৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস ঐতিহ্যের দেশ পোল্যান্ড

আপডেট : নভেম্বর ৩, ২০২০ ৪:৩৬ অপরাহ্ণ

49

ইউরোপের জার্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়ামের পর সবচেয়ে বেশী সংখ্যকবার যাওয়া হয়েছে পোল্যান্ডে। ওয়ারশতে দীর্ঘদিন বাস করছেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মনিরভাই। আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু, শুভাকাংখি। যে কোন বিপদ আপদে যাকে নিঃসংকোচে বিরক্ত করা যায়। পোল্যান্ডের ওয়ারশ, পোজনান, মোয়াবা, ভোল্কাকসোভস্কায় মনিরভাইয়ের সাথে আমার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ওয়ারশতে তার জেরুজালেমস্কির এপার্টমেন্ট ছিল আমার অস্থায়ী নিবাস। লম্বা একটা সময় আমি পোজনানে ছিলাম। সেখানে মনিরভাইয়ের দোতলা বাড়িতেও দীর্ঘদিন ছিলাম।

পোল্যান্ড আমার অন্যতম প্রিয় একটি দেশ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশ পোল্যান্ড এ মুহুর্তে পুর্ব ইউরোপের সবচেয়ে দ্রুত উন্ননয়শীল এবং শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপের অন্যতম এই রাস্ট্রের রাজধানী হচ্ছে ওয়ার্‌শ। পোল্যান্ডের পশ্চিমে জার্মানি, দক্ষিণে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও বেলারুস এবং উত্তরে বাল্টিক সাগর, লিথুয়ানিয়া, ও রাশিয়া অবস্থিত। বাল্টিক সাগরে পোল্যান্ডের সাথে ডেনমার্কের জলসীমানা রয়েছে। ২০০৪ সালের ১লা মে থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। তবে ইউরোপীয় একক মুদ্রা ইউরোর প্রচলন থাকলেও সাধারন্যে ব্যবহার খুবই কম।স্থানীয় মুদ্রা জোলতি’র ব্যবহার সর্বাধিক।

সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে মধ্য ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড। শান্ত ছিমছাম সুন্দর এদেশটি আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। একসময় প্ল্যান ছিল স্থায়ী বসবাসের। তাই ওয়ারশতে একটা সময় মনিরভাই আমাকে ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কারনে পোলিশ ভাষা কিছুটা রপ্ত করেছিলাম। নানান কারনে কোর্সটি সম্পন্ন না করে আমি ভর্তি হয়েছিলাম আরেকটি কোর্সে। সেখানে পরিচয় হয়েছিল আমার একসময়ের গার্লফ্রেন্ড আলজেরীয় বংশোদ্ভুত ফরাসী নাগরিক সুরাইয়া সোহার সাথে। সে আমাকে উদ্ধুদ্ধ করেছিল পোলিশ ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য। তার আগ্রহে পোলিশ ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশুনোর সুযোগ ঘটে। প্রাচীন পোল্যান্ড সম্পর্কে জানার আকাঙ্খায় সোহা আমাকে নিয়ে যায় ইতিহাস সমৃদ্ধ ক্রাকোভ, পোজনান, গদানস্ক শহরে।

নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে স্লাভিক উপজাতিরা প্রথম দেশটিতে বসতি স্থাপন করে। দশম শতাব্দীতে পিয়াস্ট রাজবংশের শাসনামলে রাজ্য হিসেবে পোল্যান্ড সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করে। ৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্যাপ্টিজম মতাবলম্বীরা দেশটিতে আসে এবং এ সময়ই তাদের প্রচেষ্টায় দেশটিতে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে পোল্যান্ডের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা চলে। এ সময়ই জাগিয়েলনীয় রাজবংশের তত্ত্বাবধানে পোল্যান্ড ইউরোপের সবচেয়ে বৃহৎ, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৩৮৫ সালে পোলিশদের হাত ধরে পাশের রাজ্য লুথিয়ানায়ও খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে। তখন পোলিশ-লিথুনিয়ান ইউনিয়ন গঠিত হয়। যা ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজ্য পোল্যান্ড-লুথিয়ানার ওপর তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে চেষ্টা করে। খৃস্টান ধর্মের পর

ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার৷ সেখানে তারা তাদের ধর্ম কর্ম পালন করছেন শান্তিপূর্ণভাবে৷ গত ১০ বছর ধরে পোলিশ ক্যাথলিক গির্জার ক্যালেন্ডারে ২৬ জানুয়ারি দিনটি ইসলাম দিবস হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে৷
১৭৯১ সালের দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া পোল্যান্ড দখল করে নিজেদের মধ্যে পোল্যান্ড রাজ্যটি ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি আবার স্বাধীনতার স্বাদ পায়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আবার পোল্যান্ডের ওপর আঘাত আসে।

পোল্যান্ডের বিভাজন নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নাৎসি জার্মানির মধ্যে ১৯৩৯ সালের ২৩ অগাস্ট
একটি অহিংস চুক্তি হয়। যা মলোটভ-রিব্বেনট্রপ চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তির সূত্র ধরে , ১৯৩৯ সালের১ সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ ও দখল করে নেয়। পোলিশরা ব্রিটিশ-ফরাসি সাহায্য চাইলে এর মধ্য দিয়ে সূত্রপাত ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। ১৭ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন পোল্যান্ডে অপ্রত্যাশিত আক্রমণ করে। ২৮ সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানির কাছে ওয়ারশ’র পতন হয়।

আডলফ হিটলারের নির্দেশে জার্মানী ৬টি নির্মূল শিবির তৈরী করে। এগুলো মুলতঃ ইহুদিদের নির্মূল করার জন্য ব্যবহ্রত হয়। ইহুদি গণহত্যার কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রধান ছিলো অউশভিৎজ় নির্মূল শিবির । যা ক্রাকোউ থেকে ৬০ কিমি পশ্চিমে অঁস্বীসিম শহরে অবস্হিত । অউশভিৎজজের মোট তিনটি ক্যাম্প করেছিল নাৎসিরা । গ্যাস-চেম্বার, বিষাক্ত ইঞ্জেকশন—প্রয়োগ করে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে এখানে হত্যা করেছে স্চুত্জস্টাফেল(এসএস) গার্ডরা। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ এই পাঁচ বছরে ১১ লক্ষেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এখানে। ফ্রান্স, হল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ডের নানান প্রান্ত থেকে দলে দলে ইহুদিদের পাঠানো হত এই ক্যাম্পে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষকে আসার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হত। ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচেছিলেন যাঁরা, তাঁদের সংখ্যা নিহতদের তুলনায় নেহাতই অল্প। হিটলারের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন রুডলফ হস ছিলেন ক্যাম্পের প্রথম প্রধানকর্তা এবং ইয়োসেফ ম্যাঙ্গেলা এই ক্যাম্পের প্রধান নিশৃংস চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সোভিয়েট সেনার হাতে মুক্তি পায় অউশভিৎজ়। সোহার সাথে ক্রাকোউ, ক্রাকোভ ঘুরতে গিয়ে অউশভিৎজজ শিবির দেখে শিউরে উঠেছি।

শিবিরের প্রতিটি দেয়াল দেয়ালে নিরপরাধ ইহুদিদের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয়। হিটলারের বাহিনী পন্চাশ লক্ষ ইহুদি ছাড়াও সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী, সাম্যবাদী, রোমানী ভাষাগোষ্ঠীর (যাযাবর) জনগণ, অন্যান্য স্লাভীয় ভাষাভাষী জনগণ, প্রতিবন্ধী, সমকামী পুরুষ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের মানুষদের ওপর এই অমানবিক গণহত্যা চালায়। নাজীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নিস্পাপ শিশু কিশোররাও। গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে মেরেছে শিশুকিশোরদের,তাদের মৃত্যুর করুন কাহিনী শুনে আমাদের দু’জনের চোখ ভিজেছে। মানুষ এতো নির্মম,বর্বর হয় কি করে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পরোক্ষ সমর্থনে দেশটি কমিউনিস্ট পিপলস রিপাবলিক পোল্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। নব্বই দশকে সোভিয়েত রাশিয়ার সংশোধনবাদীনেতা গর্বাচেভের গ্লাসনস্ত, পেরোস্ত্রোইকার কারনে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন হলে পোল্যান্ডেও সংস্কারের হাওয়া লাগে। সাধারন নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টিকে সরিয়ে দিয়ে লেচ ওয়ালেসার নেতৃত্বে পোল্যান্ড পুঁজিবাদে পা বাড়ায়।

দুই হাজার পনেরো সালের সেপ্টেম্বর আমার ডিপ্লোমা কোর্সের ক্লাস শুরু হয়ে যাবার পর প্রথম দু’মাস প্রচন্ড চাপের মধ্যে ছিলাম। ক্লাস, বাসা, ক্লাস এই করে হাৃফিয়ে উঠেছি। নভেম্বরের প্রথম সাপ্তাহে চারদিনের ছুটি পেয়ে মনিরভাইসহ চলে গিয়েছিলাম তিনিশ কিলোমিটার দুরের মোয়াবা। সেখানে আমাদের একবন্ধু নান্নুভাই থাকেন সপরিবারে। সফল ব্যবসায়ী। ছোটখাটো এ মানুষটিকে প্রথম দেখায় কেউ বুঝতে পারবেন না তিনি কি পরিমান অর্থ বিত্তের মালিক। তার দোকানের বাংলায় লেখা হোর্ডিং সাইন থেকে ভিতরের সকল ডেকোরেশনে বাংলাদেশের ছোঁয়া। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হবে, ঢাকার কোন দোকানের সামনে আছেন। বাংলায় সাইনবোর্ড দেখে অদ্ভুত শিহরণ ও ভাললাগায় মন ভরে যায়।

দুইদিন পর ওয়ারশ এসেই মনিরভাই বললেন, সকালে আপনাকে গ্রামে নিয়ে যাব। সারাদিন থাকব খামারবাড়ি।
শুনেই আমার দীর্ঘ ভ্রমনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল পোলিশদের গ্রাম দেখার।
খুব সকালে নাস্তা খেয়ে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করি ওসমান হারুনী ও অমিতের জন্য। ওরা নির্ধারিত সময়ে চলে এলে চা খেয়ে আমরা যাত্রা করি ভোল্কাকসোভস্কায়র উদ্দেশ্যে।

ওয়ারশ হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দুরের একটি গ্রাম ভোল্কাকসোভস্কায়। অসম্ভব সুন্দর একটি গ্রাম। শহর ছেড়ে গ্রামের পথে গাড়ি ছুঁটে চলে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস হাড় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। নভেম্বর মানে একটু একটু শীত পড়ছে। তাপমাত্রা মাইনাসের কাছাকাছি। মধ্য নভেম্বর থেকে স্নো পড়া শুরু হবে।
৩৫ মিনিট ড্রাইভ শেষে খামারবাড়ি পৌছে যাই। খোলামেলা বিশাল ব্যাপ্তি খামার বাড়ি। এক পোলিশ বুড়ো ও তার একছেলে খামারবাড়ি দেখাশুনো করেন। মনিরভাইয়ের পূর্ব পরিচিত। আমাদের পেয়ে বুড়োর ছেলে দারুন উচ্ছ্বসিত। মনিরভাইয়ের সাথে তার দারুন সম্পর্ক। মনিরভাই ছাড়া আমরা সবাই প্রথম খামারবাড়ি এসেছি। চা খেতে খেতে নানান গল্প গুজবে তরুনটির সাথে আমাদের মুহুর্তে চমৎকার জমে যায়।সে আমাদের সবাইকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খামারবাড়ি দেখায়। গরু, ছাগল,ভেড়া,হাঁস, মুরগী,কবুতর, খরগোশ, নানান জাতের পাখি থেকে আরম্ভ করে ঘোড়া, কুকুর কি নেই খামারে?
সকাল থেকে সারাদুপুর কাটে খামারবাড়িতে। পোলিশ গ্রামবাসি, সাধারন মানুষ খুব শান্ত প্রকৃতির। তাদের জীবনযাত্রা সহজ সরল। অথিতি পরায়নও বটে। যতক্ষন ছিলাম খামারি বাপ-ছেলে কত কিছু খেতে দিয়েছে তা আজ আর মনে নেই।

বিকেলে ফেরার সময় মনিরভাই বিশাল সাইজের দুটো রাতা মোরগ কেনেন। সাধারনত এত বড় সাইজের রাতামোরগ আমার চোখে পড়েনি। দু’টোর ওজন কম হলেও সাত কেজি হবে।
জেরুজালেমস্কির বাসায় ফিরে দুলাল ভাই, ওসমান হারুনী ও অমিত মিলে মোরগ দুটো কেটেকুটে মশলা মেখে চুলায় রান্না চাপিয়ে দেয় । সাথে বাসমতি চালের সাদাপোলাও। সেদিনটি আমার কাছে আরো একটি কারনে স্মরনীয় হয়ে আছে। জীবিনে প্রথম পেঁয়াজ ছিলতে গিয়ে ঝাঁজে আমার চোখের পানি নাকের পানি একাকার হয়েছিল। মনিরভাইয়ের কাছে মাংস রান্না শেখার হাতেখড়িটা হয়ে যায়।

৩.১১.২০২০
মন্ট্রিয়েল