৭ই আগস্ট, ২০২০ ইং | ২৩শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইমেজ বনাম ভাবমূর্তি

আপডেট : জুলাই ২২, ২০২০ ১১:২১ অপরাহ্ণ

9

বেনিন স্নিগ্ধা

কয়েক দিন ধারাবাহিকভাবে দেশি বিদেশি সংবাদ মাধ্যম ও পত্রিকাগুলো লক্ষ্য করলাম। খেয়াল করে দেখলাম ২ টি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিডিয়া বেশ সরব। তার মধ্যে আলোচনার তুঙ্গে অবস্থান করছে JKG গ্রুপের “কোভিড -১৯” সংক্রান্ত প্রতারণা কারবারি। পাশাপাশি একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ সাহেদকে নিয়েও বেশ তোলপাড় চলছে। দুজনের কেলেঙ্কারির বিষয় একই। দুজনই প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত। এবং তাদেরকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অন‍্যান‍্য অভিযোগের সাথে তাদের দু’জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল ‘কোভিড-১৯’ ভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট প্রদান। অর্থাৎ পজিটিভকে নেগেটিভ এবং নেগেটিভকে পজিটিভ বানিয়ে রোগীর হাতে মিথ্যা রিপোর্ট দেওয়া হতো। দেশ বিদেশের শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে খবরটি প্রচার হয়েছে।

সম্প্রতি ইতালি থেকে বাংলাদেশি একটি ফ্লাইট যাত্রীদের নামতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। আর এর কারণ ইতালির প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন এই বলে যে, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক এক একটি ভাইরাস বোমা’।

শারীরিকভাবে আমরা যদিও মানুষ কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে আমরা অনেকটা গণ্ডারের মতোই। তা না হলে আন্তর্জাতিকভাবে অপমানিত হওয়ার পরও সাহাবুদ্দীন হাসপাতালে একই কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি ঘটতোনা।

যাই হোক, এবার আসল কথায় আসা যাক। আমাদের এ গণ্ডার সমতুল‍্য আচরণের পেছনে একটি জোড়ালো কারণ রয়েছে। আর সেটি হল ‘Shortcut Way Out Tendency’। অর্থাৎ কষ্ট করে বড় না হয়ে সহজে বড় হতে চাওয়া। একটু ব‍্যাখ‍্যা করে বলি।যেমন ‘Shortcut’ রাস্তায় কিভাবে পরীক্ষায় পাশ করা যায়, ‘System Theory’ প্রয়োগ করে কিভাবে ফাইল বের করে আনা যায়, কিভাবে সরকারি বেসরকারি কোনো কাজ পাইয়ে দেওয়া যায়, নেওয়া যায়। ‘Shortcut Way’ তে ‘System’ করে কিভাবে চাকরি পাওয়া যায় – সব জানি আমরা। আরও আছে। ‘System’ করে কিভাবে জলাশয়ের উপর হাইরাইজ অট্টালিকা, গার্মেন্টস তৈরির অনুমোদন নিয়ে মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করে রাতারাতি টাকার মুখ দেখা যায়, বৈধ পথে না গিয়ে দালালদের কাছে নিজেকে জিম্মি রেখে অবৈধ রাস্তায় বিদেশে পাড়ি জমানো যায়।

অবশ‍্য এত এত টাকা খরচ করে ‘Shortcut’ রাস্তায় পা দিয়ে বিদেশে গিয়ে বেওয়ারিশ হয়ে মরে পড়ে থাকলেও বাঙ্গালীর তাতে কিছু যায় আসে না। বিদেশ বলে কথা কিনা, তাই। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে খাদ‍্যদ্রব‍‍্যে ভেজাল মেশানো হয়, একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া। নিজ দেশের নাগরিককে যারা সবসময় ঠকানোর চিন্তা করে তাদের কানের কাছে ‘লজ্জা’, ‘অপমান’ এসব শব্দ উচ্চারণ করাই বৃথা। অনেকটা ‘উলুবনে মুক্তো ছড়ানো’র মতো আরকি।

কিছু দিন আগে অভিযান চালিয়ে বের করা হয় লাজ ফার্মার মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি করছে বাজারে। অবৈধ কাগজপত্র আর জাল সই দিয়ে ব‍্যাংক ঋণ নেয়া, অন্যের জমি দখল করে নিজের বলে চালিয়ে দেয়া এগুলোতো হরহামেশার ঘটনা।

JKG র চেয়ারম্যান ডাক্তার সাবরিনা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন তিনি। নারী কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে সমাজে নিজেকে সম্মানীয় ব‍‍্যক্তি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। কত উজ্জ্বলময় ভবিষ্যৎ হতে পারতো তার। অথচ অর্থের মোহ মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়। সারা দেশ আজ তার সমালোচনায় মুখর। জালিয়াতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছি আমরা। যেখানে মানুষের জীবন পর্যন্ত আমাদের কাছে তুচ্ছ। ভাড়া করা চালক দিয়ে দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে রোগীর কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিতেও আমরা কুন্ঠাবোধ করিনা। এতো বড় আর অভিনব প্রতারণার উদাহরণ কেউ হয়তো আগে কখনও শোনেননি। শাহেদ, আরিফুলদের মতো বড় বড় প্রতারকরা কতটা অনুকরণ তৈরি করে গেলেন আমাদের জন্য। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তারা অনুসরণীয় হয়ে থাকবেন। কেননা আমরাতো ‘System’ এর বেড়াজালে আবদ্ধ। এই ‘System’ থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। কথায় বলে না, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’। যেখানে আমাদের ইচ্ছাই নেই, সেখান থেকে আমরা বের হব কী করে! কারণ ওই যে, সবাইতো ‘Shortcut Way’ তে রাতারাতি সবকিছু অর্জন করে ফেলতে চাই। আর সবাই বলতে সবাই। সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘System’ এর ছড়াছড়ি।

কিছু দিন আগে লঞ্চ ঘাটে যাত্রীদের লঞ্চে ওঠানোর আগে তাদের শরীরের তাপমাত্রা দেখে ওঠানো হচ্ছিলো। অন্য কেউ ভিডিওটি করছিল। দেখে স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছিল যে নামকাওয়াস্তে তারা স্ক‍্যানার মেশিনটি ব‍্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা আর কতটা স্বচ্ছতা বা আস্থার পরিচয় দিয়েছি, সেটিতো প্রমাণ হয়েই গিয়েছে।

এতো কিছু প্রমাণ হওয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন স্বাস্থ্য খাতের কোথাও কোনো সিন্ডিকেট, অনিয়ম, দুর্নীতি নেই। সমস্ত কিছু দেখেও সরকার দলীয় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ব‍্যক্তি যদি এ কথা বলেন সেখানে আর কার কি বলার থাকতে পারে। আমার মনে হয়, ‘সুনীতি’, ‘দুর্নীতি’, ‘নিয়ম’, ‘অনিয়ম’, ‘ভাল’, ‘মন্দ’এর যে সংজ্ঞাগুলো আমরা জানি সেগুলো হয়তো ভুল। নতুন করে আবারও এসব সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে বৈকি।

ইতালি, কোরিয়া ও জাপান ইতিমধ্যেই তাদের দেশে ফ্লাইট বাতিল করেছে। অর্থাৎ তাদের দেশে বাংলাদেশী কোনো ফ্লাইট প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ থেকে যেসব যাত্রী গিয়েছেন সেসব দেশে, তাদের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশীরা ভুয়া করোনা সনদ নিয়ে সেসব দেশে প্রবেশ করেছিল। আর এসব ভুয়া সনদ প্রদানকারী ঢাকাস্থ রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ও JKG র চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও এসেছে। এতে করে ওইসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশী যারা আছেন, তারা কতটা অপমানজনক অবস্থানে আছেন তা বলাই বাহুল্য। হাজার হাজার বাংলাদেশী জীবিকার তাগিদে এসব দেশে অবস্থান করছেন। সাময়িক সময়ের জন্য নিজ দেশে ফিরে আবার যখন কর্মক্ষেত্রে যোগদানের উদ্দেশ্যে ভুয়া সনদ নিয়ে যান তখন তাদের নৈতিকতার প্রশ্ন ওঠাতো বাঞ্ছনীয়। এমনকি তাদের জীবিকা আহরণের জন‍্য কাজে নিয়োগ দানের বিষয়টিও এখন অনিশ্চিত।
এতো গেল করোনা সংক্রান্ত দুর্নীতি। আরও যে কত দিক থেকে বাংলাদেশ তার অনৈতিক কার্যকলাপের মধ‍্য দিয়ে নিজের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, খাটো করেছে, তার সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বহন করে। বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ম‍্যাচও বাতিল হয়ে যায়। অবৈধ উপায়ে লরিতে করে লিবিয়া যাওয়ার পথে ৪১ বাংলাদেশীর মৃত দেহ পাঠানো হয়। এমন অসংখ্য বাংলাদেশী, দালালদের খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব খুইয়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা করছে। যেগুলো ধরা পড়ছে সেগুলো দেশে ফিরে
আসছে। এসএসসি পাশ লোকজন ভুয়া এমবিবিএস সনদ দেখিয় মানুষকে ঠকিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অধিক লাভের আশায় খাবারে বিষ মিশিয়ে মানুষকে অনারোগ‍্য ব‍্যাধী এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। যার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।

যে দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়েও অপরাধ দমন করা সম্ভব হচ্ছিলো না বলে দুর্নীতি রোধে পৃথকভাবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) গঠন করতে হয়, রাঘব বোয়ালদের ঠিক পথে আনার জন্য, তাদের কাছে লজ্জা, অপমান, ভাবমূর্তি – এ শব্দগুলো নিছক শব্দ ছাড়া কিছুই নয়। এবং এসমস্ত রাঘব বোয়ালরা আরও নতুন নতুন রাঘব বোয়ালদের তৈরি হবার কারিগর হয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েই যাচ্ছেন। দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা Transparency International Bangladesh (TIB) র মতে, দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ টি দেশের মধ‍্যে ১৪৬ তম (২০১৯)। যা ২০১৮ সালে ছিল ১৪৯ তম এবং ২০১৭ সালে ছিল ১৪৩ তম অবস্থানে। TIB র একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পৃথিবীর যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ তম। ২০১৭ সালে ছিল ১৭ তম। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিব্রতকরও বটে। TIB র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সেসময় বলেছিলেন, “তালিকায় অগ্রগতি হলেও আত্মতুষ্টির কিছু নেই। কিছু দেশ খারাপ করায় বাংলাদেশ র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি করেছে”।

কাজেই JKG বা রিজেন্ট, এগুলোতো শুধু প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান বা কর্মকাণ্ড যারা চালান, তারা বাংলাদেশেরই ‘কীর্তিমান সন্তান’। আসল কথা হল, যে দেশের মানুষ ‘মানুষ’ ই হয়ে উঠতে পারেনি বিধায় নিজেদের ‘ইমেজ’ তৈরি করতে ব‍্যর্থ, সেখানে ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট হবার কোনো জায়গাই নেই। কারণ বহির্বিশ্বের কাছে আমরা এখনও একটি ঘনবসতিপূর্ণ, জরাগ্রস্ত, দারিদ্রপীড়িত, ক্ষুধার্ত, স্বল্প শিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের দেশ ও জাতি হিসেবেই পরিচিত। কথায় বলে – ‘যার মানই নেই তার আবার অপমান কিসের’।

বিশেষ দ্রষ্টব‍্য : ‘ইমেজ’ ও ‘ভাবমূর্তি’ দুটি শব্দের ভাষা ভিন্ন, অর্থ এক।

(লেখক- কলামিস্ট।)