২রা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এগারোই সেপ্টেম্বর, ২০০১ থেকে ২০২০

আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ ২:৪৫ অপরাহ্ণ

22

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

খুব কম মানুষই জানে এগারোই সেপ্টেম্বরের সকালে এখানে নিউ ইয়র্কে ঠিক কী হয়েছিলো। এবং খুব কম লোকেই আমাদের খোঁজখবর করে জানতে চেয়েছিলো আমরা সেই ভয়াবহ দিনটা কীভাবে এখানে কাটিয়েছিলাম।

আমরা পরে অনেক গল্প শুনেছি দেশের বন্ধু, আত্মীয়দের, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে। এমন গল্প শুনেছি, যা শুনে মনে হয়েছে, বাবা এরা দেশে থেকেই এতকিছু জানে, আর আমরা ওখানে থেকেও কিছুই জানিনা? সবজান্তা বাঙালির আর কিছু না থাকুক, বানিয়ে বানিয়ে গপ্পো বলার ক্ষমতা অসীম। এই বিষয় নিয়ে নাটক, সিনেমাও হয়েছে। দেখেছি। গল্প, কবিতা, উপন্যাসও ফাঁদা হয়েছে। পড়েছি। আর প্রথমদিকে ক্রুদ্ধ হয়েছি যখন বয়স অপেক্ষাকৃত কম ছিলো, আর তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসি পেয়েছে সেসব কথা শুনে আর দেখে। আমাদের মতো যাদের বাস্তব জীবনে সেই দিনটা কাটাতে হয়েছিলো, আর তার পরের বিপর্যয়কর সময় আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাটাতে হয়েছিলো, আমাদের কথা দেশের মিডিয়াও জানতে চায়নি, আর দেশের গপ্পো লেখকরা আর সিনেমা নির্মাতারাও আমাদের অভিজ্ঞতাকে পাত্তা দেয়নি। তারা তাদের মতো করে বর্ণনা দিয়েছে, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুবই কম।

তারপর বেড়ে গেছে ইসলামোফোবিয়া — মুসলমান মানেই টেররিস্ট এই ধারণার বাণিজ্যিক চাষ। নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন আর ফক্স তাদের গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুতের সম্পূর্ণ মিথ্যা রিপোর্টিং খাড়া করে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইজরায়েলের হাতে তুলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে গণহত্যার লাইসেন্স, যেখানে সম্পূর্ণ বিনা কারণে ইরাকের মতো প্রাচীন সভ্যতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকার যুদ্ধ কর্পোরেশন ও তাদের বুশ, রামসফেল্ড ও চেনী। একসময়ের মার্কিনি হিরো সাদ্দাম হুসেনকে উন্মাদ জনতার সামনে ফাঁসি দিয়ে মেরেছে তখন শত্রু হয়ে দাঁড়ানো আমেরিকান গভর্ণমেন্ট ও তাদের পোষা ঘাতকবাহিনি। আমার নিজের জীবনও সেই দিনের পর থেকে চিরকালের মতো বদলে গেছে। চোখের সামনে দেখেছি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার জ্বলতে, এবং তারপর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে।

আমার ক্লাস এইটে পড়া মেয়ে তার হাই স্কুলের কেমিস্ট্রি ল্যাবের জানলা দিয়ে দেখেছিলো নিরীহ মানুষকে একশো তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিচে পড়তে — একের পর এক। ওর কয়েকজন বন্ধু অবসাদ রোগের শিকার হয়েছিলো। আমার কয়েকজন পরিচিত আমেরিকান ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলো তারপর ওই এলাকায় বসবাস করে। আমেরিকান গভর্ণমেন্ট আর নিউ ইয়র্কের গভর্ণমেন্ট — দুইয়ে মিলে মিথ্যে প্রচার করেছিল, গ্রাউন্ড জিরো সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য। সেসব দিনের কথা ভুলতে পারিনা।

তারপর বিজ্ঞান ছেড়ে, প্রথাগত পেশা ছেড়ে নেমে পড়েছিলাম রাস্তায় গরিব মুসলমান, শিখ ও অন্য জাতির ইমিগ্রেন্টদের ওপরে যে ঘৃণামূলক আক্রমণ শুরু হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে। কাগজে কাগজে লিখতে। তখন আমার বয়েস চল্লিশের ওপর। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমে আমেরিকার রাজনীতিতে কাজে লাগালাম ছোটবেলা থেকে শিখে আসা সংগঠন শক্তি, ও লেখার, কথা বলার শক্তি। জ্যাকসন হাইটসের রাস্তায় আমাকে থামিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত বাংলাদেশীরা জিজ্ঞেস করতো, “দাদা, আপনি পার্থ ব্যানার্জী? আপনার লেখা পড়লাম।” নিজের কথা বললে নিজের বন্ধুরা, আত্মীয়রাই রাগ করে। ভাবে, আমি আত্মম্ভরী। নিজের ঢাক নিজে পেটাচ্ছি।

কিন্তু এসব কথা নিজে না বললে কখনো কেউ জানতে পারবেনা। যারা জানতে চায়, তাদের জন্যে বলে যাবো, লিখে যাবো। অনেক লিখেওছি। আরো লিখবো। আমেরিকার শাসকশ্রেণীর অত্যাচারী, নিষ্ঠুর মুখ তাদের মুখোশ টেনে খুলে দিয়ে সারা পৃথিবীর কাছে দেখিয়ে দিয়ে যাবো। বড় বড় মিডিয়া আর তাদের বড় বড় সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্ব আমার মতো মানুষের কথা কখনো বলবেনা। তারা সবজান্তা। আগে ক্রুদ্ধ হতাম তাদের রিজেকশনে। এখন আর হইনা। আমেরিকার এক শ্রেণীর মানুষ আমাকে আপন করেছে। আমার কাজের সম্মান দিয়েছে। দেশের একশ্রেণীর মানুষও দিয়েছে। এরাই আমার নতুন বন্ধু, নতুন আত্মীয়, নতুন সমাজ। বাকি জীবনটা আমার এদের সঙ্গেই কেটে যাবে সুখে দুঃখে।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সবচেয়ে ওপরের তলায় উইন্ডোজ অফ দা ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টে কাজ করতো বাংলাদেশী মুসলমান কয়েকজন। তারা আর সেদিন বাড়ি ফিরে আসেনি। আমি কাজ করতাম নদীর ওপারে নিউ জার্সিতে। আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আমি এখনো জীবিত। ওরা মৃত। এগারোই সেপ্টেম্বর তিন হাজার মানুষ সন্ত্রাসী আক্রমণে নিহত হয়েছিলো। তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে আমেরিকার যুদ্ধবাহিনি নতুন সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল পৃথিবীর জুড়ে।

আজকে দুহাজার কুড়ি সালে মাত্র ছ মাসে প্রায় দু লক্ষ মানুষ আমেরিকায় নিহত হয়েছে রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়, বঞ্চনায়, অবহেলায়। কে সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নেবে? হিংসা দিয়ে নয়, শিক্ষা দিয়ে, সংগঠন দিয়ে, নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে। না, যারা আমাদের খোঁজ নেয়নি সেদিন, তারা আজকেও লুকিয়েই থাকবে। নতুন যারা আছে, তোমরা এগিয়ে এসো। তোমাদের জন্যে সব দিয়ে যাবো।

লেখক- শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতীয়। লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে।