ঠকেছেন আর সবচে’ বড় কথা দেশের হাজার হাজার এতিম ঠকেছে। আমরা ক’জনই বা খবর রাখি কিংবা রাখতে পারি, কিন্তু সে সময় আলেম-ওলামা এবং এতিমখানা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত অনেকেই বলেছেন, এতিমদের অনেক কষ্ট হবে।
গত বছরের ১৪ আগস্ট বিবিসি বাংলার অনলাইনে এক রিপোর্টে বলা হয়, কাঁচা চামড়ার বাজারে বিপর্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাদ্রাসা-এতিমখানা। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসা এবং এতিমখানা কোরবানির পশুর চামড়ার উপর নির্ভর করে। অনেকে তাদের জবাই করা পশুর চামড়া বিনামূল্যে মাদ্রাসা এবং এতিমখানায় দান করে। সে চামড়া বিক্রির মাধ্যমে মাদ্রাসাগুলো অর্থ উপার্জন করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেছেন, চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদ্রাসাগুলো যে টাকা খরচ করেছে, চামড়া বিক্রি করে সে টাকাও উঠবে না।

সড়কের ওপর এভাবেই চামড়া ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

কোরবানীর ঈদ চলে এসেছে, দেশের চামড়ার বাজারে খুব একটা সুখবর নেই, বরাবরের মতোই ব্যাংকগুলো বলছে, তারা ঋণ দিতে প্রস্তুত, সরকারও চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে নানা কথা বলছেন, কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতিও দিয়েছে সরকার।
চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটি বড় সিন্ডিকেট। এরা নানা গুজব ছড়িয়ে বাজার দমিয়ে রাখে, কখনো কখনো এরা আতংক ছড়ায় যে চামড়া কেউ কেনে না, তখন বাধ্য হয়ে ১০টাকার মাল ১ টাকায় ছেড়ে দিতে হয়।
দেশে কয়েক হাজার এতিমখানা আছে। পিতৃহীন কিংবা পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের আবাস আর পড়ালেখার জায়গা হচ্ছে এইসব এতিমখানা। এগুলো মানুষের দান-খয়রাতে, সাহায্য-সহযোগিতায় চলে। তবে সবচে’ বড় আয় নি:সন্দেহে কোরবানীর পশুর চামড়ার টাকা। গতবার সে টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এসব এতিম।

এইসব শিশুদের হক যেন রাস্তায় গড়াগড়ি না খায়

আবার কোরবানীর ঈদ এসেছে, কোরবানীর চামড়ার হকদার এতিম শিশুরা ঠিকই মাঠে নামবে চামড়া সংগ্রহে কিন্তু দিন শেষে তারা কি তা বিক্রি করে কিছু টাকা নিতে পারবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য? নাকি এবারও গরীবের হক গড়াগড়ি খাবে রাস্তায়?
এতিম-অনাথ শিশুদের এই ‘হক’ যাতে রাস্তায় গড়াগড়ি না খায়, যাতে রাস্তায় ফেলে দিতে না হয়, মাটিতে পুতে ফেলতে না হয় সে জন্য এর গ্রহণযোগ্য দাম অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। সরকার এরইমধ্যে একটা ন্যূণতম দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে, কথাবার্তা বলেই এই দাম ঠিক করা হয়েছে। তাই সরকারের দেয়া ন্যূণতম দামেও যদি চামড়া বেচা যায় তাহলে এতিম-মিসকিনা কিছু পাবে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন, তারা তাদের লাভের দিকটা দেখবেন, লাভ করতে চাইবেন, কিন্তু লাভের বিষয়টি যেন অতি লোভে পরিণত না হয়। এতিম ও এতিমখানাগুলো যেন কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করে কিছু টাকা পায়, ওই শিশুরা যেন হাসিমুখে ফিরতে পারে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে তা নিশ্চিত করতে হবে। চামড়ার ক্রেতাদের ন্যায্য আচরণ আর বিক্রেতার সতর্কতাই তা নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক – সাংবাদিক




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *